পুরস্কার
পুরস্কারের কথা বলব না আমি।
তোমরা এই হাতিগাছ নিয়ে চলে যাও
পলাশী, আম্রকাননে।
দেখো- লর্ড ক্লাইভ কিভাবে কাছে টানছে
জগৎ শেঠ, রাজা রাজবল্লভ। আর
দেখো একটি ভাঙ্গা নৌকা ও
সিরাজের পরিত্যক্ত জুতাখানি।
আর শোনো মর্মাহত মুর্শিদাবাদ,
তার দেয়ালের
হায় সিরাজ হায় সিরাজ প্রতিধবনি!
তার চেয়ে আমি বাদ মাগরিব এইসব পেস্তা বাদাম
আর মাঠভরা খরগোশের রূপ নিয়ে বসে থাকব।
দেখব অড়হর পাতার শীষ,
দেখব একটি কপিফুলের তন্দ্রা ছিঁড়ে
নেমে আসছে হাজার হাজার মৌ-দরবেশ।
আমি শুধু সারি সারি সবুজ চাই
চন্দ্রচোরদের তরমুজ বাগানে।
যেখানে লাল নিয়ে নৃত্য করছে
এতিম পিপড়েদের দল।
সুন্দর
তোমাকে দেখে দেখে
গুলি করার কথা ভুলে যাবো।
এই প্রহরীদিবসে
সকালের জেলখানা- নদীপথের ফুল।
বোতাম খুলে আজ
সবটাই দেখব, চরাচরে হাঁসের মৌসুম
বোকাদের ব্রিজ, এইসব অতি কমলাফল!
তোমাকে দেখে দেখে আজ কবর দিয়েছি
বীরবাহুদের। রণক্ষেত্র শূন্য,
পথে পথে মাদুর খুলছে
আর ঝাণ্ডা উড়ছে স্মৃতি-পালকদের।
আহা আমার গোলাপপ্রতিভা
আজ আলোস্তন হয়ে বিছানায় ফুটলো
আর সমস্ত আগুন সাজিয়ে তুললো
নিম্নমুখি মেঘ!
যে মাছ
বুকে মাছের ডিম্বানু নিয়ে শুয়ে থাকি।
তুমি আসো, তোমার
সাদা পেটের বাজিরেখায়
এই জবা পাপড়ির সারডিন।
আমার সব মুহূর্ত মাছ হোক
নদীর নামে নদীর জল ইহুদি!
সব হরিণের রক্ত ঝরলো এই
ঘুমন্ত রৌদ্রকলে।
শব্দ, শব্দকে চাইলাম আর কি শহীদ আমার
দুপুর! তুমি চোখ বুজে ঠিকানা চাইছো
আর বালিতে গড়িয়ে
পড়ছে শেষ জুপিটারের আলো।
এখন শুধু মাছের শিশু আমি
কবিতা কবিতা করে
তুমি আর কবর খুঁড়ো না।
সালাম বাংলা
সালাম বাংলা, তোমাকে নিয়েছি গুপ্ত ডালিমে
স্কুলের টেবিলে, গোসলের অতি গরম পানিতে।
জনকলরব, লোহার পাথর, খানসেনা আর
পলাশী সিরাজ, ইমাম হোসেন কারবালা খঞ্জরে!
যেন বা আমার কলিজা তোমার
যেন বা তোমাকে দিয়েছি হাজারো পানিপথ!
তোমার শুধুই জয় হোক- ওগো অক্ষয় হিমালয়!
তুমি কি শুধুই সীমানা ছাড়াবে- রক্ত লেগুনে?
কী চাও শিকারি ভাষায় গোলাপ গোকূলে
সবুজে পতাকা পেরিয়ে পাগল কিশোরে?
আমাকে কী দান করবে বলো এ ছিন্ন সকালে?
তামার পাত্র গলিয়ে সাজাবে মনসার বিষ?
নাকি ফেলে যাবে ভারতবর্ষ, নো-ম্যানস ল্যাণ্ডে?
শরীরে আমার জমেছে খণ্ড বরফ এবং পিপাসার আলো
হাঁটছি রায়টে, বোমারু বিমান, গুমন্ত ঘোড়াশালে!
সালাম বাঙলা, আমাকে শুইয়ে ধরো তুমি গোপন পাতালে
আমার জানালা বন্ধ! বন্দী আমি রাক্ষসের দখলে!
চে, ফিদেল ও এক টুকরো চাঁদ
পাতা ও ফুল ঝরে
আরহেনতিনার বনে।
জলের পাশে চিরদিন
কাকাতুয়া ও কোকিলের গান।
বিপ্লব আর না-বিপ্লব
স্বপ্ন আর না-স্বপ্ন
এরই মাঝে
মানুষের খুলি আর হাড়।
মৃতদের ভায়োলিন বাজে
কালো এক চার্চের মাথায়।
আর এক টুকরো চাঁদ
জেগে থাকে
হাভানার রাতে।
নতুন পাণ্ডুলিপির দিনে
মোরগের জায়গায় লাল।
ঝুল বারান্দায় তন্দ্রাতারা, ফুল।
ছদ্মঝর্না, মার্বেল, গোল মেয়েদের তমাল।
ঠেলে ঠেলে উঁচিয়ে আসছে ডিসেম্বরের জাহাজ
তাতার এই মানুষরূপ
চাঁদ চাঁদ মাছেদের ছায়াসাঁতার।
সূর্যলেখা জমছে আগামীদের কবরে।
শব্দের ভেতর শব্দ, প্রস্তরের ভেতর প্রস্তর
উইঢিবি, একটা একটা ফুলগাঁথা
একটা একটা নিকোটিনের ঠোঁট
ছড়িয়ে পড়ছে লুকানো বিবাহের
যোনিফুলে।
পানিপথ রিটার্নস
অনেক আগুন নিয়ে জল হয়েছি।
নদী এসে একটি মেয়ের মুখ- ঘুমন্ত সাম্পান।
পাশা খেলাও শেষ। পালিয়ে দরবেশ সেজেছে
বহুপীরের ডাকাত। আর দূরে ফোটা ছাতিম গাছ
লিখছে তুষার পড়ার সন্যাস!
মানুষেরা বালি মাখছে কয়েদিপায়ে।
এতদিন পায়ে পায়ে শেকলের ভাষা
হিংসার রঙ- ডালিম ফাটানো লাল।
স্বপ্ন- ধনুক, স্বপ্ন- চুনারুর লেলিহান খাঁজ।
রোদের চুমুক এখন মাটির দুধ হয়ে আসছে।
হলুদ জবার মতো নতুন হাত তোমার!
আমার আর শহিদ হতে ইচ্ছেই করছে না
এই ঘোড়া-হাঁকানো শয়তানের পথে!
শেরশাহ আর হুমায়ূনের কবর উঠুক
কলিঙ্গ প্রদেশে।
জঙ্গি
জঙ্গ করে এনেছি জবাদের রঙ
গন্ধবিহ্বল কস্তূর উড়ুক তোমার ইশকের ডানায়।
আজ লাল দেখে তাঁবু করবো শত্রুঘেরা সীমানা সমরে।
বলো কী বর্মে ঢাকো চুম্বনের রাহুগ্রাস?
ঠোঁটের সবুজে খুলে দিয়েছি ভূলুণ্ঠিত, বোকা শিরস্ত্রাণ।
আমার জয় হোক- চন্দ্রলিখন ঘুমন্ত গোল বেআব্রু আপেলে!
বলো আজ ধানে ও ধ্যানে মরেছে সিপাহিদের ঘোড়া।
কপিলাবস্তু শেষ, রক্তমাছি থেমে গেছে অশোকের কবরে।
গোলাপ তোমার মুখ তোমার বুক থেকে নেমে যাক
মরুবালি বরফের চূড়া।
বাগান
সিডনির বোটানিক গার্ডেনে এসে
নতুন কবিতা লেখার কথা মনে আসে!
বন্ধুর সাথে ঘুরে ঘুরে একটা ক্যামিলিয়া
গাছের ছায়াতে দাঁড়াই। ব্রিজের পাশে
আশ্চর্য লাল আর সবুজের অ্যানাটমি!
দেখে দেখে ‘সুবহানাল্লাহ’ বলি
আরো দেখি ঘন রেইনট্রির পাতায়
আমার আম্মার মুখ- ঘুমন্ত কাকাতুয়া ।
ভাবি- নতুন কবিতা ঠিক এরকম নয়!
তার গাছ নাই, মা নাই, বরং তার
একটি ডানা চাই যেমন একটি মথের
ম্যামব্রেন থেকে ধীরে ধীরে ফুটে উঠবে
আগামীদিনের জুরাসিক অথবা
মেহিকনের হলুদ বাস উড়ে এসে বসবে
শীতের বরফ-স্টেশনে।
এও হবার নয়। কারণ তখন দূরে কোথাও
বোমা পড়ছে
আর অ্যারোড্রাম দিয়ে নেমে পড়ছে
অস্তমান কফিন বাহকেরা।
বাদ ইশা
কি রকম ঘোর লাগে বাদ ইশায়। আশ্চর্য! সব রাস্তা নদী হয়
ডানা পায় চন্দ্রজীবী নারী মৎসকূল। দু’চোখ আন্ধার হয়
দেখি লক্ষ ঝাড়বাতি কল্বের ভেতর।
আল্লাহ আল্লাহ রব-বেমালুম ভুলে যাই নাম ও সাকিন!
দুরুদে প্রহর কাটে- প্রিয় নবী মোহাম্মদ- রাহমাতুল্লিল আলামিন।
ফুলে ফুলে মা চাই, মায়ের নামে পাঠশালা খোলা
শত মক্তবের আরবি অক্ষর।
আমি শূন্য আমি ধন্য অসীমের মাঝে। যেন গাছপোকা
নিজেরে হারিয়ে খুঁজি কালো সব গোবরের পাঁকে।
সাতআসমানজোড়ালাগে, সিরাজসিরাজকরে বৃষ্টিভেজা
পলাশীপ্রান্তর। তুমি থাকো দূরে, তবু খোলে চোখ যেন
মাঠে মাঠে নেচে উঠে হিরামন কইতর।
কে পাগল কেবা নিরঞ্জন
কার আছে সোনা, রূপা, ভাড়াটিয়া কবি?
সবই হাজির হয়- রেকাবে কাবাব পোড়ে
জলপাই পাতা জানে মাংস পোড়ার খবর।
কিরকম ঘোর লাগে বাদ ইশায়। আশ্চর্য! কাকপক্ষি কথা বলে
ঠোঁট মেলে কাছে আসে লাল, নীল বট বল্কল।
ভাইবোন বাতি ধরে- তাদের কবরগুলি দুধশাদা ঘর!
নিজের ভেতর নিজে জ্বলি- যেন সারাগ্রাম জ্বলছে পিপাসা-ধুপে
তুমি নাই আমি নাই, ঘর করে জিন পরী, পিপড়া সকল।
প্রথম প্রকাশঃ বইমেলা ২০২০
প্রকাশকঃ বৈভব প্রকাশনী
পরিবেশকঃ রকমারি.কম
Leave a comment