মানুষের ইতিহাস কোথা থেইকা শুরু হইছে?, এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়া বিভিন্ন সভ্যতা বিভিন্ন কাহিনি নির্মাণ করছে। কোথাও মানুষকে দেবতাদের অভিশাপের ফল হিসাবে দেখা হইছে, কোথাও তাকে বিবর্তনের এক জৈবিক ঘটনা বইলা ব্যাখ্যা করা হইছে, আবার কোথাও বলা হইছে মানুষ জন্মগতভাবেই পাপী। কিন্তু কুরআন মানুষের সূচনা সম্পর্কে এক ভিন্নতর বয়ান উপস্থাপন করে। এই বয়ানের কেন্দ্রে আছে আদম, শয়তান, নিষিদ্ধ বৃক্ষ, তাওবা ও আল্লাহর রহমত। গভীরভাবে পড়লে বোঝা যায়, এইটা শুধু মানুষের প্রথম ভুলের কাহিনি না, বরং মানুষের প্রথম নৈতিক, বৌদ্ধিক ও সভ্যতাগত সংকটের কাহিনি। এই কাহিনির মাধ্যমে কুরআন মানুষের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে- মানুষ আসলে কার নির্দেশনায় জীবন পরিচালনা করবে? আল্লাহর ওহির আলোকে, নাকি নিজের অহংকার ও আত্মকেন্দ্রিকতার আলোকে? এই প্রশ্নের উত্তরই ব্যক্তি, সমাজ ও সভ্যতার চরিত্র নির্ধারণ করে।
আধুনিক পৃথিবীতে স্বাধীনতা বলতে সাধারণত বোঝানো হয় নিজের ইচ্ছামতো বাঁচার অধিকার। মানুষ নিজেই নিজের সত্য নির্ধারণ করবে, নিজের নৈতিকতা তৈরি করবে, নিজের পরিচয় নির্মাণ করবে। আলোকায়নের পর পশ্চিমা চিন্তায় এই স্বায়ত্তশাসিত মানুষকেই আধুনিকতার নায়ক হিসেবে কল্পনা করা হইছে। কিন্তু কুরআন স্বাধীনতার একটি ভিন্ন ধারণা সামনে আনে। কী সেইটা? কুরআন মানুষকে স্বাধীনতা দিছে, কিন্তু সেই স্বাধীনতা সীমাহীন না। মানুষ সিদ্ধান্ত নিতে পারে, কিন্তু সে নিজে সত্যের চূড়ান্ত উৎস হইতে পারে না। সে আল্লাহর সৃষ্টি, তাই তার স্বাধীনতা আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কের ভেতরেই অর্থপূর্ণ। আল্লাহ বলেন, “আমি তাকে পথ দেখিয়েছি, এখন সে চাইলে কৃতজ্ঞ হতে পারে, চাইলে অকৃতজ্ঞ হতে পারে” (সূরা আল ইনসান ৭৬:৩)। অন্যত্র তিনি বলেন, “সত্য তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে এসেছে। এখন যে ইচ্ছা করে ঈমান আনুক, আর যে ইচ্ছা করে অস্বীকার করুক” (সূরা আল কাহফ ১৮:২৯)। এই আয়াতগুলি প্রমাণ করে, মানুষ যন্ত্র না। তার ইচ্ছাশক্তি আছে, বাইছা নেওয়ার ক্ষমতা আছে কিন্তু সেই ক্ষমতা আল্লাহর সার্বভৌম ক্ষমতার বাইরে স্বাধীন কোনো শক্তি না। কুরআনের ভাষায় স্বাধীনতা মানে সীমাহীন আত্মনির্ভরতা, বরং সত্যকে গ্রহণ করার নৈতিক ক্ষমতা। এ কারণেই নিষিদ্ধ বৃক্ষের কাছে না যাওয়ার নির্দেশ মানুষের প্রথম নৈতিক পরীক্ষা। আল্লাহ মানুষের স্বাধীনতা কাইড়া নেন নাই, বরং তারে স্বাধীনতার সঠিক ব্যবহার শিখাইছেন।
আমরা সাধারণত বৃক্ষটির দিকেই বেশি মনোযোগ দিই। কিন্তু কুরআনের মূল গুরুত্ব বৃক্ষ নয়, বরং তাকে কেন্দ্র কইরা গইড়া ওঠা চিন্তার সংঘর্ষে। আল্লাহ আদমকে বলছিলেন, “এই বৃক্ষের নিকট যেয়ো না” (সূরা আল বাকারা ২:৩৫)। কিন্তু শয়তান মানুষকে ওয়াসওয়াসা (কুমন্ত্রণা, দ্বিধাদ্বন্দ্ব, সন্দেহপ্রবণতা) দিল, “আমি কি তোমাকে এমন এক বৃক্ষের কথা বলব, যা অমরত্ব দেবে এবং এমন এক রাজত্ব দেবে, যা কখনো ক্ষয় হবে না?” (সূরা ত্বা হা ২০:১২০)। এইখানে জ্ঞানের দুইটা উৎস মুখোমুখি দাঁড়াইছে। একদিকে ওহি, অন্যদিকে প্রতারণা। একদিকে আল্লাহর নির্দেশ, অন্যদিকে অহংকারের যুক্তি। এই সংঘর্ষের মধ্য দিয়াই মানব সভ্যতার প্রথম বৌদ্ধিক দ্বন্দ্বের সূচনা ঘটছে। প্রশ্নটি কেবল বৃক্ষের কাছে যাওয়া বা না যাওয়া না, বা ফল খাওয়া বা না খাওয়ার না, প্রশ্নটি হইলো মানুষ কোন জ্ঞানের উৎসকে তার জীবনবোধের ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করবে।
শয়তানের সবচেয়ে বড় শক্তি প্রয়োগ নয়, শক্তি তার ভাষা। সে মানুষকে জোর করে নাই। সে একটা নতুন গল্প বানাইছে, সত্যের সঙ্গে মিথ্যা মিশাইছে। সে কসম কইরা আদম ও হাওয়াকে বলেছিল, “আমি অবশ্যই তোমাদের কল্যাণকামী” (সূরা আল আরাফ ৭:২১)। এইখানে একটা গভীর মানবিক ও সমাজতাত্ত্বিক সত্য আছে। ক্ষমতা খুব কম সময়ই নিজেকে নিপীড়ন হিসেবে উপস্থাপন করে বরং তা প্রায়ই মুক্তি, উন্নয়ন, অগ্রগতি, নিরাপত্তা বা কল্যাণের ভাষা ব্যবহার করে। ভাষা একই থাকতে পারে, কিন্তু উদ্দেশ্য সব সময় একই থাকে না। শয়তানের প্রতারণাও ছিল এমন। সে অবাধ্যতার ভাষায় কথা বলে নাই, বরং কল্যাণ, অমরত্ব ও উন্নতির ভাষায় আহ্বান জানাইছে। এই কারণেই শয়তান শুধু ধর্মীয় কাহিনির একটা চরিত্র না, সে প্রতিটি যুগের মিথ্যা মতাদর্শ, আত্মপ্রবঞ্চনা, অহংকার ও প্রলোভনের প্রতীক।
কুরআনের এই কাহিনি আজকের পৃথিবীর সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। শয়তান আদমকে যে প্রতিশ্রুতি দিছিল, তার ভেতরে ছিল অমরত্ব ও ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা। আধুনিক সভ্যতার কিছু প্রবণতাও মানুষকে প্রায় একই ধরনের স্বপ্ন দেখায়। প্রযুক্তি মানুষকে দীর্ঘায়ু ও নিয়ন্ত্রণের মোহতে আবিষ্ট করে, ভোগবাদ সুখকে বস্তুগত প্রাচুর্যের সঙ্গে একাকার করে, আর বাজার সংস্কৃতি মানুষকে বলে আরও ভোগ করো, তাইলেই পূর্ণতা পাবে। উত্তর আধুনিকতার কিছু ধারা আবার বলে, চূড়ান্ত সত্য বলে কিছু নাই, নিজের পরিচয় নিজেই নির্মাণ করো। অবশ্য আধুনিকতার সব দিককে একরকমভাবে বিচার করা ঠিক না, তবু মানুষ যখন নিজেরে নৈতিকতার একমাত্র উৎস, সত্যের একমাত্র মানদণ্ড এবং নিজের ভাগ্যের একমাত্র নির্মাতা মনে করতে শুরু করে, তখন সেই ধারণা শয়তানের প্রস্তাবিত আত্মনির্ভরতার ভ্রমের সঙ্গে একটা মিল তৈরি করে। কুরআন এই ভ্রমের বিরোধিতা করে। মানুষ স্বাধীন, কিন্তু স্বয়ংসম্পূর্ণ না, সে শক্তিমান কিন্তু সর্বশক্তিমান না। সে জ্ঞানী কিন্তু সর্বজ্ঞ না। এখানেই তাওহীদ(আল্লাহর একত্ব) মানুষের অহংকারের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়।
আদম(আঃ) ভুল করছিলেন, কিন্তু কুরআন কোথাও তাকে চিরন্তন পাপী হিসেবে উপস্থাপন করে না। কুরআন দেখায়, তিনি নিজের ভুল বুঝতে পারছিলেন, নিজের দোষ স্বীকার করছিলেন এবং আল্লাহর দিকে ফিরা গেছেন। বাবা আদম ও মা হাওয়া দোয়া করেছিলেন, “হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা নিজেদের প্রতি অন্যায় করেছি। আপনি যদি আমাদের ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি দয়া না করেন, তবে আমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব” (সূরা আল আরাফ ৭:২৩)। এইখানেই আদম ও শয়তানের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য। উভয়েই আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করছিল, কিন্তু একজন অহংকার বাইছা নিছিল, আরেকজন তাওবা বাইছা নিছিলেন। শয়তান নিজের অবস্থানকে ন্যায্য প্রমাণ করতে চাইছিল, কিন্তু আদম নিজের ভুল স্বীকার করছিলেন। কুরআনের দৃষ্টিতে মানুষের মর্যাদা ভুল না করার মধ্যে নিহিত না বরং ভুল বুইঝা সত্যের দিকে ফিরা আসার মধ্যে। মুহাম্মদ(সাঃ) বলছেন, “আদম সন্তানের সবাই ভুল করে, আর ভুলকারীদের মধ্যে সর্বোত্তম তারা, যারা তাওবা করে” (জামি আত তিরমিযী, হাদিস ২৪৯৯)।
কুরআন বলে, “অতঃপর আদম তাঁর প্রতিপালকের কাছ থেকে কিছু বাণী শিখলেন, তারপর আল্লাহ তাঁর তাওবা কবুল করলেন” (সূরা আল বাকারা ২:৩৭)। তাওবার আসল অর্থ হইলো ফিরা আসা। আল্লাহর দিকে ফিরা আসা, নিজের সহজাত প্রকৃতির দিকে ফিরা আসা, নিজের প্রকৃত পরিচয়ের দিকে ফিরা আসা। এই অর্থে তাওবা কেবল নৈতিক কাজ নয়, সাথে সাথে এইটা মানুষের অস্তিত্বের পুনর্গঠন। যখন মানুষ তাওবা করে, তখন সে তার জীবনের আসল কেন্দ্র- আল্লাহর দিকে ফিরাইয়া আনে। সে নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে ও নিজের ভুল চিনতে শেখে। তাই তাওবা দুর্বলতার চিহ্ন নয় বরং গভীর মানবিক শক্তির প্রকাশ।
কোরানের এই এপিসোডের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হইলো আল্লাহর রহমত। আদম ভুল করছিলেন, কিন্তু আল্লাহ তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংস করেন নাই। তিনি শিক্ষা দিছেন, ক্ষমা করছেন, হিদায়াত দিছেন। আল্লাহ বলেন, “আমার পক্ষ থেকে যখন তোমাদের কাছে হিদায়াত আসবে, তখন যারা সেই হিদায়াত অনুসরণ করবে, তাদের কোনো ভয় থাকবে না এবং তারা দুঃখিতও হবে না” (সূরা আল বাকারা ২:৩৮)। এখানেই মানব সভ্যতার ভিত্তি নির্ধারিত হয়। সভ্যতার ভিত্তি যদি হয় অহংকার তার ফল হয় সংঘাত, যদি ভিত্তি হয় ভোগবাদ তার পরিণতি শূন্যতা। যদি ভিত্তি হয় ক্ষমতা তখন জন্ম নেয় নিপীড়ন। কিন্তু যদি ভিত্তি হয় রহমত তখন জন্ম নেয় ন্যায়, দায়িত্ব, ক্ষমা ও মানবিকতা। এ কারণেই কুরআনের সূচনা “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” দিয়া। রহমান ও রহিম কেবল আল্লাহর গুণবাচক নাম না, এই দুই নাম আমাদেরকে কুরআনিক সভ্যতার নৈতিক ভিত্তিকেও মনে করাইয়া দেয়।
আদম(আঃ) ও ইবলিসের কাহিনি আসলে প্রতিটি মানুষের প্রতিদিনের কাহিনি। প্রতিদিন মানুষ সত্য ও প্রতারণা, বিনয় ও অহংকার, তাওবা ও আত্মপক্ষ সমর্থন, রহমত ও আত্মধ্বংসের মধ্যে যে কোনো একটা পথ বাইছা নেয়। কুরআন আমাদের শেখায়- মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতা সীমাহীন ইচ্ছাপূরণে না, বরং সত্যকে গ্রহণ করার নৈতিক সাহসে। মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু তার জ্ঞান বা ক্ষমতা নয়, বরং তার আল্লাহর কাছে ফিরা আসার ক্ষমতা। আর মানুষের সবচেয়ে বড় আশ্রয় তার নিজের যোগ্যতা না, বরং আল্লাহর সীমাহীন রহমত।
রেফারেন্সঃ
আল কুরআন: ২:৩০ থেকে ৩৯, ৭:১১ থেকে ২৭, ১৫:২৮ থেকে ৪৩, ১৭:৬১ থেকে ৬৫, ২০:১১৫ থেকে ১২৩, ৩৮:৭১ থেকে ৮৫, ৭৬:৩, ১৮:২৯, ১৪:২২।
হাদিস: জামি আত তিরমিযী, হাদিস ২৪৯৯।
আল তাবারি, জামিউল বায়ান।
ইবন কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম।
ফখরুদ্দীন আল রাজি, মাফাতিহুল গায়ব।
আল কুরতুবি, আল জামি লি আহকামিল কুরআন।
Toshihiko Izutsu, God and Man in the Qur’an।
Fazlur Rahman, Major Themes of the Qur’an।
Syed Muhammad Naquib al Attas, Islam and Secularism।
Alija Izetbegović, Islam Between East and West।
Leave a comment