যদি সূরাহ ইখলাস আমাদের শেখায়, এই বিশ্বজগতের একমাত্র পরম ও স্বাধীন সত্তা হলো আল্লাহ, তাহলে সূরা ফাতিহা শেখায়, মানুষ সেই পরম সত্তার সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক গড়ে তুলবে।
‘আলহামদুলিল্লাহি রব্বিল আলামীন’: বাস্তবতা একটি ধারাবাহিক রব্বানী প্রক্রিয়া
‘রব’ শব্দটি কেবল ‘প্রভু’ অর্থে সীমাবদ্ধ নয়। আরবি ভাষায় এর মধ্যে রয়েছে লালন করা, বিকশিত করা, ধাপে ধাপে পরিপূর্ণতার দিকে পরিচালিত করার বিষয়টি। Mafatih al-Ghayb-এ ইমাম ফখরুদ্দীন আর-রাযী ব্যাখ্যা করেন যে রুবুবিয়্যাহ (Rubūbiyyah) মানে এমন এক ধারাবাহিক সৃষ্টিশীল ও পরিচালনামূলক সম্পর্ক, যার মাধ্যমে সৃষ্টি প্রতিটি মুহূর্তে টিকে থাকে। এখানে পশ্চিমা দর্শনের সাথে একটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। আধুনিক পাশ্চাত্য চিন্তায়, বিশেষ করে enlightenment(আলোকায়ন) পরবর্তী যুগে বিশ্বকে অনেক সময় একটি স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র (mechanistic universe) হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে, যেখানে একবার নিয়ম প্রতিষ্ঠিত হলে ব্যবস্থাটি নিজেই চলতে থাকে। কিন্তু সূরাহ আল ফাতিহার ‘রব’ ধারণা সেই ধারণাকে অতিক্রম করে। এখানে সৃষ্টি এককালীন ঘটনা নয়, বরং নিরবচ্ছিন্ন নির্ভরতার একটি বাস্তবতা।
‘আর-রাহমানুর রাহিম’: আমাদের অস্তিত্বের নৈতিক ব্যাকরণ
আধুনিক বৈজ্ঞানিক বর্ণনা আমাদের বলতে পারে কীভাবে (how) কোনো প্রক্রিয়া ঘটে, কিন্তু কেন (why) মূল্য, নৈতিকতা বা অর্থের অস্তিত্ব রয়েছে- তার উত্তর দিতে পারে না। এই সীমাবদ্ধতার কথাই দার্শনিক Alasdair MacIntyre আধুনিক নৈতিকতার সংকট বিশ্লেষণে তুলে ধরেছেন। সূরাহ ফাতিহা এখানে মৌলিকভাবে দাবি করে- বিশ্বব্রহ্মাণ্ড নৈতিকভাবে নিরপেক্ষ নয়। তার উৎসই রহমত, করুণা। অতএব নৈতিকতা বাস্তবতার সঙ্গে অন্তর্নিহিতভাবে যুক্ত।
‘মালিকি ইয়াওমিদ্দীন’: ইতিহাসের ঊর্ধ্বে সার্বভৌমত্ব
এই আয়াতটি কেবল আখিরাতের সংবাদ নয়, এটি ক্ষমতা ও ইতিহাস সম্পর্কে একটি মৌলিক দার্শনিক ঘোষণা যেন। আধুনিক রাজনৈতিক দর্শন প্রায়ই রাষ্ট্র, জনগণ, বাজার অথবা ব্যক্তিকে সার্বভৌমতার উৎস হিসেবে বিবেচনা করে। কিন্তু সূরাহ ফাতিহা ঘোষণা করে- চূড়ান্ত সার্বভৌমত্ব সমাজ বা ইতিহাসের ভেতরে নয়, ইতিহাসের বিচারক সেই সত্তা যিনি সময় ও ইতিহাসেরও ঊর্ধ্বে। এই কারণে ইসলামে কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা, সভ্যতা বা মতাদর্শকে চূড়ান্ত মর্যাদা দেওয়া হয় না। কারণ সবই আল্লাহ’র আওতাধীন ও বিচারাধীন। এই দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের তৈরি প্রতিটি ক্ষমতার কাঠামোকে ধ্বংস করে দেয়।
‘ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাস্তাঈন’: আত্মকেন্দ্রিকতার অবসান
আধুনিকতা বলে- নিজের পরিচয় নিজে নির্ধারণ করো, নিজের সত্য নিজে নির্মাণ করো। নিজের জীবন নিজেই অর্থপূর্ণ করো। এই ধারণার কেন্দ্রে রয়েছে মানুষকে autonomous self বা স্বয়ংসম্পূর্ণ সত্তা হিসেবে দেখা- অর্থাৎ এমন এক সত্তা, যে নিজের পরিচয়, সত্য, নৈতিকতা ও জীবনের অর্থ নিজেই নির্ধারণ করতে পারে এবং কোনো পরম কর্তৃত্বের ওপর নির্ভরশীল নয়। কিন্তু কুরআন এই ধারণাকে গ্রহণ করে না। বরং কুরআন ঘোষণা করে, মানুষ মর্যাদাবান ও স্বাধীন হলেও সে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। তার অস্তিত্ব, জ্ঞান, নৈতিকতা ও পথনির্দেশের চূড়ান্ত ভিত্তি- আল্লাহ। ইবাদত মানে কেবল ধর্মীয় আচার নয়, বরং নিজের অস্তিত্বকে সেই সত্তার দিকে অভিমুখী করা, যিনি পরম।
Istiʿānah একটি ইসলামি পরিভাষা, যার আক্ষরিক অর্থ হলো ‘সাহায্য প্রার্থনা করা’ বা ‘সহায়তা চাওয়া’।ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, ইসতিয়ানাহ বা সাহায্য চাওয়ার প্রকৃত দাবিদার একমাত্র আল্লাহ। অর্থাৎ, কোনো কাজ সম্পন্ন করার জন্য বা বিপদ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে সরাসরি সাহায্য প্রার্থনা করা। ‘ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাস্তায়ীন (আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত করি এবং তোমারই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি) এখানে ‘নাস্তায়ীন’ শব্দটি ইসতিয়ানাহ থেকেই এসেছে। অর্থাৎ, বান্দা স্বীকার করে নিচ্ছে যে ইবাদত ও জীবনের সকল প্রয়োজনে তার একমাত্র আশ্রয়স্থল হলো আল্লাহ। এখানেই সূরা ফাতিহা মানুষের অহংকে ধ্বংস করে দেয়, মানুষকে নয়। ইসলাম মানুষের মর্যাদা অস্বীকার করে না বরং তার যথার্থ অবস্থান নির্ধারণ করে।
‘ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকীম’: সত্য স্থির নয়, অভিমুখ স্থির
মুসলমানেরা প্রতিদিন এই দোয়া পুনরাবৃত্তি করে। প্রশ্ন হলো- যদি একজন মুমিন ইতিমধ্যেই ঈমানের পথে থাকে, তবে প্রতিদিন কেন আবার হিদায়াত চাইবে? কারণ ইসলামে হিদায়াত কোনো এককালীন ঘটনা নয়। এটি একটি নিরবচ্ছিন্ন পুনঃঅভিমুখীকরণ (continuous re-orientation)। এই ধারণাটি আধুনিক কগনিটিভ সায়েন্সের সঙ্গে একটি আকর্ষণীয় সাদৃশ্য তৈরি করে। মানবমস্তিষ্ক সবসময় নতুন তথ্যের আলোকে নিজের উপলব্ধিকে সংশোধন করে। কিন্তু কুরআন এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যোগ করে- সংশোধনের মানদণ্ড মানুষের ভেতরে নয়- আল্লাহর প্রদত্ত সত্যে। অতএব, আত্ম-সংশোধন যথেষ্ট নয়, আল্লাহ’র পথে আত্ম-সংশোধনই প্রকৃত হিদায়াত।
‘সিরাতাল্লাযীনা আন’আমতা আলাইহিম’: ইতিহাস হলো নৈতিক অভিমুখের ইতিহাস
সূরা ফাতিহার শেষাংশ মানবজাতিকে কেবল দুটি দলে ভাগ করে না বরং দুটি অস্তিত্বগত অভিমুখে ভাগ করে। একটি পথ এমন, যা আল্লাহর নৈকট্যের দিকে নিয়ে যায়, অন্যটি জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও সত্য থেকে বিচ্যুত, অথবা অজ্ঞতার কারণে পথ হারিয়েছে। অতএব, ইতিহাস কেবল ঘটনাবলির ধারাবাহিকতা নয়, এটি অভিমুখের ইতিহাস। যদি সূরা ইখলাস আমাদের শেখায়- যে পরম বাস্তবতা একমাত্র আল্লাহ, তবে সূরা ফাতিহা শেখায় যে মানুষের স্বাধীনতা তার স্বায়ত্তশাসনে নয়, বরং তার সঠিক অভিমুখে, তার সঠিক কেন্দ্র নির্বাচনে।
এই অর্থে সূরা ফাতিহা কেবল একটি দোয়া নয়। এটি একটি অস্তিত্বগত পুনঃসংগঠন (existential reconfiguration)। এটি মানুষের অহংকে কেন্দ্র থেকে সরিয়ে বাস্তবতার প্রকৃত কেন্দ্রে- আল্লাহর দিকে- পুনঃঅভিমুখী করে। ফলে তাওহীদ এখানে কেবল বিশ্বাসের বিষয় থাকে না। এটি জ্ঞান, নৈতিকতা, স্বাধীনতা, সভ্যতা এবং মানবচেতনার মৌলিক সংগঠক শক্তিতে পরিণত হয়।
রেফারেন্সঃ
- সুরাহ আল ফাতিহা- আল কুরআন,
- ইবনে কাসির- তাফসির ইবনে কাসির
- ইমাম ফখরুদ্দীন আর-রাযী- মাফাতীহুল গায়ব
- আল-তাবারি- জামি’ আল-বায়ান
- মুহাম্মদ আসাদ- The Message of the Qur’an
- Ludwig von Bertalanffy- General System Theory
- Alasdair MacIntyre- After Virtue
Leave a comment