বিশ শতকের মুসলিম বৌদ্ধিক ইতিহাসে এমন কিছু বই আছে, যেগুলি শুধু নিজেদের সময়রে ব্যাখ্যা করে না, বরং সময়রে অতিক্রম কইরা ভবিষ্যতের জন্যও প্রশ্ন ছুইড়া রাখে। আলিজা ইজেতবেগোভিচের Islam Between East and West ঠিক এইরকম একটা বই। এইটা কোনো প্রচলিত ধর্মতাত্ত্বিক বই না, আবার কোনো রাজনৈতিক ইশতেহারও না। বরং এইটা মানুষ, সভ্যতা, সংস্কৃতি, ইতিহাস আর মানব অস্তিত্বের অর্থ নিয়া এক গভীর দার্শনিক অনুসন্ধান। আলিজা এই বইটা লিখছিলেন এমন এক সময়ে, যখন পৃথিবী মূলত দুইটা বড় মতাদর্শিক শক্তির মধ্যে ভাগ হইয়া গেছিল। একদিকে ছিল পুঁজিবাদী- বস্তুবাদী পশ্চিম। আরেকদিকে ছিল সমাজতান্ত্রিক আর মার্কসবাদী পূর্ব ইউরোপ। কিন্তু আলিজার কাছে এই সংঘাত শুধু রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক ছিল না বরং এইটা ছিল মানুষ আসলে কী- এই প্রশ্নে দুইটা ভিন্ন সভ্যতাগত জবাবের সংঘর্ষ।
এইখানেই তিনি একটা মৌলিক প্রশ্ন তুইলা ধরেন- মানুষ আসলে কে? মানুষ কি শুধু উন্নত একটা প্রাণী- যার জীবনের কেন্দ্র শুধু খাওয়া দাওয়া নিরাপত্তা আর অর্থনৈতিক উৎপাদনের সূত্র ধইরা ঘুরে? নাকি মানুষ শুধু একটা আধ্যাত্মিক সত্তা, যার আসল গন্তব্য হইলো এই পৃথিবীর বাইরে? আলিজার মতে, এই দুইটা ব্যাখ্যার কোনোটাই মানুষের পূর্ণ পরিচয় ধরতে পারে না। মানুষ একইসাথে মাটিরও, আবার রূহেরও। তার ভিতরে যেমন প্রবৃত্তি আছে, তেমনি নৈতিকতাও আছে; যেমন শরীর আছে, তেমনি আত্মাও আছে; যেমন ইতিহাস আছে, তেমনি চিরন্তনতার আকাঙ্ক্ষাও আছে। এই দ্বৈত গঠনই মানুষরে অন্য সব প্রাণী থেইকা আলাদা কইরা ফেলে। এই ধারণার গভীর কুরআনিক ভিত্তিও আছে। কুরআন মানুষরে একদিকে মাটি থেইকা সৃষ্ট বলতেছে, আবার অন্যদিকে বলতেছে আল্লাহ তার মধ্যে তাঁর রূহ ফুঁইকা দিছেন (সুরা আল-হিজর ১৫:২৯; সুরা আস-সাজদাহ ৩২:৯)। এই দুই উপাদানের মিলনেই মানুষের পূর্ণ পরিচয় তৈরি হয়। এই কারণেই মানুষ শুধু প্রকৃতির অংশ না; সে প্রকৃতির পর্যবেক্ষকও, ব্যাখ্যাকারীও, আবার নৈতিক দায়িত্বশীল সত্তাও।
বইটার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদানগুলির মধ্যে একটা হইলো এর নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি। আলিজার মতে, মানুষের শিল্প, সাহিত্য, ধর্ম, নৈতিকতা কিংবা আত্মত্যাগের প্রবণতারে শুধু জীববিজ্ঞান বা অর্থনীতির ভাষায় ব্যাখ্যা করা যায় না। একজন মা সন্তানের জন্য নিজের জীবন পর্যন্ত দিয়া দিতে পারে। একজন শিল্পী সৌন্দর্যের জন্য কষ্ট সহ্য করে। একজন মানুষ সত্যের জন্য জেল খাটে, নির্যাতন সহ্য করে, এমনকি মৃত্যুকেও বরণ কইরা নেয়। এই ঘটনাগুলি দেখায়, মানুষের ভিতরে এমন একটা বাস্তবতা কাজ করে- যেইটা কেবল জৈবিক অস্তিত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ না। এই কারণেই আলিজার কাছে ধর্ম কোনো কুসংস্কার না বরং মানুষের আত্মোপলব্ধির একটা মৌলিক প্রকাশ। মানুষ যখন প্রশ্ন করে- আমি কে? আমি কোথা থেইকা আসছি? মৃত্যুর পরে কী আছে বা কোথায় যামু? ন্যায়বিচার কেন গুরুত্বপূর্ণ? ঠিক সেই মুহূর্তেই সে ধর্মীয় প্রশ্নের ভেতরে প্রবেশ করে।
ইজেতবেগোভিচের সমালোচনার প্রধান লক্ষ্য আধুনিক ইউরোপীয় মানবতত্ত্ব। বিজ্ঞানি ও বুদ্ধিজীবী ডেকার্ত মানুষের পরিচয়কে চিন্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ করেন: “আমি চিন্তা করি, তাই আমি আছি।” কিন্তু ইজেতবেগোভিচের কাছে মানুষ শুধু চিন্তা করে না, মানুষ ভালোবাসে, কাঁদে, ত্যাগ করে, শিল্প সৃষ্টি করে এবং মৃত্যুর অর্থ নিয়ে প্রশ্ন করে। আবার ডারউইনের প্রাণীর বিবর্বতনবাদী দর্শন জীব অস্তিত্বের একটা ডাটাভিত্তিক ব্যাখ্যা দিলেও নৈতিকতা, শিল্প, ধর্ম কিংবা আত্মত্যাগের প্রশ্নের উত্তর দেয় না। যদি মানুষ কেবল বিবর্তিত প্রাণী হয়, তাইলে শহীদ, কবি কিংবা মায়ের আত্মত্যাগকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা হইবো? কার্ল মার্ক্স মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা ও উৎপাদন সম্পর্ককে কেন্দ্র কইরা ইতিহাসকে জাইনা নিতে বলেন। ইজেতবেগোভিচের মতে মানুষ শুধু রুটি, রুজি রোজগারের জন্য বাঁচে না। মানুষ অর্থ, মর্যাদা, ভালোবাসা এবং পরকালীন অর্থবোধের জন্যও বাঁচে। সোভিয়েত সমাজতন্ত্র অর্থনৈতিক সমতা তৈরির চেষ্টা করছিল, কিন্তু মানুষের আধ্যাত্মিক ক্ষুধার উত্তর দিতে পারে নাই বইলা সফল হইতে পারে নাই।
বইটার আর একটা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হইলো আধুনিকতার দ্বৈত সমালোচনা। বিশ শতকের মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশ পশ্চিমকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করছেন। অন্য অংশ পশ্চিমকে সম্পূর্ণ অনুকরণ করার চেষ্টা করছেন। ইজেতবেগোভিচ এই দুই অবস্থানের বাইরে দাঁড়ান। তিনি বিজ্ঞানকে গ্রহণ করেন কিন্তু বস্তুবাদকে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি আধ্যাত্মিকতাকে গ্রহণ করেন কিন্তু সন্ন্যাসবাদকে প্রত্যাখ্যান করেন। এই অবস্থান তাঁকে একদিকে মালেক বেননবী, অন্যদিকে মুহাম্মদ ইকবালের উত্তরসূরি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
বইটার আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হইলো Culture আর Civilization-এর পার্থক্য। আলিজার মতে Civilization মানুষের বাহ্যিক জীবন সংগঠিত করে। প্রযুক্তি, প্রশাসন, অর্থনীতি, উৎপাদন, নগরায়ন- এইগুলা সভ্যতার অংশ। অন্যদিকে Culture মানুষের অভ্যন্তরীণ জগতের প্রকাশ। শিল্প, সাহিত্য, ধর্ম, নৈতিকতা, সৌন্দর্যবোধ আর অর্থবোধ- এইগুলা সংস্কৃতির অংশ। সভ্যতা আমাদের উন্নত শহর দিতে পারে। সভ্যতা আমাদের দ্রুতগামী গাড়ি দিতে পারে। সভ্যতা আমাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর মহাকাশ প্রযুক্তিও দিতে পারে। কিন্তু জীবনের উদ্দেশ্য কী, সৌন্দর্যের মূল্য কী, ন্যায়বিচারের অর্থ কী- এই প্রশ্নগুলির উত্তর দিতে পারে না। এই উত্তর আসে কেবল সংস্কৃতি আর নৈতিকতার জগৎ থেইকা। আজকের পৃথিবীর দিকে তাকাইলেই এই কথার গুরুত্ব বোঝা যায়। আমাদের কাছে তথ্যের অভাব নাই, কিন্তু অর্থের(meaning) সংকট আছে। যোগাযোগের প্রযুক্তির অভাব নাই, কিন্তু সম্পর্কের সংকট আছে। উৎপাদনের অভাব নাই, কিন্তু মানসিক প্রশান্তির অভাব আছে। এই কারণেই আলিজার বিশ্লেষণ শুধু মুসলিম সমাজের জন্য না বরং সমগ্র আধুনিক সভ্যতার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
বিজ্ঞান আর ধর্মের সম্পর্ক নিয়াও আলিজার অবস্থান পরিস্কার। তিনি বিজ্ঞানরে ধর্মের শত্রু হিসাবে দেখেন না। বরং তিনি মনে করেন, বিজ্ঞান আর ধর্ম মানুষের অভিজ্ঞতার দুইটা আলাদা স্তর নিয়ে কাজ করে। বিজ্ঞান জিজ্ঞাস করে- পৃথিবী কিভাবে কাজ করে? ধর্ম জিজ্ঞাস করে- পৃথিবী কেন আছে?বিজ্ঞান মানুষ কিভাবে জন্ম নিছে- সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজে। ধর্ম মানুষ কেন জন্ম নিছে, সেই প্রশ্ন সামনে আনে। এই দুইটা প্রশ্ন একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী না; বরং পরস্পরের পরিপূরক। এই কারণেই আলিজার কাছে ইসলাম এমন একটা বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি, যেইটা জ্ঞান আর বিশ্বাস, যুক্তি আর ওহী, স্বাধীনতা আর দায়িত্ব, ব্যক্তি আর সমাজের মধ্যে একটা সৃজনশীল ভারসাম্য তৈরি করতে পারে।
স্বাধীনতার প্রশ্নেও তাঁর আলোচনা গভীর। মানুষ যদি স্বাধীন না হয়, তাহলে নৈতিকতার কোনো অর্থ থাকে না। মানুষ ভালো কাজ করতেছে কারণ সে বাধ্য- এইটা নৈতিকতা না। নৈতিকতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন মানুষের সামনে ভুল করার সুযোগও থাকে। এই কারণেই ইসলামে স্বাধীন ইচ্ছা আর নৈতিক দায়- দুইটাই সমান গুরুত্বপূর্ণ। কুরআনের ভাষায় মানুষ পৃথিবীতে খলিফা বা প্রতিনিধি (সুরা আল-বাকারাহ ২:৩০)। এই খিলাফত আধিপত্যের ধারণা না; বরং দায়িত্বের ধারণা। মানুষ পৃথিবী ব্যবহার করবে, কিন্তু ধ্বংস করবে না। সে জ্ঞান অর্জন করবে, কিন্তু অহংকারে ডুইবা যাইবো না। সে শক্তিশালী হইবো, কিন্তু দুর্বলদের ওপর জুলুম করবে না। এইখানেই Islam Between East and West একটা গুরুত্বপূর্ণ সভ্যতাভিত্তিক প্রস্তাব হইয়া উঠে।
এই বইটা আমাদের সামনে একটা বড় প্রশ্ন রাখে- প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত হওয়াই কি যথেষ্ট, যদি মানুষ তার নৈতিক কম্পাস হারাইয়া ফেলে? একবিংশ শতাব্দীর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জিন প্রকৌশল আর ভোক্তাবাদী সংস্কৃতির যুগে এই প্রশ্ন আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হইয়া উঠছে। মানুষ আজ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি তথ্য, বেশি প্রযুক্তি আর বেশি ক্ষমতার অধিকারী। কিন্তু একইসাথে সে জীবনের অর্থ, উদ্দেশ্য আর নৈতিকতার প্রশ্নে আরও বেশি অনিশ্চিত। এই বাস্তবতায় আলিজা আমাদের মনে করাইয়া দেন- মানুষের মর্যাদা তার উৎপাদনক্ষমতায় না। তার মর্যাদা তার নৈতিক চেতনায়। তার মূল্য তার ভোগক্ষমতায় না। তার মূল্য সত্য, সৌন্দর্য আর ন্যায়ের অনুসন্ধানে।
সবশেষে বলা যায়, Islam Between East and West ইসলামের একটি ব্যাখ্যা হওয়ার পাশাপাশি মানুষেরও একটি ব্যাখ্যা। এইটা এমন একটা বৌদ্ধিক প্রচেষ্টা যেইটা মানুষের ভিতরের দুই বাস্তবতা- মাটি আর রূহ, ইতিহাস আর চিরন্তনতা, শরীর আর আত্মা- এই দুইয়ের মধ্যে একটা সৃজনশীল সেতুবন্ধন তৈরি করতে চায়। সম্ভবত এই কারণেই বইটা প্রকাশের কয়েক দশক পরেও তার আবেদন হারায় নাই। কারণ প্রযুক্তি বদলায়, রাজনৈতিক ব্যবস্থা বদলায়, অর্থনৈতিক কাঠামো বদলায়; কিন্তু মানুষের মৌলিক প্রশ্নগুলা একই থাকে। আমি কে? আমি কেন এখানে? আমার জীবনের অর্থ কী? আলিজা ইজেতবেগোভিচের বড় অবদান সম্ভবত এইখানেই। Islam Between East and West এই প্রশ্নগুলোর সহজ উত্তর দেয় না; বরং আমাদেরকে আরও গভীরভাবে প্রশ্ন করতে শেখায়। আর একটি মহান বইয়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য সম্ভবত এইটাই।
_________________________________________________________
রেফারেন্সঃ
আলিজা ইজেতবেগোভিচ (১৯৮৪), Islam Between East and West
মুহাম্মদ ইকবাল (১৯৩০), The Reconstruction of Religious Thought in Islam
হান্না আরেন্ট (১৯৫৮), The Human Condition
চার্লস টেইলর (২০০৭), A Secular Age
মালেক বেননবী (১৯৪৮), The Conditions of the Renaissance
সৈয়দ হোসেইন নাসর (১৯৮১), Knowledge and the Sacred
Leave a comment