Current date August 23, 2026
বুক রিভিউমানুষ, দর্শন, ইতিহাস, সভ্যতা

তালাল আসাদের ‘সেক্যুলারের গঠন’: ধর্ম, আধুনিকতা ও নতুন মানুষ

URL copied
Share URL copied

তালাল আসাদের Formations of the Secular বইটা আসলে সেক্যুলারিজম ভালো না খারাপ- এই তর্কের বই না। আসাদের আসল প্রশ্ন অন্য জায়গায়। তিনি জানতে চান, আমরা যেইটাকে ‘সেক্যুলার’ বা ধর্মনিরপেক্ষ বইলা জানি, সেটা তৈরি হইলো কেমনে? আধুনিকতার একটা প্রচলিত গল্প আমরা জানি- আগে মানুষ ধর্মের মধ্যে ছিলো, পরে বিজ্ঞান আর যুক্তি আইলো, রাষ্ট্র ধর্ম থিকা আলাদা হইলো, মানুষ আধুনিক আর সেক্যুলার হইয়া গেলো । মানে ইতিহাসটা যেন এমন দাঁড়াইলো- ধর্ম থিকা যুক্তি, ঐতিহ্য থিকা আধুনিকতা, ধর্মীয় সমাজ থিকা সেক্যুলার সমাজ। আসাদ এই সহজ গল্পটা আদৌ মাইনা নিতে চান না। তার কাছে সেক্যুলার কোনো স্বাভাবিক বা চিরকালীন জিনিস না। এটাও একটা ঐতিহাসিকভাবে গইড়া ওঠা ব্যবস্থা। মানুষ কীভাবে নিজেরে বুঝবে, ধর্ম কী, রাজনীতি কী, ব্যক্তিগত আর সামাজিক জীবনের সীমা কোথায়- এসবও আধুনিকতার মধ্যে নতুনভাবে সাজানো হইছে।

ধর্ম কি সবসময় ‘ধর্ম’ ছিল? আমরা আজ ধর্মকে একটা আলাদা জায়গা হিসাবে দেখি। ধর্ম একদিকে, রাজনীতি আরেকদিকে, আইন আরেকদিকে, বিজ্ঞান আরেকদিকে। কিন্তু সব সমাজে সবসময় এই ভাগাভাগি এমন ছিল না। আসাদের প্রশ্ন তাই খুব সহজ কিন্তু গভীর: ধর্মকে আলাদা একটা বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করল কে? আধুনিক সমাজে বলা হয়, ধর্ম ব্যক্তিগত ব্যাপার কিন্তু আসাদ এইখানে প্রশ্ন তোলেন এই বইলা যে – ধর্ম ব্যক্তিগত হইলো কবে? আর কে ঠিক করলো কোনটা ব্যক্তিগত আর কোনটা জনজীবনের বিষয়? এইভাবে দেখলে সেক্যুলারিজম শুধু ধর্মকে রাষ্ট্র থিকা দূরে সরায় না, ধর্মকেও একটা নতুন রূপ দেয়। তখন ধর্মকে বিশ্বাস, ব্যক্তিগত বিবেক আর ব্যক্তিগত আচার হিসেবে দেখা শুরু হয়। অন্যদিকে আইন, রাষ্ট্র, রাজনীতি ও জনজীবনকে অন্য একটা আলাদা জায়গায় রাখা হয়।

আসাদের আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হইল ‘আধুনিক ব্যক্তি’র ধারণা। আধুনিক মানুষও কি তৈরি করা? আমরা আধুনিক মানুষকে স্বাধীন, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারে- এইভাবে দেখি। কিন্তু আসাদ মনে করাইয়া দেন যে এই স্বাধীন ব্যক্তির ধারণাটাও ইতিহাসের বাইরে না। একজন মানুষ যদি নিজের ধর্মীয় ঐতিহ্যের কাছে নিজেকে সমর্পণ করে, আধুনিক দৃষ্টিতে তাকে হয়তো পুরোপুরি স্বাধীন মনে হবে না। কিন্তু এই বিচারটা যে একটা বিশেষ ধরনের স্বাধীনতার ধারণা থিকা আসছে, সেটা আমরা সবসময় বুঝি না। অর্থাৎ স্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, বিবেক- এই সব ধারণারও ইতিহাস আছে।

আসাদ সেক্যুলারের আলোচনায় শরীর, ব্যথা আর নির্যাতনের কথাও আনছেন। প্রথমে ব্যাপারটা অদ্ভুত লাগতে পারে। কিন্তু আসলে এখানে তিনি দেখাতে চান, আধুনিক মানুষ কীভাবে শরীর আর কষ্টকে দেখতে শিখছে। আজ আমরা ব্যথাকে চিকিৎসা, মনোবিজ্ঞান আর মানবাধিকারের ভাষায় দেখি। কিন্তু মানুষের কষ্টকে সবসময় এভাবে দেখা হয় নাই। একইভাবে ‘মানবাধিকার’ও যতটা স্বাভাবিক মনে হয়, তারও একটা ইতিহাস আছে। প্রশ্ন হইল ‘মানুষ’ বলতে কাকে বোঝানো হইতেছে ? কোন কষ্ট আমাদের কাছে মানবিক কষ্ট হিসেবে ধরা পড়ে? আসাদ মানবাধিকারের বিরুদ্ধে না, তিনি শুধু দেখান, ‘সর্বজনীন’ মানুষের ধারণাটাও ইতিহাসের বাইরে না।

আসাদের বইয়ের একটা বড় গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হইলো ইসলামকে তিনি শুধু আরেকটা ধর্ম হিসাবে দেখেন না। আধুনিক সেক্যুলার রাষ্ট্রের মধ্যে মুসলমানকে যখন ‘ধর্মীয় সংখ্যালঘু’ বলা হয়, তখন তার পরিচয়টাও একটা বিশেষ কাঠামোর মধ্যে ঢুকানো হয়। সে নাগরিক, প্রতিবেশী, শ্রমিক বা রাজনৈতিক মানুষ হওয়ার পাশাপাশি প্রথমে একজন ‘ধর্মীয় মানুষ’ হিসেবে চিহ্নিত হয়। এখানে আসাদের প্রশ্ন: কে এই পরিচয় ঠিক করছে?

আসাদকে আমাদের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ কইরা তোলে তার উপনিবেশের প্রসঙ্গ। সেক্যুলার আধুনিকতা শুধু ইউরোপের ভিতরে তৈরি হয়ে থাইমা থাকে নাই। উপনিবেশের মাধ্যমে আইন, শিক্ষা, প্রশাসন আর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মধ্য দিয়া এটা অন্য সমাজেও ঢুকছে। মানুষকে ধর্মীয়, সংখ্যাগুরু, সংখ্যালঘু- এইভাবে নতুন নতুন পরিচয়ে ভাগ করা হইছে। ফলে উপনিবেশ শুধু দেশ শাসন করে নাই, মানুষ কীভাবে নিজের সমাজ আর নিজের পরিচয় বুঝবে, সেটাও অনেকটা বদলাইছে।

আসাদের ‘Formations of the Secular: Christianity, Islam, Modernity‘ বইয়ের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হইল- আমরা যখন ধর্মকে বিচার করি, তখন যে সেক্যুলার জায়গা থেকে বিচার করি, সেই জায়গাটাই বা তৈরি হইল কেমনে? আসাদ ধর্মের পক্ষে আর সেক্যুলারের বিপক্ষে- এমন সরল কথা তিনি বলেন না, বরং তিনি আমাদের দুইটাকেই ইতিহাসের ভিতর দিয়া দেখতে বলেন। ধর্ম যেমন একটা নির্দিষ্ট ইতিহাসের মধ্য দিয়া নতুন অর্থ পাইছে, সেক্যুলারও তেমনি একটা ঐতিহাসিক নির্মাণ। এই জন্য Formations of the Secular শুধু ধর্মনিরপেক্ষতা-স্টাডি বিষয়ক বই না। এইটা আসলে আধুনিক মানুষ, ধর্ম, রাষ্ট্র আর সমাজ- সবকিছুকেই নতুন কইরা দেখার একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা ।


Talal Asad, Formations of the Secular: Christianity, Islam, Modernity. Stanford University Press, 2003.

Share URL copied

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট

Related Articles

হাবিল-কাবিল: ক্ষমতা, ঈর্ষা ও মানুষের পতন

ইসলামের ইতিহাস ও কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী (আল-মায়িদাহ, আয়াত ২৭-৩১), হাবিল ও কাবিলের...

মানুষ, শয়তান ও স্বাধীনতা

মানুষের ইতিহাস কোথা থেইকা  শুরু হইছে?, এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়া বিভিন্ন...

আসল রুমির সন্ধানে

পাশ্চাত্য(ওয়েস্ট) ও প্রাচ্যে(ইস্ট) রুমি-পাঠ একটা হটকারি গ্লাসের মাধ্যমে দেখা ওরিয়েন্টালিস্ট পাঠ। এতে...