ইসলামের ইতিহাস ও কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী (আল-মায়িদাহ, আয়াত ২৭-৩১), হাবিল ও কাবিলের মধ্যে দ্বন্দ্বের মূল সূত্রপাত হইছিল কোরবানিকে কেন্দ্র কইরা। হাওয়া (আঃ) প্রতি গর্ভে একটি পুত্র ও একটি কন্যা সন্তান জন্ম দিতেন। নিয়ম ছিল এক গর্ভের ছেলের সাথে অন্য গর্ভের মেয়ের বিবাহ দেওয়া। কাবিলের সাথে জন্ম নেওয়া যমজ বোনটি খুব সুন্দর ছিল। কাবিল চাইতেছিলো নিজের যমজ বোনকেই বিয়া করতে। আদম (আঃ)কাবিলকে আল্লাহর বিধান বুঝাইয়া দিলেন যে, সে তার নিয়মের বাইরে নিজের যমজ বোনকে বিয়ে করতে পারবে না। এই বিরোধ দূর করার জন্য হযরত আদম (আঃ) দুইজনকে কোরবানি করার নির্দেশ দিলেন। যার কোরবানি কবুল হবে, তাকেই বিজয়ী বইলা ধরা হবে। হাবিল পেশাদার পশু পালক ছিলেন, তিনি তাঁর পালের সবচেয়ে সুস্থ, সুন্দর ও নাদুস-নুদুস একটি দুম্বা আল্লাহর উদ্দেশ্যে কোরবানি করলেন। কাবিল কৃষিকাজ করতেন, তিনি তাঁর উৎপাদিত ফসলের মধ্য থেইকা সবচেয়ে নিকৃষ্ট, পচা শস্য বা ফল কোরবানির জন্য বাইছা নিলেন। আসমান থেইকা আগুন আইসা হাবিলের কোরবানি কবুল করে তা ছাই কইরা দিল, আর কাবিলের কোরবানি যেমন ছিল তেমনই পইড়া রইল, অর্থাৎ তা কবুল হয় নাই।
তবে কোরআন এই বিয়া করার বিরোধকে কেন্দ্রীয় বিষয় বানায় নাই, বানাইছে ঈর্ষা ও সহিংসতাকে। কারণ কোরআনের আগ্রহ ইতিহাসের ঘটনাবিবরণে না, মানুষের নফসের রূপান্তরে। বাহ্যিক দ্বন্দ্ব ছিল একটা উপলক্ষ। আসল বিপর্যয় শুরু হইছিলো যখন কাবিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিজেরে সংশোধন না কইরা, হাবিলের অস্তিত্বকেই সমস্যা মনে করল। এইখানেই হাবিল-কাবিলের ঘটনা পারিবারিক বিরোধের ঘটনা থেইকা মানবসভ্যতার প্রথম নৈতিক সংকটের ঘটনায় পরিণত হয়।
কোরআনে হাবিল ও কাবিলের নাম সরাসরি বলা হয় নাই। সূরা আল-মায়িদাহর ২৭–৩১ নম্বর আয়াতে আদমের দুই পুত্রের কথা বলা হইছে, ইসলামী ঐতিহ্যে তারা হাবিল ও কাবিল নামে পরিচিত। কিন্তু কোরআনের কাছে তাদের ব্যক্তিগত নামের চাইতে বড় হইল তাদের ভিতরের দুই ধরনের মানুষ, দুই ধরনের নফস(প্রবৃত্তি), দুই ধরনের নৈতিক অবস্থান, দুই ধরনের মানবিক সম্ভাবনা। এই কারণে হাবিল-কাবিলের ঘটনা শুধু দুই ভাইয়ের ঘটনা না, এইটা মানুষের ইতিহাসের একটা গভীর নৃতাত্ত্বিক ঘটনা। (মানবজাতির উৎপত্তি, শারীরিক বিকাশ, সমাজ, সংস্কৃতি, আচরণ, এবং অতীত ও বর্তমানের মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ে বৈজ্ঞানিক ও তাত্ত্বিক যে গবেষণা করা হয় তাকেই নৃতাত্ত্বিক বলা হয়)। এই ঘটনা আমাদেরকে বলে- মানুষ কিভাবে মানুষরে হত্যা করতে শেখে, ক্ষমতা ও ঈর্ষা কিভাবে সম্পর্করে ধ্বংস করে, আর নৈতিক মানুষ কিভাবে সহিংসতার সামনে দাঁড়ায়। এই ঘটনা বলার সময় কোরআন শুরুতেই একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেঃ ‘তাদের কাছে আদমের দুই পুত্রের কাহিনি সত্যভাবে পাঠ কর(৫:২৭)।’ এখানে সত্যভাবে কথাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোরআন কাহিনি বলতেছে, কিন্তু নিছক কাহিনি হিসাবে না, মানুষকে সত্য বোঝার জন্য। এখানে ইতিহাসের এই ঘটনাটা যেন মানুষের অস্তিত্বের একটা পরিস্কার আয়না।
হাবিল ও কাবিল দুইজনই আদমের সন্তান, একই পরিবার, একই সমাজ, পৃথিবী। কিন্তু তাদের নৈতিক গঠন এক না। দুজনই কোরবানি দিল কিন্তু ‘তাদের একজনের কাছ থেকে তা গ্রহণ করা হলো, আর অন্যজনের কাছ থেকে গ্রহণ করা হলো না(৫:২৭)।’ এইখানে কোরআন খুব সূক্ষ্ম একটা বিষয় সামনে আনছে। মানুষের বাহ্যিক কাজ একই হইতে পারে, কিন্তু কাজের ভিতরের মানুষ একই রকম নাও ভাবতে পারে। কোরবানি একটা ritual; কিন্তু ritual-এর ভিতরে আন্তরিকতা, সততা, নিষ্ঠা আছিলো কিনা – সেইটাই আসল দেখার বিষয়।
কাবিল বলল- ‘আমি অবশ্যই তোমাকে হত্যা করব(৫:২৭)।’ এইখানেই মানব ইতিহাসের একটা ভয়ংকর ঘটনা ঘটলো। কেন? কারণ অন্যজনের নৈতিক সাফল্য যখন নিজের অস্তিত্বের জন্য হুমকি মনে হয়, তখন মানুষ অন্যজনকে ধ্বংস করতে চায়। হাবিলের কোরবানি গ্রহণ করা হইল, এই ঘটনাটা কাবিলের ভিতরে একটা টেনশন, একটা সংকট তৈরি করলো। সে এমন কইরা ভাবল না যে ‘আমি কোথায় ভুল করলাম?’ বরং ভাবল, ‘তোমারে সরাইয়া দিলেই আমার সমস্যা শেষ।’ এই মানসিকতা আজও মানুষের মধ্যে আছে। অন্যের সৌন্দর্য, সাফল্য, সম্মান, জ্ঞান, ভালোবাসা, জনপ্রিয়তা- দেইখা মানুষ দুইটা পথ নিতে পারে। নিজের নফসকে কন্ট্রোল করতে পারে, অথবা অন্য মানুষটাকে ধ্বংস করার মানসিকতা লালন করতে পারে। কাবিল দ্বিতীয় পথটা বাইছা নিল। এইখানেই ঈর্ষা ব্যক্তিগত অনুভূতি থেইকা রাজনৈতিক ও সামাজিক সহিংসতায় পরিণত হইলো।
হাবিলের উত্তরটা কোরআনের অন্যতম গভীর নৈতিক বক্তব্য: “তুমি যদি আমাকে হত্যা করার জন্য আমার দিকে তোমার হাত বাড়াও, তবুও আমি তোমাকে হত্যা করার জন্য তোমার দিকে আমার হাত বাড়াব না, আমি বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করি(৫:২৮)।’ এই কথাটা শুধু অহিংসার কথা না, এইটা মানুষের স্বাধীন নৈতিকতাবোধের অসধারণ প্রকাশ। কাবিল কী করবে- এইটা হাবিল নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, কিন্তু কাবিলের কাজের প্রতিক্রিয়ায় সে কী করবে- এইটা তার নিজের সিদ্ধান্ত। অর্থাৎ অন্য মানুষের সহিংসতা আমার নৈতিকতা নির্ধারণ করবে না। এইখানেই হাবিল কাবিলের চাইতে আলাদা মানুষ হইয়া ওঠে।
‘অতঃপর তার নফস(প্রবৃত্তি) তাকে তার ভাইকে হত্যা করার প্ররোচনা দিল এবং সে তাকে হত্যা করল। ফলে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হলো(৫ঃ৩০)।’ মানব ইতিহাসের প্রথম এই হত্যা শুধু শারীরিক শক্তি প্রয়োগের ফল ছিলো না, বরং এইটা ছিলো মানুষের ভেতরের হিংসা, অহংকার এবং লোভের মানসিকতার এক মারাত্মক পরিণতি। নৃবিজ্ঞান ও মনস্তত্ত্বের ভাষায় মানুষের ভেতরের এই অন্ধকার দিকটাই অপরাধের জন্ম দেয়। কাবিলের নৈতিক ও বিবেকবুদ্ধিসম্পন্ন অংশটি হাইরা গেছিলো এবং তার নফস(প্রবৃত্তি) তার ওপর এতটাই প্রাধান্য বিস্তার করছিলো যে, সে নিজের আপন ভাইকে হত্যা করার মতো জঘন্য কাজটিকেও নিজের কাছে সহজ করে নিছিলো।
মানুষ হঠাৎ করে হত্যাকারী হয় না। তার ভিতরের একটা প্রক্রিয়া থাকে, যা ধীরে ধীরে তাকে সেই জায়গায় নিয়া যায়, তখন নফস(প্রবৃত্তি) নিজের কাজকে justify করতে শেখে। তখন মানুষ অন্য মানুষকে আর মানুষ হিসাবে দেখে না, মনে করে প্রতিদ্বন্ধি, তারপর সহিংসতা তার কাছে স্বাভাবিক হইয়া যায়। আজকের দেশে দেশে যুদ্ধ, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, রাজনৈতিক হত্যা কিংবা ব্যক্তিগত সহিংসতা সব জায়গাতেই এই psychological mechanism কাজ করে। প্রথমে মানুষ অন্য মানুষকে অপর(other) বানায়। তারপর তাকে ঘৃণার যোগ্য বানায়, তারপর তাকে ধ্বংস করা নৈতিকভাবে বৈধতা তৈরি করে।।
হাবিলের কথার শেষ অংশটা আরও গুরুত্বপূর্ণঃ ‘আমি বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করি(৫:২৮)।’ এখানে আরাবিক ‘খওফ’ শুধু ভয় না। এর মধ্যে নৈতিক জবাবদিহিতার চেতনা কাজ করে। হাবিল জানে কাবিলের চোখ হয়তো তাকে বিচার করবে, কিন্তু তার চূড়ান্ত বিচারক কাবিল না। এইখানে কোরআনিক freedom-এর একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে। মানুষ স্বাধীন মানে সে যা খুশি তাই করবে, এইটা কোরআনিক freedom না, বরং প্রকৃত স্বাধীনতা হইলো, মানুষের চাপ, ঈর্ষা, প্রতিশোধ, ক্ষমতার আকর্ষণ- এইসবের মধ্যেও নিজের নফসকে কন্ট্রোল করা, নিজের নৈতিক সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারা। হাবিল তার নফসের কাছে জয়ী, অন্যদিকে কবিল তার নফসের কাছে পরাজিত।
এইখানে কাবিলকে শুধু ‘খারাপ মানুষ’ বানাইলে কোরআনের কাহিনিটা ছোট হয়ে যায়। কাবিল আসলে মানুষের একটা সম্ভাবনা। মানুষের ভিতরে হাবিলও আছে, কাবিলও আছে। একদিকে আছে আল্লাহভীতি, সংযম, আত্মনিয়ন্ত্রণ, অন্যের জীবনের প্রতি সম্মান। অন্যদিকে আছে অহংকার, ঈর্ষা, প্রতিশোধ, আধিপত্য, ও সহিংসতা। এই দুই সম্ভাবনার টানাপড়েনই মানুষের ইতিহাস। তাই হাবিল-কাবিলের গল্প আদমের দুই সন্তানের গল্প হওয়ার পাশাপাশি মানুষের ভিতরের দুই সম্ভাবনার গল্প। হাবিল ও কাবিলের ঘটনার ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই, কাবিল তার ভাই হাবিলের ওপর নিজের আধিপত্য(dominion) বজায় রাখতে চাইছিলো এবং যখন সে দেখল নিয়মের বেড়াজালে তার সেই ক্ষমতা খর্ব হইতেছে, তখন সে সহিংসতার(violence) আশ্রয় নিলো। অর্থাৎ, এই পুরা ঘটনাটি মূলত একটা আদিম power relation (ক্ষমতার সম্পর্ক) ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের নিখুঁত উদাহরণ। এই অর্থে হাবিল-কাবিলের ঘটনা শুধু murder-এর কাহিনি না, এইটা আধিপত্য, ক্ষমতা, সহিংসতার প্রথম মানসিক কাঠামোর কাহিনি। পরবর্তীকালে রাষ্ট্র, গোত্র, সাম্রাজ্য, যুদ্ধ সব জায়গায় আমরা এইটার বড় বড় সংস্করণ দেখি। কিন্তু কোরআন আমাদের ইতিহাসের বড় যুদ্ধ দিয়ে শুরু করে না। শুরু করে দুই ভাই দিয়া, কারণ সভ্যতার সহিংসতা বোঝার আগে মানুষের ভিতরের সহিংসতা বুঝতে হয়।
হাবিল ও কাবিলের ঘটনা মানব ইতিহাসের প্রথম murder story হিসাবে পড়লে আমরা একটা ঘটনা পাই। কিন্তু কোরআনিক মানবতত্ত্ব হিসাবে পড়লে আমরা মানুষকে পাই। মানুষের ভিতরে ঈর্ষা, অহংকার আছে, আবার আল্লাহভীতিও আছে। ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা আছে, আবার আত্মসংযমও আছে। অন্যকে ধ্বংস করার প্রবণতা আছে, আবার নিজের নফসকে কন্ট্রোল করার ক্ষমতাও আছে।
সহায়ক পাঠঃ
- আল-কুরআন, সূরা আল-মায়িদাহ ৫:২৭–৩২।
- আল-কুরআন, সূরা আল-বাকারা ২:৩০–৩৯।
- ইবন কাসীর, Tafsir al-Qur’an al-Azim।
- মুহাম্মদ আসাদ, The Message of the Qur’an।
- Erich Fromm, The Anatomy of Human Destructiveness।
Leave a comment