এই কথা অস্বীকার করার উপায় নাই যে- আধুনিক পশ্চিমা নারীবাদ নারীর শিক্ষা, ভোটাধিকার, সম্পত্তির অধিকার, কর্মক্ষেত্রের বৈষম্য ও যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে কিছু ভূমিকা রাখছে। কিন্তু গবেষণা কইরা দেখা যায় যে পশ্চিমা নারীবাদের ভ্যালুজ ও পলিসি এক না এবং নারীমুক্তির সব ধারণাও সর্বজনীন না। বিশেষত আধুনিক উদারনৈতিক নারীবাদ নারীর মুক্তির অর্থ দাঁড় করাইছে এই বইলা যে- নারীকে স্বাধীন হইতে হইলে তাকে ধর্ম, পরিবার, মাতৃত্ব, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়িত্ব বাদ দিয়া স্বাধীন হইতে হইবো! ফলে নারী পুরুষতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ থেইকা কিছুটা বার হইছে ঠিকই কিন্তু সে তার অজান্তে বা জ্ঞাতসারে বাজার, কর্পোরেট শ্রম, সৌন্দর্যশিল্প, যৌন সংস্কৃতি ও ভোগবাদের নতুন নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ঢুইকা পড়ছে। অন্যদিকে ইসলাম নারীর ক্ষমতায়নের অন্যরকম একটা ন্যারেটিভ হাজির করে। ইসলামে নারী পুরুষের সম্পত্তি না, আবার বাজারের পণ্যও না। তা হইলে সে কী? সে হইলো আল্লাহর বান্দা, স্বতন্ত্র এক নৈতিক সত্তা, সম্পদের মালিক, জ্ঞানচর্চাকারী এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের একজন দায়িত্বশীল অংশীদার।
কুরআন নারী ও পুরুষকে একই মানবিক উৎস থেইকা সৃষ্ট সত্তা হিসাবে হাজির করে ‘তিনি তোমাদের এক নফস থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তা থেকে তার সঙ্গী সৃষ্টি করেছেন(সূরা আন-নিসা, ৪:১)।’ কুরআন নারীকে আদিম পাপের উৎস বা পুরুষের তুলনায় নিম্নতর সৃষ্টি হিসাবে হাজির করে না। নারী-পুরুষ উভয়েই সরাসরি আল্লাহর কাছে দায়ী ‘পুরুষ হোক বা নারী, কেউ সৎকর্ম করলে এবং মুমিন হলে আমি তাকে উত্তম জীবন দান করব(সূরা আন-নাহল, ১৬:৯৭)।’ কুরআন আরও বলে ‘মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী একে অপরের আওলিয়া(অভিভাবক),তারা ভালো কাজের নির্দেশ দেয় এবং মন্দ কাজের নিষেধ করে(সূরা আত-তাওবা, ৯:৭১।)’ এই আয়াত নারীকে শুধু পারিবারিক সত্তা হিসাবে না বরং সমাজের নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়িত্বশীল অংশীদার হিসাবে স্বীকৃতি দিছে। ইসলামে পুরুষ ও নারী একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয় বরং সহযোগী। তারা সমাজে একে অপরকে ভালো কাজে সহযোগিতা করে এবং বিপদে পাশে দাঁড়ায়। এখানে ‘আওলিয়া’ শব্দ দিয়ে তাদের মধ্যকার গভীর আত্মিক ও সামাজিক বন্ধনকে ইশারা করা হইছে।
ইসলাম নারীর মর্যাদারে শুধু কিছু নৈতিক ভাষায় বন্দী করে নাই। তাকে আইন, সম্পদ, জ্ঞান ও পারিবারিক অধিকারের ভিতর দিয়া প্রতিষ্ঠা করছে। কুরআন নারীর উত্তরাধিকার নির্ধারণ করছে'(সূরা আন-নিসা, ৪:৭)। নারীর উপার্জন ও সম্পদের উপর তার নিজস্ব অধিকার স্বীকার করছে ‘পুরুষ যা অর্জন করে তার অংশ তার, আর নারী যা অর্জন করে তার অংশ তার'(সূরা আন-নিসা, ৪:৩২)। মহর নারীর নিজস্ব সম্পদ, কোনো স্বামী স্ত্রীর সম্পদের মালিক না, পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব পুরুষের ওপর, কিন্তু নারী তার নিজস্ব সম্পদ খরচ করতে বাধ্য না। বিয়েতে নারীর সম্মতি জরুরি। জোরপূর্বক নারীকে বিবাহ বা সম্পত্তির মতো দখল করা কুরআন নিষিদ্ধ করছে'(সূরা আন-নিসা, ৪:১৯)। ইসলামের ইতিহাসেও নারী নিষ্ক্রিয় ছিল না। খাদিজা (রাঃ) ছিলেন একজন ব্যবসায়ী ও ইসলামের প্রথম বিশ্বাসী। আয়েশা (রাঃ) ছিলেন হাদিস, ফিকহ, চিকিৎসা ও সাহিত্যের বড় আলেম। উম্মে সালামা (রাঃ) রাজনৈতিক সংকটে রাসুল (সাঃ)কে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিছেন। অর্থাৎ ইসলামি ক্ষমতায়ন মানে শুধু নারীকে চাকরির বাজারে পাঠানো না, বরং তাকে জ্ঞান, সম্পদ, সিদ্ধান্ত, পরিবার ও সমাজে নৈতিক কর্তৃত্ব দেওয়া।
আমরা জানি যে আধুনিক নারীবাদ ইউরোপীয় আলোকায়ন, শিল্পবিপ্লব, পুঁজিবাদ ও আধুনিক রাষ্ট্রের ভিতর জন্ম নিছে। ইউরোপে স্বাধীন মানুষ বলতে দীর্ঘ সময় মূলত সম্পত্তির মালিক পুরুষ নাগরিকরে বোঝানো হইত। নারী ভোট, শিক্ষা, সম্পত্তি ও স্বাধীন আইনি অধিকার থেইকা দীর্ঘদিন বঞ্চিত ছিল। এই কারণে হয়ত নারীবাদের প্রাথমিক দাবি ছিল ন্যায়সংগত। কিন্তু শিল্পবিপ্লবের পরে নারী মুক্তির ধারণা ধীরে ধীরে শ্রমবাজারের সাথে যুক্ত হইতে থাকে। ফলে নারী ঘরের বাইরে মজুরির কাজ করলে স্বাধীন, আর ঘরে যত্নের কাজ করলে পরাধীন- এই ধারণা শক্তিশালী হয়।
মার্ক্সবাদ ও সমাজতান্ত্রিক নারীবাদ দেখাইছে, পুঁজিবাদ শুধু কারখানা বা অফিসে শ্রম শোষণ করে না, পরিবারে নারীর অবৈতনিক শ্রমের উপরও দাঁড়ায়। রান্না, সন্তান লালন, বৃদ্ধের সেবা, ঘর গোছানো এবং পরিবারের মানসিক যত্ন এই কাজগুলি বাজারে মজুরি পায় না, কিন্তু এই কাজ ছাড়া পরদিন কোনো পুরুষ শ্রমিকই কর্মক্ষেত্রে উপস্থিত হইতে পারত না। অর্থাৎ শ্রমশক্তির পুনরুৎপাদন ঘটে ঘরে, অথচ জাতীয় অর্থনীতির হিসাবে এই শ্রম প্রায় অদৃশ্য। এইখানেই নারীর দ্বৈত শ্রম শুরু হয়। সে দিনের বেলায় মজুরির বিনিময়ে অফিসে কাজ করে, আবার ঘরে ফিরা বিনা মজুরিতে দ্বিতীয় শিফট শুরু করে। বাজার প্রথম শ্রমটাকে ‘উৎপাদন’ বলে, কিন্তু দ্বিতীয়টাকে ‘স্বাভাবিক দায়িত্ব’ বানাইয়া ফেলে। ফলে নারীর শ্রম কমে না বরং শুধু তার নাম বদলায়।
আধুনিক বাজার আবার এই বাস্তবতার একটা অদ্ভুত সমাধান হাজির করে। সে বলে- নারীর ক্ষমতায়ন মানেই চাকরি, আয় এবং ভোক্তা হওয়ার সক্ষমতা। যেন মানুষের মর্যাদার একমাত্র মাপকাঠি অর্থনৈতিক উৎপাদন। এই দৃষ্টিভঙ্গির সমস্যা হইলো, এইটা যত্নকে শ্রম হিসাবে না, আবেগ হিসাবে দেখে। তাই যত্নের সামাজিক মূল্য থাকে কিন্তু অর্থনৈতিক ও নৈতিক স্বীকৃতি থাকে না। ইসলামের অবস্থান এখানে ভিন্ন এক নৈতিক ভিত্তি নির্মাণ করে। ইসলাম নারীর সম্পদের অধিকার, উপার্জনের অধিকার এবং ব্যবসার অধিকার স্বীকার করে কিন্তু মানুষের মূল্যকে কখনো বাজারে উৎপাদনের ক্ষমতা দিয়ে নির্ধারণ করে না। মাতৃত্ব, পরিবার, আত্মীয়তার বন্ধন, অসুস্থের সেবা এবং শিশু প্রতিপালন- এইসবকে কেবল ব্যক্তিগত কাজ না, সভ্যতা টিকাইয়া রাখার আমানত হিসাবে দেখে।
তবে এইখানে একটা আত্মসমালোচনাও জরুরি। মুসলিম সমাজ অনেক সময় ইসলামের এই নৈতিক দর্শন বাস্তবায়ন করতে পারে নাই। মুখে নারীর মর্যাদা বলা হয়, কিন্তু গৃহশ্রমকে কাজ বলা হয় না। পরিবারের গুরুত্বের কথা বলা হয়, অথচ পরিবারের দায় প্রায় পুরোটা নারীর কাঁধে চাপাইয়া দেওয়া হয়। পুরুষ উপার্জন করলেই দায়িত্ব শেষ-এই ধারণা ইসলামের না, এইটা অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয় সংস্কৃতি ও পিতৃতন্ত্রের উত্তরাধিকার। সুতরাং প্রশ্ন নারী চাকরি করবে কি করবে না এই রকম সরল কিছু না। আসল প্রশ্ন হইলো, যে শ্রম মানবজীবনকে টিকাইয়া রাখে, সেই শ্রমের মর্যাদা আমরা কীভাবে বুঝব? কুরআনিক ন্যায়বোধ আমাদের মনে করায়, মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান কাজ সব সময় বাজারে বিক্রি হয় না; সমাজের সবচেয়ে বড় শ্রম ঘটে ঘরে, নারীর নীরব কাজে।
মিশেল ফুকোর মতে, ক্ষমতা কেবল আইন প্রণয়ন বা শাস্তি দেওয়ার যন্ত্র না। ক্ষমতা আসলে মানুষের দেহ, অভ্যাস, আকাঙ্ক্ষা এবং স্বাভাবিক বইলা যা মনে হয়, সেই বোধও নির্মাণ কইরা দেয়। এই তত্ত্ব দিয়া আধুনিক নারীমুক্তির সংকট বোঝা যায়। নারীকে বলা হয়- নিজের দেহ প্রকাশ করা তার স্বাধীনতা। কিন্তু একই সঙ্গে সৌন্দর্যশিল্প বইলা দেয় তার দেহ কেমন হওয়া উচিত- চিকন, তরুণ, আকর্ষণীয় ও বাজারযোগ্য। ফলে নারী নিজের ইচ্ছায় শরীর নিয়ন্ত্রণ করতেছে মনে করলেও, তার এই ইচ্ছা আসলে বিজ্ঞাপন, মিডিয়া, ফ্যাশন, পর্নোগ্রাফি ও পুরুষের দৃষ্টির মাধ্যমে গঠিত হয়। এইখানে ইসলাম প্রশ্ন করেঃ যে স্বাধীনতা বাজার আগে থেইকাই তৈরি কইরা দিছে, সেইটা কতটা স্বাধীন? ইসলামের দেহনীতি নারীকে লুকাইয়া রাখার তত্ত্ব না, বরং দেহকে বাজার ও ভোগের পণ্য হওয়ার হাত থেইকা রক্ষা করার নৈতিক ধারণা। শরীর আল্লাহর আমানত- পুরুষেরও, নারীরও।
পিয়ের বুর্দিয়ু প্রতীকী সহিংসতা বলতে এমন ক্ষমতাকে বুঝাইছেন, যেখানে মানুষ শাসিত হইলেও সেই শাসনরে স্বাভাবিক ও নিজের পছন্দ মনে করে। প্রথাগত সমাজ নারীকে শেখায়- চুপ থাকা, সহ্য করা ও নিজের অধিকার না চাওয়াই ভালো নারীর লক্ষণ। অন্যদিকে আধুনিক বাজার নারীকে শেখায়- নিজের শরীর প্রদর্শন, অতিরিক্ত ভোগ, অবিরাম সৌন্দর্যচর্চা এবং কর্পোরেট প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়াই স্বাধীনতার লক্ষণ। দুই ব্যবস্থাই নারীর জন্য একটা ‘স্বাভাবিক নারী’ তৈরি করে। এক ব্যবস্থায় সে বাধ্য ও নীরব, অন্য ব্যবস্থায় সে বাজারযোগ্য ও ভোগ্য। ইসলাম এই দুই প্রতীকী সহিংসতার বিরুদ্ধেই দাঁড়ায়।
আন্তোনিও গ্রামসির ‘হেজিমনি’ বা সাংস্কৃতিক আধিপত্যের ধারণা বলে- শাসকশ্রেণি শুধু জোর দিয়া শাসন করে না, তারা নিজেদের মূল্যবোধরে সমাজের সাধারণ বুদ্ধি বানাইয়া ফেলে। আজ পশ্চিমা মিডিয়া ও একাডেমিক ভাষা প্রায়ই এমন ধারণা তৈরি করেছে যে- ধর্মীয় নারী মানেই পরাধীন, হিজাব মানেই নিপীড়ন, গৃহিণী মানেই অক্ষম। আবার মাতৃত্ব মানেই ব্যক্তিস্বাধীনতার ক্ষতি, যৌন স্বাধীনতাই নারীমুক্তির প্রধান মানদণ্ড ইত্যাদি। এই ধারণাগুলি ধীরে ধীরে আধুনিক বৈশ্বিক স্বাভাবিক ধারণা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হইছে। ফলে কোনো ধর্ম মানা নারী তার শরীর, তার পোশাক তার নিজের স্বাধীন ইচ্ছা বিষয়ে মতামত প্রকাশ করলেও নারীবাদীরা তা গ্রহণ করতে চায় না। তারা ধইরা নেয় যে -এই ধর্ম মানা নারী নিজের স্বাধীনতা বুঝে না। আশ্চর্য! এইটা মুক্তির ভাষার ভিতর লুকানো এক ধরনের সাংস্কৃতিক আধিপত্য।
ঔপনিবেশিক শক্তি বহু সময় মুসলিম নারীর মুক্তির ভাষা ব্যবহার কইরা মুসলিম সমাজরে অসভ্য প্রমাণ করছে। পর্দা ও মুসলিম নারীকে কেন্দ্র কইরা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ভাষা নিজেদের সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করছিল। একদিকে ইউরোপীয় সাম্রাজ্য মুসলিম নারীকে উদ্ধার করতে চাইছে, অন্যদিকে উপনিবেশ, যুদ্ধ, দারিদ্র্য ও রাজনৈতিক দমন দিয়া তাদের জীবন বিপর্যস্ত করছে। আজও একই দ্বিচারিতা লক্ষ্য করা যায়। পশ্চিমা বড় বড় ফোরামে মুসলিম নারীর পোশাক নিয়া ব্যাপক আলোচনা হয়, কিন্তু যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি, কর্মক্ষেত্রের শোষণ, দারিদ্র্য ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতা যে নারীকে আজ কত অসহায় কইরা তুলছে তা কোথাও আলোচিত হয় না!
সমাজতাত্ত্বিকভাবে পরিবার শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্ক না। পরিবার আসলে সমাজের মূল্যবোধ, ভাষা, নৈতিকতা, পরিচয় ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরি করে। এই প্রক্রিয়ারে সামাজিক পুনরুৎপাদন বলা যায়। পশ্চিমা নারীবাদের কিছু ধারা পরিবারকে প্রধানত নিপীড়নের প্রতিষ্ঠান হিসাবে দেখে! কারণ পরিবারে নারীর শ্রম অনেক সময় অস্বীকৃত এবং পুরুষের কর্তৃত্ব বৈধ করা হয়। এই সমালোচনা আংশিকভাবে সত্য। কিন্তু পরিবার বিলুপ্ত করলেই নারীমুক্তি আসে না। কারণ পরিবার দুর্বল হইলে যত্নের কাজ বাজারের হাতে চইলা যায়। সন্তান পালন, বৃদ্ধসেবা ও মানসিক যত্ন তখন পণ্য হইয়া ওঠে। ধনী পরিবার এই সেবা কিনতে পারে, গরিব নারী আবার অন্য নারীর ঘরে কম মজুরিতে এই কাজ করে। কিন্তু ইসলাম পরিবাররে পুরুষের একচ্ছত্র ক্ষমতা হিসাবে দেখে না বরং সাকিনা(প্রশান্তি, স্থিরতা বা মানসিক শান্তি), মাওয়াদ্দাহ(গভীর ভালোবাসা, আন্তরিকতা) ও রহমাহর(দয়া, অনুকম্পা, সহানুভূতি বা করুণা) জায়গা হিসাবে দেখে। কুরআনিক দাম্পত্যের ভিত্তি রোমান্টিক আকর্ষণ না, সাকিনা মানুষকে শান্তি দেয়, মাওয়াদ্দাহ তাকে বন্ধনে আবদ্ধ করে, আর রহমাহ সেই বন্ধনকে সময়ের পরীক্ষায় টিকিয়ে রাখে।
“তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া স্থাপন করেছেন।”
—সূরা আর-রূম, ৩০:২১
পরিবার শান্তিময় হইব তখনই যখন সেখানে ভালোবাসা, দয়া, ন্যায়, সম্মতি, দায়িত্ব ও পারস্পরিক মর্যাদা থাকবে।
পশ্চিমা নারীবাদের কিছু ভ্যালুজ ও পলিসির বড় সংকট হইল, তারা পুরুষতন্ত্রের সমালোচনা করতে গিয়া কিন্তু পশ্চিমা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও বাজারব্যবস্থার সমালোচনা করে না। নারীকে বলা হয়, সে তখনই স্বাধীন যখন সে বাজারে আয় করে, পরিবারের উপর নির্ভর করে না, নিজের শরীরকে ইচ্ছামতো ব্যবহার করে, মাতৃত্ব বা ধর্মীয় দায়িত্বরে ব্যক্তিগত পছন্দে নামায় এবং সামাজিক সম্পর্কের চাইতে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তরে বেশি গুরুত্ব দেয়। এই মডেলে সম্পর্ক, আত্মত্যাগ, পরিবার, ধর্ম ও নৈতিক সীমা ক্রমশ দুর্বল হইতে থাকে। নারী স্বাধীন হইতে গিয়া একা হয়, পরিবার থেইকা মুক্ত হইতে গিয়া বাজার বা রাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল হয়। তাই পশ্চিমা নারীবাদের সংকট শুধু নৈতিক না, এইটা ব্যাক্তিক সামাজিকও। এইটা এমন ব্যক্তি তৈরি করে, যে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন কিন্তু বাস্তবে কর্পোরেশন, বিজ্ঞাপন, ঋণ, একাকিত্ব ও ভোগবাদের অধীন।
পশ্চিমা নারীবাদের সংকট দেখাইয়া মুসলিম সমাজ নিজের অন্যায় ঢাকতে পারবে না। বহু মুসলিম নারী আজও উত্তরাধিকার পায় না, বিয়াতে সম্মতি দিতে পারে না, যৌতুক ও নির্যাতনের শিকার হয়, শিক্ষা ও ধর্মীয় নেতৃত্ব থেইকা দূরে থাকে। এইসব চলতে থাকলে ‘ইসলাম নারীকে মর্যাদা দিছে’ বলা কেবল স্লোগান হইয়া থাকবে। নারীবাদের মোকাবিলার প্রথম কাজ নারীবাদরে গালি দেওয়া না বরং নারীর উত্তরাধিকার নিশ্চিত করা, জোরপূর্বক বিয়া দেওয়া বন্ধ করা, নারীশিক্ষার ব্যবস্থা করা, গৃহশ্রম ও মাতৃত্বের মূল্য স্বীকার করা, পারিবারিক সহিংসতার বিচার করা, নারীর সম্পদ ও মতামতের অধিকার রক্ষা করা, পুরুষের দায়িত্বহীন কর্তৃত্ব বন্ধ করা।
ইসলামে ক্ষমতায়ন মানে নারীকে পুরুষের মতো বানানো না, আবার পুরুষের অধীনে নীরব রাখাও না। ইসলামি ক্ষমতায়নের ভিত্তি হইল- তাওহিদ। নারী কোনো পুরুষ, বাজার বা রাষ্ট্রের দাস না, সে কেবল আল্লাহর বান্দা। নারী শিক্ষা লাভ করবে, প্রশ্ন করবে, গবেষণা করবে এবং সমাজকে শিক্ষা দেবে। নারী সম্পদের মালিক, উত্তরাধিকারী, ব্যবসায়ী ও উপার্জনকারী হইতে পারে। তার বিবাহ, সম্পদ ও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তার সম্মতি অপরিহার্য। নারী সমাজে সৎকাজ প্রতিষ্ঠা ও অন্যায় প্রতিরোধে সক্রিয় অংশীদার(সূরা আত-তাওবা, ৯:৭১)। বিবাহ প্রভু ও দাসীর সম্পর্ক না, ইহা পারস্পরিক দায়িত্ব, ভালোবাসা ও রহমতের চুক্তি। নারীদেহ পুরুষ, রাষ্ট্র বা বাজারের ভোগের বস্তু না, আল্লাহর আমানত।
আমরা আজ চারদিকে তাকাইলে দেখি- পশ্চিমা নারীবাদ নারীর মুক্তির নামে তাকে বাজারের শ্রমিক, সৌন্দর্যশিল্পের ভোক্তা এবং যৌন সংস্কৃতির পণ্যে পরিণত করছে। সামাজিক তত্ত্ব আমাদের দেখায় যে ক্ষমতা শুধু পরিবার বা ধর্মের মধ্যে থাকে না, ক্ষমতা বাজার, রাষ্ট্র, মিডিয়া, ভাষা, ফ্যাশন ও স্বাধীনতার ধারণার মধ্যেও কাজ করে। ইসলাম নারীর ক্ষমতায়নের এমন এক মডেল দেয়, যেখানে নারী পুরুষের সম্পত্তি না, বাজারের পণ্য না এবং রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রতীকও না। সে আল্লাহর বান্দা, স্বতন্ত্র নৈতিক মানুষ, সম্পদের মালিক, জ্ঞানের অধিকারী, পরিবারের মর্যাদাপূর্ণ অংশীদার এবং সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠার সক্রিয় শক্তি। মুসলিম সমাজের দায়িত্ব তাই শুধু পশ্চিমা নারীবাদের সমালোচনা করা না। কুরআন ও সুন্নাহ নারীরে যে মর্যাদা দিছে, সেই মর্যাদারে আইন, শিক্ষা, পরিবার ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বাস্তব করা।
রেফারেন্স:
আল-কুরআন: সূরা আন-নিসা ৪:১, ৪:৭, ৪:১৯, ৪:৩২; সূরা আত-তাওবা ৯:৭১; সূরা আন-নাহল ১৬:৯৭; সূরা আর-রূম ৩০:২১; সূরা আল-আহযাব ৩৩:৩৫।
সহিহ আল-বুখারি; সহিহ মুসলিম; সুনান আবু দাউদ; জামে আত-তিরমিজি।
Pierre Bourdieu, Masculine Domination, 1998.
Michel Foucault, The History of Sexuality, Volume I, 1976.
Antonio Gramsci, Selections from the Prison Notebooks, 1971.
Amina Wadud, Qur’an and Woman, 1992/1999.
Leave a comment