Current date August 23, 2026
ভাষা, সংস্কৃতি, পরিচয় রাজনীতি

ভাষাভিত্তিক উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদ: বাঙালি মুসলমানের ধর্মবোধ ভাঙার এক সাংস্কৃতিক প্রকল্প

URL copied
Share URL copied

বাংলা ভাষাকে ভালোবাসা আর বাংলা ভাষারে ধর্মের জায়গায় বসানো এক কথা না। নিজের ভাষার প্রতি ভালোবাসা স্বাভাবিক। ভাষার জন্য লড়াই করা, ভাষায় সাহিত্য করা, নিজের ইতিহাস বলা- এইগুলি একটা জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক অধিকার। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন ভাষারে শুধু যোগাযোগের মাধ্যম বা সাংস্কৃতিক পরিচয় হিসাবে না দেইখা মানুষের সর্বোচ্চ পরিচয় বানানো হয়। এই জায়গায় ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদ একটা নিরীহ সাংস্কৃতিক ধারণা থাকে না। এইটা আস্তে আস্তে একটা পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক ধর্মের রূপ নেয়। এই ধর্মে ভাষা পবিত্র, জাতি চিরন্তন, রাষ্ট্র প্রশ্নাতীত, কিছু সাংস্কৃতিক প্রতীক প্রায় উপাস্য এবং কিছু ঐতিহাসিক বয়ান অবিশ্বাস করার সুযোগ নাই। এখানে মানুষরে বলা হয়- তুমি আগে বাঙালি, তারপর অন্য কিছু। অর্থাৎ তুমি মুসলমান, কিন্তু তোমার মুসলমান পরিচয়টা ব্যক্তিগত।  আর তোমার বাঙালি পরিচয়টাই রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে বৈধ। তুমি নামাজ পড়তে পারো, রোজা রাখতে পারো, ঈদ করতে পারো কিন্তু ইসলাম যদি তোমার সমাজ, রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি বা নৈতিকতার ব্যাপারে কথা বলতে চায়, তখনই সমস্যা। অর্থাৎ ইসলাম থাকবে, কিন্তু ভেতরে থাকবে। মসজিদের ভিতরে থাকবে, রাষ্ট্র ও বাঙালি সংস্কৃতির সামনে মাথা নিচু কইরা থাকবে। এইটাই  ভাষাভিত্তিক উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের পছন্দের ইসলাম!

আমরা যদি ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসের দিকে তাকাই তখন দেখি – বাঙালি মুসলমানের পরিচয় কোনো এক লাইনের সংজ্ঞা না। সে শুধু বাংলা ভাষায় কথা বলা একজন মানুষ না। তার আত্মপরিচয়ের ভিতরে বাংলা আছে, ইসলাম আছে, স্থানীয় ইতিহাস আছে, আরব-ফারসি জ্ঞান-ঐতিহ্যের স্মৃতি আছে, নদী-পলি-মাটি আছে, আবার কুরআন, আজান, মসজিদ, রমজান ও উম্মাহর চেতনাও আছে। এই বহুস্তরীয় পরিচয়রে একমাত্র “বাঙালি” পরিচয়ের ভিতরে গলাইয়া ফেলাইতে গেলেই বিপদ। উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদ চায় মুসলমান তার ধর্মীয় ইতিহাস, তার সভ্যতাগত স্মৃতি, তার আরবি-ফারসি বৌদ্ধিক সম্পর্ক এবং বিশ্ব মুসলিম জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তার আত্মিক সংযোগ ছিহ্ন করুক। কারণ এই সব সম্পর্ক যত থাকবে, ততই ভাষাভিত্তিক জাতীয়তা সর্বোচ্চ পরিচয় হইতে পারবে না। তাই মুসলমানরে এমনভাবে শিক্ষা দেওয়া হয় যেন তার ধর্মীয় ইতিহাস বাংলার বাইরের, আর তার “আসল” ইতিহাস শুধু বাংলা ভাষা, লোকসংস্কৃতি আর নির্দিষ্ট কিছু সাহিত্যিক প্রতীকের মধ্যে সীমাবদ্ধ। জাতীয়তাবাদীরা এমনভাবে কথা বলে যেন বাঙালি জাতি চিরকাল ছিল। যেন বাঙালি জাতি হাজার হাজার বছর ধরে একই পরিচয়, একই চেতনা, একই সংস্কৃতি নিয়া বইসা আছে। বাস্তবে আধুনিক জাতি একটা রাজনৈতিক নির্মাণ। বিদ্যালয়, পাঠ্যবই, সংবাদপত্র, মানচিত্র, স্মৃতিসৌধ, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান, জাতীয় সংগীত, সাহিত্য ও সরকারি ইতিহাস- এইগুলির মাধ্যমে জাতির দর্শন তৈরি করা হয়। কে জাতীয় নায়ক, কে শত্রু, কোন ঘটনা স্মরণ করা হবে, কোন ইতিহাস ভুলে যাওয়া হবে, কোন পোশাক বাঙালি, কোন শব্দ অশুদ্ধ, কোন উৎসব সর্বজনীন- এইসব  প্রথমে সাংস্কৃতিক এলিট ও পরে রাষ্ট্র ঠিক কইরা দেয়। তারপর সেই বানানো কাঠামোরে বলা হয় “বাঙালি সংস্কৃতি”। এইখানেই আসল চালাকি। যে সংস্কৃতি আসলে একটা নির্দিষ্ট শ্রেণি, অঞ্চল ও ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার সংস্কৃতি, সেইটারে সমগ্র জাতির সংস্কৃতি বইলা চাপানো হয়। যে মুসলমান সেই সংস্কৃতির কিছু অংশ প্রশ্ন করে, তারে বলা হয় পশ্চাৎপদ, সাম্প্রদায়িক কিংবা পাকিস্তানপন্থী। অর্থাৎ সংলাপের জায়গায় পরিচয়-সন্ত্রাস তৈরি করা হয়।

এখন একটু ব্যাকগ্রাউণ্ড চেক করি। বাংলার আধুনিক, বাঙালি সাংস্কৃতিক পরিচয়ের বড় অংশ গইড়া উঠছে ঊনবিংশ শতাব্দীর কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু ভদ্রলোক সমাজের মাধ্যমে। এই সমাজ ইংরেজি শিক্ষা, ঔপনিবেশিক প্রশাসন, ছাপাখানা ও নতুন সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সুবিধা বেশি পাইছিল। অন্যদিকে পূর্ববঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান ছিল কৃষিজীবী, দরিদ্র ও  আধুনিক শিক্ষার সুযোগ থেইকা বঞ্চিত। তাদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, পুঁথিসাহিত্য, মক্তব-মাদ্রাসা, পীর-দরবেশ, গ্রামীণ কবিতা ও  সামাজিক স্মৃতি, কলকাতাকেন্দ্রিক আধুনিকতার চোখে ঊন বা গ্রাম্য সংস্কৃতি। ফলে “বাঙালি সংস্কৃতি” নামের যে মানদণ্ড দাঁড়াইল, সেই মানদণ্ডের ভিতরে মুসলমানরে ঢুকতে হইল নিজের অনেক কিছু দরজার বাইরে রাইখা। তাদেরকে বিশ্বাস করানো হইলো- তাদের আরবি-ফারসি শব্দভান্ডার অশুদ্ধ,  তাদের ধর্মীয় পোশাক গ্রাম্য, তাদের পুঁথিসাহিত্য নিম্নমানের। আরো বলা হইলো- তাদের মসজিদ সামাজিক পশ্চাৎপদতার প্রতীক, তাদের ইতিহাস আরব, ইরান তুরানের ইতিহাস। এই সাংস্কৃতিক শ্রেণিবিভাগের মধ্যে মুসলমানের ধর্মবোধকে নিচু কইরা রাখা হইল। তাকে সরাসরি বলা হইলো না- তুমি ইসলাম ছাড়ো। বলা হইলো – আধুনিক হও, উদার হও, খাঁটি বাঙালি হও। আর এই “খাঁটি বাঙালি” হওয়ার শর্ত হইল নিজের ধর্মীয় ভাষা ও ইতিহাসের কাছ থেইকা দূরে সইরা যাওয়া!

ভাষা আন্দোলন ছিল ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে পূর্ব বাংলার মানুষের ন্যায্য অধিকার, সাংস্কৃতিক মর্যাদা ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের লড়াই। এই আন্দোলনের প্রধান অংশগ্রহণকারীদের বড় অংশই ছিল মুসলমান। তারা বাংলা ভাষার অধিকার চাইছিল, ইসলাম ত্যাগ করতে চায় নাই। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ভাষা আন্দোলনরে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা হইলো, যেন এটি মুসলিম পরিচয়ের বিরুদ্ধে বাঙালি পরিচয়ের বিজয়। এই ব্যাখ্যা ইতিহাসের বিকৃতি আর কিছু না। সত্য পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী উর্দু ও ইসলামরে একাকার কইরা রাজনৈতিক আধিপত্য চালাইতে চাইছিল। কিন্তু পরে ভাষাভিত্তিক উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা একটা হীন চক্রান্ত করল। তারা পাকিস্তানি রাষ্ট্রবাদ ও ইসলামরে এক জিনিস বইলা একটা ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হইলো। ফলে পাকিস্তানের সমালোচনা ধীরে ধীরে ইসলামি পরিচয়ের সমালোচনায় পরিণত হইল। উর্দুর বিরোধিতা ইসলামি পরিচয় ও ঐতিহ্যের বিরোধিতায় গড়াইল। এইভাবে ভাষার ন্যায্য আন্দোলনরে একটা মতাদর্শিক অস্ত্র বানানো হইল।

মনে রাখতে হইবো যে মুক্তিযুদ্ধ কোনো একক মতাদর্শের যুদ্ধ ছিল না। গ্রামের কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, শিক্ষক, ধর্মপ্রাণ মুসলমান, বামপন্থী, সব ধরনের মানুষ এই যুদ্ধে অংশ নিছে। কিন্তু স্বাধীনতার পর এমন একটা রাষ্ট্রীয় বয়ান তৈরি করা হইছে, যেখানে ধর্মপ্রাণ সাধারণ মুসলমানের ভূমিকা প্রায় অদৃশ্য। যেন মুক্তিযুদ্ধ কেবল শহুরে, ধর্মনিরপেক্ষ, বাঙালি সাংস্কৃতিক অভিজাতদের প্রকল্প আছিল। এই বয়ান শুধু ভুল না, রাজনৈতিকভাবেও বিপজ্জনক। কারণ কিছু ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূমিকার দায় সমগ্র ইসলামি ঐতিহ্যের ঘাড়ে চাপানো হইছে। পাকিস্তানি বাহিনীর ইসলামের অপব্যবহারে ইসলাম নিজেই অপরাধী- এমন একটা মিথ্যা বয়ান  তৈরি করা হইছে। একইভাবে কেউ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে থাকলেই তার সব সাংস্কৃতিক মতামত সত্য হইয়া যায় না। উগ্র জাতীয়তাবাদ এই সূক্ষ্ম বিচার মানে না। তার দরকার পরিষ্কার নায়ক ও পরিষ্কার শত্রু। ফলে যে মানুষ তাদের বয়ানের সমালোচনা করে, তারে সহজে স্বাধীনতাবিরোধী বানানো হয়।

“আমি আগে বাঙালি, তারপর মুসলমান” এই বাক্যটা দেখতে নিরীহ কিন্তু এই কথার ভিতরে একটা গভীর রাজনৈতিক দাবি আছে। এই দাবি হইল, মানুষের চূড়ান্ত পরিচয় ভাষা ও জাতি ঠিক কইরা দিবে। একজন মুসলমানের কাছে তার ইসলাম শুধু পরিচয়ের লেবেল না, এইটা নৈতিক আনুগত্যের কেন্দ্র। কোনটা ন্যায়, কোনটা অন্যায়, কোনটা সত্য, কোনটা মিথ্যা- এই বিচার সে আল্লাহর নির্দেশের আলোকে করতে চায়। কিন্তু জাতীয়তাবাদ বলে- জাতির স্বার্থই সর্বোচ্চ। জাতির ইতিহাসের সমালোচনা করা যাবে না, জাতির প্রতীকের অসম্মান করা যাবে না, আবার জাতির নায়করে প্রশ্ন করা যাবে না। অর্থাৎ ধর্মের জায়গায় জাতি বইসা যায়। কমপক্ষে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে। মানুষ তখন মুসলমান থাকে আবেগে, কিন্তু জাতীয়তাবাদী হয় তার নৈতিক ও রাজনৈতিক চিন্তা ও চেতনায়।

আর একটা মজার ব্যাপার হইলো উগ্র জাতীয়তাবাদ সব সময় একটা আদর্শ মানুষ বানায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেই আদর্শ মানুষ সাধারণত শহুরে, শিক্ষিত, নির্দিষ্ট সাহিত্যিক রুচির, নির্দিষ্ট উৎসবপ্রিয় এবং ধর্মের ব্যাপারে সীমিত ও নীরব। এই ছাঁচের বাইরে গেলেই সন্দেহ। তাদের মতে-  হিজাব পরলে আরবী, দাড়ি রাখলে মৌলবাদী, আরবি নাম রাখলে সংস্কৃতিবিমুখ, ইসলামি ইতিহাস পড়লে পশ্চাৎপদ।  সাথে সাথে বাংলা সংস্কৃতির কোনো অনুষঙ্গের ধর্মীয় সমালোচনা করলে পাকিস্তানপন্থী। এইভাবে তারা মুসলমানরে তার নিজের সমাজে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করায়া দিছে! বাঙালি মুসলামানকে বারবার প্রমাণ করতে হয়- সে বিপজ্জনক না,  সে বাংলাদেশ বিরোধী না। কিন্তু একজন ধর্মনিরপেক্ষ, বাঙলা ভাষা ভিত্তিক, সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদীরে কখনো প্রমাণ করতে হয় না যে সে মুসলমানবিদ্বেষী না। এই অসমতা কেবল রাজনৈতিক না,  এইটা মানসিক দাসত্ব।

ভাষা শুধু শব্দের সমষ্টি না, ভাষা মানুষের স্মৃতি, বিশ্বাস ও সামাজিক ইতিহাস বহন করে। বাঙালি মুসলমানের কথ্য বাংলায় আরবি-ফারসি শব্দের উপস্থিতি তার ইতিহাসের স্বাভাবিক ফল। “দোয়া”, “দাওয়াত”, “রিজিক”, “বরকত”, “হালাল”, “হারাম”, “ইনসাফ”, “মেহনত”, “খেদমত”- এইসব শব্দ তার জীবন ও চেতনার অংশ। কিন্তু সাংস্কৃতিক শুদ্ধিবাদীরা  বাঙালি সংস্কৃতঘেঁষা শব্দরে “উচ্চ” এবং মুসলিম শব্দভান্ডাররে “সাম্প্রদায়িক” বা “অশুদ্ধ” বইলা প্রচার করে। “প্রার্থনা” সভ্য, “দোয়া” সংকীর্ণ। “নিমন্ত্রণ” সংস্কৃতিবান, “দাওয়াত” কম মার্জিত। “জল” কাব্যিক, “পানি” মুসলমানি । এই বিচারগুলি ভাষাবিজ্ঞানের না, এগুলি ক্ষমতার বিচার। এর মাধ্যমে মুসলমানরে তার নিজের শব্দের প্রতি লজ্জিত করা হয়। সে নিজের ধর্মীয় ভাষা জনপরিসরে ব্যবহার করতে সংকোচ বোধ করে। ধীরে ধীরে তার বিশ্বাসের ভাষাই তার কাছে অপরিচিত হইয়া যায়।  বাংলার ইতিহাস বলতে আমরা কী পড়ি? নির্দিষ্ট কিছু রাজা, নির্দিষ্ট কিছু কবি, কলকাতাকেন্দ্রিক নবজাগরণ, কিছু লোকজ উৎসব আর ভাষা আন্দোলন। কিন্তু বাংলার মুসলিম সুলতানি যুগ, মসজিদ স্থাপত্য, পুঁথিসাহিত্য, সুফি আন্দোলন, মুসলিম কৃষকের সামাজিক ইতিহাস, ফরায়েজি আন্দোলন, ঔপনিবেশিকতাবিরোধী আলেমদের সংগ্রাম ইত্যাদি থাকে আপাঙক্তেয়।  আলাওল, সৈয়দ সুলতান, শাহ মুহম্মদ সগীর, আবদুল হাকিম- এরা কি বাংলার না? মুসলিম কৃষক কি বাঙালি ইতিহাসের নির্মাতা না? গ্রামের মসজিদ, মক্তব, খানকা, পুঁথি, জারি, হামদ-নাত- এইগুলি কি সংস্কৃতি না? এইভাবে  উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদ মুসলমানরে ইতিহাসের কেন্দ্রে  রাখতে চায় না। এর ফলে বাঙালি মুসলমান তার ধর্মীয় ঐতিহ্যরে নিজের দেশের সৃজনশীল ইতিহাস হিসাবে দেখতে অভ্যস্ত হয় না। যে জনগোষ্ঠীর ইতিহাস কাইড়া নেওয়া যায়, তার আত্মবিশ্বাসও কাইড়া নেওয়া যায়।

রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যের বিরাট প্রতিভা। এইটা অস্বীকার করার কোনো দরকার নাই। কিন্তু একজন কবির সাহিত্যিক গুরুত্ব স্বীকার করা আর তাকে সমগ্র বাঙালি পরিচয়ের একমাত্র সাংস্কৃতিক মাপকাঠি বানানো এক কথা না। সমস্যা রবীন্দ্রনাথ না, সমস্যা রবীন্দ্রিক একচ্ছত্রতা। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান, শিক্ষা, সংগীত, নান্দনিকতা, সংস্কৃতিবোধ- সবখানে যদি একটি নির্দিষ্ট ধারাই বাঙালিত্বের চূড়ান্ত প্রকাশ হয়, তাহলে অন্য ধারাগুলা প্রান্তিক হবেই। একজন মুসলমান রবীন্দ্রনাথ পড়বে, তার সাহিত্যিক মূল্যায়ন করবে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথরে প্রশ্নাতীত সাংস্কৃতিক ধর্মগুরু হিসেবে মানতে বাধ্য কেন হবে? জাতীয়তাবাদীরা ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের সমালোচনার স্বাধীনতা চায়, কিন্তু নিজের সাংস্কৃতিক আইকনের সমালোচনা সহ্য করতে পারে না। এই দ্বৈততা  প্রমাণ করে তাদের তাদের ধর্মের নাম বাঙালি সংস্কৃতি।

মনে রাখা জরুরি ভাষাভিত্তিক উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদ বাঙালি মুসলমানরে সরাসরি ধর্ম ছাড়তে বলে না। সে আরও কৌশলীভাবে কাজ করে। সে প্রথমে মুসলমানরে তার নিজের ইতিহাস নিয়া লজ্জিত করতে ধীর চাপ দেয়, তার ধর্মীয় ভাষারে অমার্জিত বানায়, তার নৈতিক বিশ্বাসরে ব্যক্তিগত করে, তার উম্মাহর চেতনারে সন্দেহজনক করে, তার ধর্মীয় পোশাকরে পশ্চাৎপদতার চিহ্ন বানায়, তার সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস ভাঙে। সবশেষে সে এমন একজন মুসলমান তৈরি করে, যে ঈদ করে কিন্তু ইসলামি সভ্যতা চেনে না, নামাজ পড়ে কিন্তু ধর্মের নৈতিক কর্তৃত্ব মানে না,  মুসলিম নাম বহন করে কিন্তু নিজের মুসলিম ইতিহাস নিয়ে সংকোচ বোধ করে। এইটাই ধর্মবোধ নষ্ট হওয়ার সবচেয়ে বিপজ্জনক ধাপ। বাঙালি মুসলমানের সামনে তাই আসল প্রশ্ন—সে বাংলা ভাষা ভালোবাসবে কি না, সেইটা না। অবশ্যই ভালোবাসবে। প্রশ্ন হইল- সে ভাষারে নিজের প্রকাশের মাধ্যম বানাবে, না নিজের ঈমানের বিচারক বানাবে। সংস্কৃতি মানুষের স্মৃতি কিন্তু সত্যের মাপকাঠি সংস্কৃতি না। জাতি মানুষের রাজনৈতিক সংগঠন কিন্তু মানুষের চূড়ান্ত আনুগত্যের অধিকার জাতির নাই। বাঙালি মুসলমানের মুক্তি নিজের ভাষা অস্বীকারে না; নিজের ভাষার ভিতরে দাঁড়াইয়া নিজের ধর্মীয়, নৈতিক ও সভ্যতাগত আত্মপরিচয় পুনর্গঠনের মধ্যে।

উগ্র জাতীয়তাবাদের কাছে গ্রহণযোগ্য ইসলাম হইল সেই ইসলাম, যা ক্ষমতারে প্রশ্ন করে না, সংস্কৃতির বিচার করে না এবং রাষ্ট্রের সামনে নতজানু থাক। লোকজ ইসলাম গ্রহণযোগ্য, মাজারের গান গ্রহণযোগ্য, ঈদের খাবার গ্রহণযোগ্য। কবিতায় সুফিবাদ গ্রহণযোগ্য। কিন্তু কুরআনের নৈতিক দাবি প্রতিষ্ঠা করা অস্বস্তিকর,  ইসলামি আইন নিয়া আলোচনা অস্বস্তিকর। ভোগবাদ, সুদ, যৌননীতি, পরিবার, ক্ষমতা ও রাষ্ট্র নিয়া মুসলমান যদি আলাপ করে সেইটা হয়া পড়ে  মৌলবাদ! এইটার মানে হইলো –  ইসলাম থাকবে নান্দনিকতায়, থাকবে না নৈতিক কর্তৃত্বে। এইভাবে ইসলামকে প্রথমে লোকসংস্কৃতিতে নামানো হয়, পরে জনগণের মনকে থেইকা মুইছা  ফেলার কায়দা করা হয়।

আধুনিক শিক্ষিত বাঙালি মুসলমান ইংরেজি জানে, পাশ্চাত্য দর্শনের কিছু নাম জানে, আধুনিকতার ভাষা জানে। কিন্তু নিজের ধর্মীয় দর্শন, ইতিহাস ও জ্ঞানতত্ত্ব সম্পর্কে অনেক সময় তার ধারণা খুবই দুর্বল। সে  ঠিকমত নামাজ পড়ে না, কোরান পড়ে না, ইসলামের ইতিহাস জানে না, কিন্তু ইসলাম নিয়া চূড়ান্ত মন্তব্য করতে তার কোনো দ্বিধা নাই। এই বুদ্ধিবৃত্তিক অসাম্য তৈরি হইছে শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে। সেখানে ইউরোপীয় ইতিহাসকে মানবজাতির ইতিহাস আর ইসলামি ইতিহাসকে জাস্ট ধর্মীয় তথ্য হিসেবে পড়ানো হয়। পাশ্চাত্য দর্শন জ্ঞান, কিন্তু ইসলামি দর্শন বিশ্বাস। ধর্মনিরপেক্ষ তত্ত্ব বুদ্ধিবৃত্তি কিন্তু কোরানিক নৈতিকতা ব্যক্তিগত ব্যাপার। ফলে একজন শিক্ষিত মুসলমান নিজের ধর্ম নিয়া আবেগী হয়, কিন্তু বৌদ্ধিকভাবে আত্মবিশ্বাসী হয় না। এই দুর্বলতার সুযোগে উগ্র জাতীয়তাবাদ তাকে বুঝায়-  ইসলাম মধ্য যুগীয় ধর্ম!

উগ্র সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ নারীমুক্তির একটা নির্দিষ্ট ছবি তৈরি করে। সেই ছবির নারী নির্দিষ্ট পোশাক পরবে, নির্দিষ্ট উৎসবে অংশ নেবে এবং ধর্মীয় নৈতিকতা থেকে দূরে থাকবে। কিন্তু যে নারী সচেতনভাবে হিজাব পরে, ধর্মীয় জীবন বেছে নেয় বা ইসলামী চিন্তার ভেতর নিজের মর্যাদা খুঁজে পায়, তার পছন্দরে স্বাধীন পছন্দ হিসেবে মানা হয় না। তারে বলা হয়- সে প্রভাবিত, নিপীড়িত, পশ্চাৎপদ। অন্যদিকে বিজ্ঞাপন, বাজার ও বিনোদনশিল্প নারীর শরীর ব্যবহার করলে সেটি হয়ে যায় আধুনিকতা। অর্থাৎ স্বাধীনতার প্রশ্ন না, কোন পছন্দ সাংস্কৃতিক অভিজাতেরা অনুমোদন করে- সেইটাই আসল। ধর্মের নামে নারীর ওপর জুলুম অবশ্যই সমালোচিত হবে। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষ আধুনিকতার নামে নারীর বিশ্বাস ও সিদ্ধান্তকে অপমান করাও জুলুম।

একজন মানুষরে যখন প্রশ্ন করা হয়-  তুমি আগে বাঙালি, না মুসলমান? এই প্রশ্ন নিজেই রাজনৈতিক ফাঁদ। বাঙালি তার ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয়। মুসলমান তার ধর্মীয় পরিচয়, বাংলাদেশি তার নাগরিক পরিচয়। মানুষ তার বিশ্বজনীন পরিচয়। এই পরিচয়গুলা একই স্তরের না। তাই একটার সঙ্গে আরেকটার প্রতিযোগিতা তৈরি করা অজ্ঞতার পরিচয়। একজন মুসলমানের চূড়ান্ত নৈতিক আনুগত্য আল্লাহর প্রতি। কিন্তু সেই আনুগত্য তাকে নিজের ভাষা, দেশ, প্রতিবেশী ও ইতিহাসের দায়িত্ব থেকে মুক্ত করে না। বরং আরও ন্যায়পরায়ণ করে। ইসলাম বাংলারে মুছে ফেলতে বলে না, ইসলাম বলে, ভাষা ও সংস্কৃতি সত্য ও ন্যায়ের অধীন থাকবে।

এই সমস্যাগুলির সমাধান কীভাবে? সমাধান হইল নিজের পরিচয়ের স্তরগুলা ঠিকভাবে বোঝা। বাংলা আমার ভাষা। ইসলাম আমার ধর্ম ও নৈতিকতার ভিত্তি। বাংলাদেশ আমার জন্মভূমি। মুসলিম উম্মাহ আমার ধর্মীয়  ও নৈতিক সম্প্রদায়। আল্লাহর প্রতি আনুগত্য আমার চূড়ান্ত কেন্দ্র। এই কাঠামোর ভিতরে ভাষা থাকবে, কিন্তু উপাস্য হবে না। দেশ থাকবে, কিন্তু সত্যের ওপরে যাবে না। সংস্কৃতি থাকবে, কিন্তু নৈতিক বিচারের বাইরে থাকবে না। বাংলার মুসলিম ইতিহাসরে শিক্ষা, সাহিত্য ও জনপরিসরে ফিরাইয়া আনতে হবে। বাংলা ভাষায় শক্তিশালী ইসলামি দর্শন, সাহিত্য ও সমাজচিন্তা তৈরি করতে হবে।


রেফারেন্স:

Talal Asad, Formations of the Secular (2003)
Partha Chatterjee, The Nation and Its Fragments (1993)
Richard Eaton, The Rise of Islam and the Bengal Frontier (1993)
Rafiuddin Ahmed, The Bengal Muslims 1871–1906
বদরুদ্দীন উমর, The Emergence of Bangladesh
আহমদ ছফা, বাঙালি মুসলমানের মন
আনিসুজ্জামান, মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য
Benedict Anderson, Imagined Communities (1983)
Ernest Gellner, Nations and Nationalism (1983)

4.35
Review Overview
Summary

Pellentesque iaculis gravida nulla ac hendrerit. Vestibulum faucibus neque at lacus tristique eu ultrices ipsum mollis. Phasellus venenatis, lacus in malesuada pellentesque, nisl ipsum faucibus velit, et eleifend velit nulla a mi. Praesent pharetra semper purus, a vehicula massa interdum in.

The Pros
Eclectic and evocative soundtrack Rhythm gameplay Tough challenge
The Cons
Woefully out of place Pacing slows Exploration sequences feel drawn out
  • Design4.5
  • Usage4
  • Document4.5
Buy Now
Share URL copied

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট

Related Articles

বাংলা সাহিত্য ও ঔপনিবেশিক আধুনিকতা: রুচি, ভাষা ও ক্ষমতার প্রশ্ন

বাংলা সাহিত্যের প্রচলিত ইতিহাস পড়লে মনে হইতে পারে , বাংলা সাহিত্য উনিশ...

রবীন্দ্রনাথঃ সাংস্কৃতিক পবিত্রতা ও বাঙালি মুসলমানের পরিচয়-সংকট

বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে বিতর্ক মূলত সাহিত্যিক বিতর্ক নয়, এটি ক্ষমতা, শ্রেণি, সংস্কৃতি...

বুদ্ধদেব বসুর নজরুল বিচারঃ একটা বিলম্বিত জবাব

আবু সায়ীদ আইয়ুব থেকে শুরু করে, হুমায়ুন কবীর, বুদ্ধদেব বসু, কাজী আবদুল...