আমাদের সমাজে লজ্জা পাওয়া বা লজ্জা করার দায়িত্ব অধিকাংশ সময় মেয়েদের ওপরই চাপাইয়া দেওয়া হয়। সত্য এইটার পেছনে নারীর রূপ, কোমলতা ও আকর্ষণীয় গঠনের একটা ঐতিহাসিক ও সামাজিক মনস্তত্বও কাজ করে। নারীর শরীরের কিছু বৈশিষ্ট্য, তার রূপ ও কমনীয়তা পুরুষের দৃষ্টি যেভাবে আকর্ষণ করে পুরুষেরটা সেইভাবে করে না। ফলে নারীর শরীর নিয়া সামাজিক প্রত্যাশা নারীর দিকেই ফিরা আসে। তাই ঐতিহাসিককাল থেকেই, সামাজিকভাবে একটা মেয়ে কী পরবে, কতটা শরীর ঢাকবে, কিভাবে হাঁটবে- এইসব ঠিক কইরা দিয়াই যেন লজ্জার সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু আমরা যদি কোরআনের দিকে মনোযোগ দিই তাহলে দেখবো- কুরআনের ভাষায় হায়া বা লজ্জাশীলতা শুধু নারীকেন্দ্রিক বিষয় না, হায়া নারী ও পুরুষ উভয়ের নৈতিক জীবনের অংশ। কুরআন পাঠ করলে দেখা যায়, নারীর পোশাকের নির্দেশনার আগে পুরুষকে বলা হইছে, ‘মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে।'(সূরা আন-নূর, ২৪:৩০) এর পরের আয়াতে নারীদেরও একইভাবে দৃষ্টি ও শালীনতা রক্ষার কথা বলা হইছে (২৪:৩১)।
ইসলামে হায়ার শুরু শুধু পোশাক দিয়া না, দৃষ্টি ও আত্মসংযম দিয়াও। কারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা অনেক সময় দৃষ্টি থেইকা কল্পনায়, কল্পনা থেইকা ভাষায়, আর ভাষা থেইকা আচরণে প্রকাশ পায়। তাই নারীর রূপ বা শরীরের কমনীয়তা অস্বীকার করা যেমন বাস্তবতাকে অস্বীকার করা, তেমনি এই বৈশিষ্ট্যগুলারে নারীর ওপর একতরফা নৈতিক দায় চাপানোর অজুহাত বানানোও ন্যায়সংগত না। নারীর সৌন্দর্য তার অপরাধ না, আর পুরুষের আকাঙ্ক্ষা তার নৈতিক দায়িত্বের বাইরে না। হায়া তখনই নারী-পুরুষ উভয়ের চরিত্রের গুণ হইয়া ওঠে, যখন নারী নিজের শরীর ও আচরণের মর্যাদা রক্ষা করে, পুরুষ নিজের দৃষ্টি ও কামনাকে সংযত করে।
হায়া মানে শুধু যৌন সংযম না, হায়া এমন এক নৈতিকতা বোধ, যেইটা মানুষকে মনে করায়া দেয় যে- আমরা ইচ্ছা মত সবকিছু করতে পারি না। একজন পুরুষ যদি ক্ষমতার জোরে কোনো নারীকে অপমান করে, তাইলে সে আসলে একজন বেহায়া। যদি সে অশ্লীল ভাষায় কথা বলে, মানুষের মর্যাদা ভাঙে, দুর্বল মানুষের সুযোগ নেয়, সেইখানেও সে বেহায়া। একইভাবে একজন নারীও যদি নিজের বা অন্যের মর্যাদাকে ভোগের বস্তু বানায়, তাইলেও হায়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অর্থাৎ হায়া প্রথমত শরীরের না, বিবেকের গুণ। ইসলামী ঐতিহ্যে হায়াকে ঈমানের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলার কারণও এইখানে। কারণ হায়া মানুষের ভিতরে একটা অদৃশ্য সীমারেখা তৈরি করে। আইন মানুষকে অপরাধের পরে থামায়, কিন্তু হায়া অপরাধের আগেই থামায়। আইন বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণ, হায়া অন্তরের নিয়ন্ত্রণ
আধুনিক ভোগবাদী সমাজ ও সংস্কৃতি দেহকে বিশেষ কইরা নারীর শরীরকে বাজারে পরিণত করছে। বিজ্ঞাপন, বিনোদন, সামাজিক মাধ্যম- সবখানেই নারীর শরীর পণ্যে রূপান্তরিত হইছে। এই বাস্তবতায় হায়া মানে পৃথিবী থেইকা পালায়া যাওয়া না, বরং নিজের শরীর, দৃষ্টি, ভাষা ও নিজেদের সম্পর্ককে বাজারের ভোগ্যপণ্য হইতে না দেওয়া।
লজ্জা বা হায়ার সহজ ও স্বাভাবিক ধারণা ধংস করার জন্য আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতাই দায়ী। আর আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতা এই লজ্জাবোধ একদিনে ধ্বংস করে নাই। এই সভ্যতা ইতিহাসের দীর্ঘ সময় ধইরা ধর্ম, পরিবার, সম্প্রদায় ও নৈতিকতা ও ঐতিহ্যের কর্তৃত্ব দুর্বল কইরা ব্যক্তির ইচ্ছারে সবচেয়ে বড় সত্য হিসাবে তৈরি করছে। ‘আমার শরীর, আমার ইচ্ছা’, ‘আমার জীবন, আমি যেভাবে চাই সেইভাবে চলব’ মিথ্যা ফ্রিডমের নামে এইসব স্লোগান লজ্জার সমস্ত দেয়াল অনেক দুর্বল কইরা দিছে। এইসব কথা শুনতে মুক্তির ভাষা মনে হইলেও, এইটার ভিতরে আসলে বাজার, ক্ষমতা ও ভোগের একটা গভীর ষড়যন্ত্র ও রাজনীতি কাজ করে। আমরা সহজেই এইটার ফাঁদে পইড়া যাই।
নৃতাত্ত্বিক মেরি ডগলাস তাঁর Purity and Danger বইতে দেখাইছেন- পরিচ্ছন্নতা, পবিত্রতা, অপবিত্রতা, শরীর ও সীমানার ধারণা আসলে সমাজের নৈতিক শৃঙ্খলার একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একটা সমাজ শরীরের সীমা যেভাবে ঠিক করে, সে আসলে সামাজিক সীমাও সেভাবে ঠিক করে। শরীরের সব দরজা উন্মোচন করা মানে ব্যক্তির স্বাধীনতা প্রকাশ না, তা সামাজিক সীমা, সম্মান ও স্বাধীনতার বিলোপও। এই জায়গা থেইকা ইসলামের পর্দা, দৃষ্টি সংযম, গোপনীয়তা ও নারী-পুরুষের সম্পর্ক বুঝলে দেখা যায় যে ইসলাম শরীরকে নারী-পুরুষের আমানত হিসাবে মনে করে এবং কোরআনের দর্শন শরীরকে মর্যাদা ও নিরাপত্তা প্রদান করে।
পশ্চিমা আধুনিকতার ভিতরে একটা শক্তিশালী ধারণা কাজ করে- মানুষ যত বেশি ঐতিহ্য, ধর্ম, পরিবার ও সামাজিক সীমা থেইকা মুক্ত হইবো, সে তত বেশি স্বাধীন হইবো। এই কারণে আমাদের সেকুলার সমাজে নারীর লজ্জাকে অনেক সময় ‘দমন’, ‘পশ্চাৎপদতা’, ‘সেকেলে’ হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু সমাজবিজ্ঞানী নরবার্ট এলিয়াস তাঁর The Civilizing Process বইয়ে দেখাইছেন, সভ্যতার বিকাশ মানেই লজ্জার বিলোপ না, বরং মানুষের শরীর, আবেগ, খাবার, যৌনতা ও হিংসার ওপর আত্মনিয়ন্ত্রণ তৈরি করা । অর্থাৎ সভ্য মানুষ হইতে গেলে মানুষের ভিতরে সংযম দরকার। সব ইচ্ছা সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশ করা সভ্যতা না, বরং এইটা অসম্মান ও সংযোমহীনতার পরিচয়। তাই আধুনিক ভোগবাদ যখন লজ্জারে সেকেলে জিনিস বইলা ফালায়া দেয়, তখন সে আসলে সভ্যতারই এক গুরুত্বপূর্ণ আত্মনিয়ন্ত্রণ নষ্ট কইরা দেয়!
সমাজবিজ্ঞানী আরভিং গফম্যানের মতে- সামাজিক জীবন অনেকটা মঞ্চের মতো। মানুষ অন্যের সামনে নিজের একটা পরিচয় উপস্থাপন করে। কিন্তু ডিজিটাল যুগে এই উপস্থাপন আর মাঝে মাঝে ঘটে না, সারাক্ষণ ঘটে। আগের সমাজে মানুষের একটা ব্যক্তিগত ঘর ছিল, একটা পারিবারিক জগৎ ছিল, একটা গোপন মন ছিল। এখন মানুষ খাওয়া, ঘুম, প্রেম, শরীর, কান্না, ঝগড়া- সবকিছু সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রকাশ কইরা সুখ পায়! সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষরে শুধু প্রকাশের সুযোগ দেয় না, প্রকাশ করতে চাপও দেয়। তাকে শেখানো হয় যে- নিজেকে দেখায় না, সে যেন অস্তিত্বহীন। যে নিজের শরীর প্রদর্শন করে না, সে যেন আত্মবিশ্বাসী না, যে ব্যক্তিগত বিষয় গোপন রাখে, সে যেন সেকেলে। তাই এই জায়গায় স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসে এই সভ্যতা আমাদেরকে কোন নির্লজ্জ, বেহায়া জগতে নিয়া যাইতেছে?
আজকের পুঁজিবাদ শাসিত মিডিয়া খুবই চতুর ও শক্তিশালী। সে শুধু মানুষের প্রয়োজন কেনা-বেচা করে না, সে নতুন নতুন প্রয়োজন তৈরি করে। লোভী বাজার ব্যবস্থা আমাদের দেহ নিয়া প্রথমে অস্বস্তি তৈরি করে, তারপর প্রসাধনী বিক্রি করে, পরিবার ধংস কইরা একাকিত্ব তৈরি করে, তারপর অনলাইন ডেটিং অ্যাপ বিক্রি করে। একজন লজ্জাশীল নারী বা পুরুষ এই বাজারের জন্য সমস্যাজনক। কারণ সে সবকিছু দেখাতে চায় না, সবকিছু কিনতে চায় না, সব ইচ্ছারে প্রয়োজন মনে করে না। তাই বিজ্ঞাপন শিল্প খুব চলাকি কইরা নারী-পুরুষ দুইজনের শরীরকে ব্যবহার করে। নারীর শরীর যৌন আকর্ষণের পণ্য হয়, আর পুরুষের শরীর শক্তি, পেশি, ক্ষমতা ও আধিপত্যের পণ্য হয়। নারীকে বলা হয় তোমার মূল্য তোমার সৌন্দর্যে। পুরুষকে বলা হয় তোমার মূল্য তোমার যৌন ক্ষমতা, অর্থ ও আধিপত্যে। ফলে দুইজনই বাজারের কাছে বন্দী হয়া পড়ে। এইভাবে আধুনিক পশ্চিমা সংস্কৃতি নারী-পুরুষের ভিতর থেইকা লজ্জা কাইড়া নিছে। পর্নোগ্রাফি, বিজ্ঞাপন, সিনেমা, খেলাধুলার বাণিজ্য, মিউজিক ভিডিও ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নারী-পুরুষের কামনাকে বাজারে পরিণত করছে।
কুরআন মানুষের পোশাককে শুধু শরীর ঢাকার বস্তু বলে নাই। কোরআন বলে ‘হে আদমসন্তান, আমি তোমাদের জন্য পোশাক নাজিল করেছি, যা তোমাদের লজ্জাস্থান আবৃত করে এবং সৌন্দর্য দান করে, আর তাকওয়ার পোশাকই সর্বোত্তম।'(৭:২৬) এই আয়াতে তিনটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে- আবরণ, সৌন্দর্য ও তাকওয়া(আল্লাহ ভীতি)। ইসলাম সৌন্দর্য নিষিদ্ধ করে না বরং সৌন্দর্যকে তাকওয়ার ভিতরে রাখতে বলে। অর্থাৎ সৌন্দর্য থাকবে, কিন্তু তা বাজারের প্রদর্শনী হবে না, শরীর থাকবে, কিন্তু শরীর পণ্য হবে না। আকর্ষণ থাকবে, কিন্তু আকর্ষণ দায়িত্বহীন কামনায় পরিণত হবে না। ইসলামে হায়া ঈমানের অংশ। রাসুল(সঃ) বলেছেনঃ ‘লজ্জা ঈমানের অংশ’ (সহিহ আল-বুখারি, সহিহ মুসলিম)। তিনি আরো বলছেন ‘যখন তোমার লজ্জা থাকবে না, তখন যা ইচ্ছা তাই করো।'(সহিহ আল-বুখারি)। এই হাদিসের অর্থ এই না যে লজ্জা না থাকলে যা ইচ্ছা করার অনুমতি আছে, বরং অর্থ হইলো লজ্জা ভাঙলে মানুষের পাপের শেষ সীমাও ভেঙে পড়ে।
আধুনিক রাষ্ট্র কতক আইন কইরা লজ্জা নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। কিন্তু আইন মানুষের প্রতিটা দৃষ্টি, চিন্তা, কামনা কিংবা গোপন আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। হায়া মানুষের অন্তরের পাহারাদার। সত্য আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতা মানুষরে বাহ্যিক স্বাধীনতা দিছে, কিন্তু অভ্যন্তরীণ সংযম শক্তি দুর্বল কইরা দিছে। মানুষ এখন অনেক কিছু করতে পারে, কিন্তু কেন করবে- এই প্রশ্নের উত্তর সে জানে না। ইসলাম এই জায়গায় বলে মানুষ যা ইচ্ছা তাই করতে পারে না, সে যা করবে নৈতিক দায়িত্ব নিয়া করবে। ক্ষমতা থাকা আর নৈতিক অধিকার থাকা এক কথা না। তাই স্বাধীনতা মানে সীমাহীন ইচ্ছা না, স্বাধীনতা মানে নফস(প্রবৃত্তি), কামনা, বাজার ও সামাজিক চাপের দাসত্ব থেইকা মুক্ত হওয়া।
লজ্জা বা হায়া মানুষের স্বভাববিরোধী কিছু না, বরং মানুষের মর্যাদা রক্ষা ও নিরাপত্তা দেয়ার কৌশল। আসলে লজ্জা নারী-পুরুষ দুইজনের শরীর, ভাষা, প্রেম, যৌনতা ও ব্যক্তিগত জীবনকে পণ্যে পরিণত হওয়া থেইকা রক্ষা করে । যে সভ্যতা মানুষের শরীর থেইকা কাপড় কাইড়া নেয়, ব্যক্তিগত জীবন থেইকা গোপনীয়তা কাইড়া নেয়, নারীর শরীর, রূপ, লাবণ্য বাজারে তোলে এবং পুরুষের চোখ থেইকা সংযম কাইড়া নেয়, সে সভ্যতা মানুষকে মুক্ত করে না, সে মানুষকে আসলে ভোগ্য, বিক্রয়যোগ্য ও পরাধীন কইরা তোলে।
রেফারেন্সঃ
- আল-কুরআন: সূরা আল-আ‘রাফ ৭:২৬; সূরা আন-নূর ২৪:৩০–৩১; সূরা আল-আহযাব ৩৩:৫৯।
- সহিহ আল-বুখারি, কিতাবুল ঈমান ও কিতাবুল আদব।
- সহিহ মুসলিম, কিতাবুল ঈমান।
- Mary Douglas, Purity and Danger, 1966.
- Norbert Elias, The Civilizing Process, 1939.
- Erving Goffman, The Presentation of Self in Everyday Life, 1956.
Leave a comment