সূরা আল-বাকারার ৩০–৩৪ নম্বর আয়াতগুলিতে আমরা কুরআনের মানবতত্ত্বের ভিত্তিপ্রস্তর লক্ষ্য করি। এই কয়টা আয়াতের মধ্যেই মানুষের আসল পরিচয়, তার অস্তিত্বের উদ্দেশ্য, জ্ঞানের উৎস, স্বাধীন ইচ্ছার প্রকৃতি, নৈতিক দায়িত্ব এবং ইতিহাসের প্রথম নৈতিক সংকট এইসব কিছুর বীজ নিহিত আছে। তাই এই কোরআনের অংশটাকে শুধু আদম (আঃ) এর কাহিনি হিসাবে পড়লে এইটার প্রকৃত তাৎপর্য ধরা যায় না, বরং একটু গভীরভাবে পড়লে বোঝা যায় যে কোরআনের এইখানেই আছে মানবসভ্যতার প্রথম দার্শনিক ঘোষণা।
কুরআন এইখানে আসলে কেবল মানুষের উৎপত্তির গল্প বলতেছে না, বরং মানুষ কী, এই প্রশ্নের উত্তর দিতেছে। মানুষ কি শুধু জৈবিক প্রাণী? সে কি কেবল প্রবৃত্তির ফল? নাকি সে এমন এক নৈতিক সত্তা, যার ভিতরে জ্ঞান, স্বাধীনতা, পতন ও উৎকর্ষ সবগুলার সম্ভাবনা একসাথে উপস্থিত? আল-বাকারার এই আয়াতগুলি সেই প্রশ্নগুলির উত্তর। শুরুতে আল্লাহ ঘোষণা দিলেনঃ
“নিশ্চয়ই আমি পৃথিবীতে একজন খলিফা স্থাপন করতে যাচ্ছি।” (২:৩০)
খলিফা শব্দটা আরবি ‘খ-ল-ফ’ ধাতু থেইকা আসছে। এর অর্থ উত্তরসূরি, প্রতিনিধি কিংবা দায়িত্বপ্রাপ্ত অভিভাবক। কিন্তু কুরআনের এই খলিফা বা খিলাফত কোনো রাজনৈতিক পদ না, এইটা মানুষের অস্তিত্বগত পরিচয়। এইটা আরো বলে যে মানুষ পৃথিবীর মালিক না, সে পৃথিবীর আমানতদার। এই দুনিয়া তার ব্যক্তিগত সম্পত্তি না, আল্লাহ তার হাতে একটা নৈতিক দায়িত্ব অর্পণ করছেন। তাই ইসলামে ক্ষমতা মানে শুধু অধিকার (right) আদায় ও প্রয়োগ না, ক্ষমতা আমানত ও জবাবদিহিতার (accountability) সাথে জড়িত। মুহাম্মদ আসাদ তার বই ‘The Message of the Qur’an‘এ বলছেন যে মানুষ আল্লাহর প্রতিনিধি- এই অর্থে যে তাকে স্বাধীন ইচ্ছা, বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা এবং নৈতিক বিচারশক্তি দেওয়া হইছে, যাতে সে পৃথিবীতে আল্লাহর ন্যায়বিধান বাস্তবায়ন করতে পারে। অন্যদিকে আলী শরিয়াতী তার ‘Man and Islam’ লেখায় বলছেন যে মানুষ এমন এক সত্তা, সে একই সঙ্গে মাটি ও রূহ, প্রকৃতি ও আধ্যাত্মিকতার সমন্বয়ে গঠিত। তাই তার ভিতরে যেমন পশুত্বের সম্ভাবনা আছে, তেমনি নবুয়তীয় নৈতিকতার দিকেও আরোহণের সম্ভাবনা আছে। এইখানেই কুরআনের মানুষ-দর্শন ডারউইনীয় বস্তুবাদী ও জৈবিক ব্যাখ্যার বাইরে আইসা দাঁড়ায়। মানুষ শুধু মাটিও না, আবার শুধু রূহও না, সে দায়িত্বপ্রাপ্ত এক নৈতিক অস্তিত্ব। আল্লাহর খিলাফতের এই ঘোষণার পর ফেরেশতাগণ বললেনঃ
“আপনি কি পৃথিবীতে এমন কাউরে সৃষ্টি করবেন, যে সেখানে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং রক্তপাত ঘটাবে?” (২:৩০)
এই প্রশ্নটা আসলে কোনো প্রতিবাদ না, একটা অনুসন্ধিৎসা। ইমাম তাবারী ও ইমাম কুরতুবী ব্যাখ্যা করছেন, ফেরেশতারা আল্লাহর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন নাই, বরং আল্লাহর হিকমাহ জানতে চাইছিলেন। অর্থাৎ প্রশ্ন করা ঈমানের বিপরীত না বরং প্রশ্নই জ্ঞানচর্চার সূচনা। কুরআনের একটা বড় বৈশিষ্ট্য হইলো কুরআন মানুষকে অন্ধ আনুগত্যের কথা বলে না, বরং প্রশ্ন করতে শিখায়। কোরআনের,’তোমরা কি চিন্তা করো না?’, ‘তোমরা কি বুঝো না?’- এরকম প্রশ্নের মধ্যেই লুকাইয়া আছে মানুষের জিজ্ঞাসা করার সূত্র। ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তির ভিত্তি তাই সন্দেহবাদ না, আবার অন্ধ বিশ্বাসও না, বরং সত্যের প্রতি বিনয়ী অনুসন্ধান। এইখানে ফেরেশতা আর ইবলিসের পার্থক্যও স্পষ্ট। ফেরেশতা প্রশ্ন করে সত্য জানার জন্য, ইবলিস প্রশ্ন করে নিজের অহংকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য। একজন অনুসন্ধানী, আরেকজন আত্মমুগ্ধ। আল্লাহ উত্তর দিলেনঃ
“নিশ্চয়ই আমি জানি, যা তোমরা জানো না।” (২:৩০)
এই উত্তর শুধু ফেরেশতাদের উদ্দেশে না, তা সমগ্র মানবজাতির উদ্দেশে দেওয়া হইছে। মানুষের জ্ঞান আংশিক, অভিজ্ঞতানির্ভর ও সীমাবদ্ধ। মানুষ বর্তমানের কিয়দংশ দেখতে পায়, কিন্তু আল্লাহ অতীত, ভবিষ্যৎ, সময়, সম্ভাবনা,অন্তর্লোক এবং সমগ্র ইতিহাসকে একসাথে জানেন। এই আয়াতের সবচেয়ে গভীর দার্শনিক তাৎপর্য হইলো, মানুষ কখনো একমাত্রিক সত্তা না। যে মানুষ রক্তপাত ঘটাইতে পারে, সেই মানুষই ন্যায়ভিত্তিক সভ্যতা গড়তে পারে। যে মানুষ পাপ করে, সেই মানুষই আবার তওবা কইরা আল্লাহর প্রিয় বান্দা হইতে পারে। কুরআনের মানুষ তাই কোনো পূর্বনির্ধারিত চরিত্র না, সে অপার সম্ভাবনাময় এক সত্তা। এইখানেই কুরআন মানুষের নৈতিক স্বাধীনতার ভিত্তি স্থাপন করে। এরপর কুরআন বলতেছেঃ
“আর আল্লাহ আদমকে সমস্ত নাম শিক্ষা দিলেন।” (২:৩১)
কুরআনের সবচেয়ে গভীর বৌদ্ধিক মুহূর্তগুলোর একটি হইলো আল্লাহর এই ঘোষণা। প্রথম দৃষ্টিতে মনে হইতে পারে, এখানে ‘নাম’ মানে শুধু বস্তুগুলোর নাম শেখানো। কিন্তু ধ্রুপদি মুফাসসিররা এই আয়াতকে অনেক গভীর অর্থে পড়ছেন। ইমাম ফখরুদ্দীন আর-রাযীর মতে, আল-আসমা বলতে কেবল শব্দভাণ্ডার না, বরং বস্তুর প্রকৃতি, পারস্পরিক সম্পর্ক, কার্যকারণ ও অর্থ অনুধাবনের ক্ষমতাকে বোঝানো হইছে। অর্থাৎ আল্লাহ আদম (আঃ)-কে শুধু তথ্য (information) শিক্ষা দেন নাই, তিনি অর্থ (meaning) বুঝারও ক্ষমতা দিছেন। এইখানেই মানুষের বৌদ্ধিক শ্রেষ্ঠত্বের সূচনা। কারণ তথ্য প্রাণীও গ্রহণ করতে পারে, কিন্তু অর্থ নির্মাণ কেবল মানুষের বৈশিষ্ট্য। মানুষ কোনো বস্তুকে শুধু দেখে না, সে তার নাম দেয়, শ্রেণিবিন্যাস করে, প্রতীকে রূপান্তর করে এবং সেই প্রতীকের মাধ্যমে নতুন জগত নির্মাণ করে। এই অর্থে ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম না, ভাষা মানুষের চিন্তার স্থাপত্য। ভাষার মাধ্যমেই মানুষ বিমূর্ত ধারণা সৃষ্টি করে- ন্যায়, সৌন্দর্য, সত্য, স্বাধীনতা- এই ধারণাগুলি কোনো দৃশ্যমান বস্তু না, এইগুলি বিমূর্ত, অর্থের জগতে নির্মিত। তাই কুরআনে ‘নাম’ শিক্ষা আসলে মানুষের symbolic consciousness-এর জন্ম। আধুনিক ভাষাতত্ত্ব ও নৃতত্ত্বও এই সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে। কুরআনের ভাষায় এই অসাধারণ ক্ষমতার আদি উৎস আল্লাহর শিক্ষা- ‘আল্লামা আদামাল-আসমা’।
কুরআনে ‘ইলম(জ্ঞান)’ কখনো নিছক তথ্যসঞ্চয় না, ইলম সবসময় অর্থ, নৈতিকতা ও বাস্তবতার গভীর উপলব্ধির সঙ্গে যুক্ত। এই কারণেই ইসলামের প্রথম ওহি- ‘পড়ো’, কারণ খিলাফতের পূর্বশর্ত শক্তি না, জ্ঞান। আর জ্ঞানের পূর্বশর্ত মুখস্থ বিদ্যা না, অর্থ অনুধাবনের ক্ষমতা। সুতরাং আদমকে নাম শিক্ষা দেওয়া মানে মানবসভ্যতার জ্ঞানতাত্ত্বিকতার জন্ম। এইখানেই মানুষ প্রকৃতির অংশগ্রহণকারী প্রাণী থেইকা অর্থ-নির্মাণকারী, ইতিহাস-সৃষ্টিকারী এবং নৈতিকভাবে দায়িত্বশীল খলিফায় পরিণত হয়।
যখন আল্লাহ ফেরেশতাদের সামনে আদমের জ্ঞান প্রকাশ করলেন, তখন তারা বললেনঃ
“আপনি পবিত্র। আপনি আমাদের যা শিক্ষা দিছেন, আমরা তার বাইরে কিছুই জানি না।” (২:৩২)
এই স্বীকারোক্তি ইসলামী জ্ঞানতত্ত্বের অন্যতম মৌলিক নীতি। কুরআনের দৃষ্টিতে জ্ঞানের প্রথম লক্ষণ তথ্যের আধিক্য না, নিজের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতনতা। আধুনিক পাশ্চাত্য জ্ঞানতত্ত্বে ফ্রান্সিস বেকনের বিখ্যাত উক্তি ‘Knowledge is Power’ জ্ঞানকে ক্ষমতার উৎস হিসাবে প্রতিষ্ঠা করছে। কিন্তু কুরআন জ্ঞানরে প্রথমত নৈতিক দায়িত্ব হিসাবে দেখে। এখানে জ্ঞান মানুষকে সর্বজ্ঞ বানায় না, বরং বিনয়ী বানায়। ইমাম গাজ্জালি লিখছেন- মানুষের সবচেয়ে বড় অজ্ঞতা হইলো নিজের অজ্ঞতারে না চেনা। যত প্রকৃত জ্ঞান বাড়ে, তত মানুষ উপলব্ধি করে, তার অজানার দিগন্ত সীমাহীন। এই কারণেই ফেরেশতারা আদমের জ্ঞান দেখে প্রতিযোগিতা করেন নাই, নিজেদের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করছেন। অন্যদিকে ইবলিসের ট্র্যাজেডি জ্ঞানের অভাব না, অহংকার। সে বাস্তবতা জানত, আল্লাহকে চিনত, কিন্তু সত্যের সামনে নত হইতে পারে নাই। তাই কুরআনের ভাষায় অজ্ঞতা অনেক সময় তথ্যের অভাব না, নৈতিক বিকৃতি। আজকের তথ্যবিস্ফোরণের যুগে এই আয়াত আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। আমরা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি তথ্যের অধিকারী, কিন্তু আগের চেয়ে বেশি প্রজ্ঞাবান- এইটা বলা কঠিন। কুরআন শেখায়, প্রজ্ঞার ভাষা অনেক সময় ‘আমি জানি’ না, বরং ‘আমি যতটুকু জানি, সেইটাও আল্লাহর শেখানো।’
তারপর সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্ত আসে ২:৩৪ নম্বর আয়াতে। আল্লাহ আদেশ দিলেনঃ
“এবং যখন আমি আদমকে সেজদা করার জন্য ফেরেশতাগণকে নির্দেশ দিলাম, তখনই ইবলীস ব্যতীত সবাই সিজদা করলো। সে (নির্দেশ) পালন করতে অস্বীকার করল এবং অহংকার প্রদর্শন করল।”
সবাই সিজদা করল কিন্তু ইবলিস অস্বীকার করল। তার যুক্তি ছিলঃ
“আমি তার চেয়ে উত্তম; আপনি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন, আর তাকে মাটি থেকে।”(৭ঃ১২)
ইবলিসের যুক্তি নৈতিকভাবে ভ্রান্ত। সে উপাদান মানে আগুন ও মাটিরে মর্যাদার মানদণ্ড বানাইছে। অথচ আল্লাহর কাছে মর্যাদার ভিত্তি কোনো উপাদান না, বরং আল্লাহভীতি, আনুগত্য ও নৈতিক চরিত্র।এই অর্থে ইবলিস ইতিহাসের প্রথম বর্ণবাদী চরিত্র। কারণ সে জন্মগত বৈশিষ্ট্যরে শ্রেষ্ঠত্বের ভিত্তি বানাইছে। একই সঙ্গে সে প্রথম শ্রেণিগত অহংকারী, কারণ সে নিজের উৎসরে অন্যের উৎসের চেয়ে উচ্চতর মনে করছে। আরও গভীর অর্থে ইবলিস প্রথম অস্তিত্ববাদী বিদ্রোহী। সে স্বাধীনতারে সত্যের প্রতি আনুগত্য হিসাবে না বুইঝা নিজের অহংকারের স্বাধীনতা হিসাবে বুঝছে।
অনেকে মনে করেন ইতিহাসের প্রথম পাপ কাবিলের হাতে হাবিলের হত্যা। কিন্তু কুরআনের ধারাবাহিক বর্ণনায় প্রথম নৈতিক পাপ হইলো ইবলিসের এই কিবর বা অহংকার। রাসূল(সাঃ) বলেছেনঃ
“অহংকার হইলো সত্যকে প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষরে তুচ্ছ মনে করা।” (সহিহ মুসলিম)
এই সংজ্ঞা ইবলিসের চরিত্রের সঙ্গে সম্পূর্ণ মিলে যায়। সে আল্লাহর অস্তিত্ব অস্বীকার করে নাই, সে সত্যের সামনে নিজের অহংকারকে বড় বানাইছে। ফলে কুরআনের দৃষ্টিতে অবিশ্বাসের মূল সবসময় বুদ্ধিবৃত্তিক সংশয় না, অনেক সময় নৈতিক অহংকার। এই কারণেই কুরআনে জ্ঞান ও বিনয় পাশাপাশি চলে, আর অহংকার ও অজ্ঞতা পাশাপাশি।
এই আয়াতগুলি পাঠ করলে আমরা আরো বুঝতে পারি যে আদম(আঃ) আর ইবলিস কেবল দুই সৃষ্টি না, দুইটা সভ্যতার প্রতীক। আদমের সভ্যতা জ্ঞাননির্ভর, বিনয়ী, আত্মসমালোচনামূলক এবং তওবামুখী। সে ভুল করে, কিন্তু ভুল স্বীকার করে। তার পতন ঘটে, কিন্তু সেখান থেইকাই সে নতুন নৈতিক যাত্রা শুরু করে। অন্যদিকে ইবলিসের সভ্যতা শ্রেষ্ঠত্ববাদী, আত্মমুগ্ধ এবং নিজের দোষ-অন্যের উপর চাপাইয়া দেওয়ার সংস্কৃতি। সে ভুল করে, কিন্তু নিজের ভুলরে ন্যায্য প্রমাণ করার চেষ্টা করে। তার কাছে বিদ্রোহই স্বাধীনতা, বিনয় তার কাছে পরাজয়। তাই মানবসভ্যতার ইতিহাস মূলত এই দুই প্রবণতার অবিরাম সংগ্রাম- জ্ঞান বনাম অহংকার, তওবা বনাম আত্মঅহংকার, ন্যায় বনাম ক্ষমতার পূজা।
একবিংশ শতাব্দীতে মানুষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জিন-প্রযুক্তি, মহাকাশ বিজ্ঞান আর পারমাণবিক শক্তিতে অভূতপূর্ব অগ্রগতি অর্জন করছে ঠিকই। কিন্তু এই জ্ঞানের সঙ্গে নৈতিকতা সমানভাবে বাড়ে নাই। আজকের পারমাণবিক অস্ত্র, পরিবেশ বিপর্যয়, নজরদারি প্রযুক্তি, ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শোষণ আমাদেরকে দেখায়- জ্ঞান যদি নৈতিকতা থেইকা বিচ্ছিন্ন হইয়া যায়, তাইলে সেইটা সভ্যতার হাতিয়ার না, ধ্বংসের অস্ত্র হইয়া ওঠে। দার্শনিক, চিন্তাবিদ ও অধ্যাপক সৈয়দ হোসেইন নাসর ঠিকই বলছেন- আধুনিক সংকট মূলত জ্ঞানের সংকট না, তা পবিত্রতার সঙ্গে জ্ঞানের বিচ্ছেদের সংকট। কুরআনও মানুষরে একই কথাই স্মরণ করায়- জ্ঞান তখনই কল্যাণকর, যখন সেইটা ন্যায়, দয়া, বিনয় আর জবাবদিহিতার সঙ্গে যুক্ত হয়।
সূরা আল-বাকারার ৩০–৩৪ নম্বর আয়াত মানবসভ্যতার সূচনাপত্র। এইখানে মানুষকে শুধু একটা জীব হিসাবে না, বরং নৈতিক, জ্ঞানসম্পন্ন এবং স্বাধীন সত্তা হিসাবে উপস্থাপন করা হইছে। তার শ্রেষ্ঠত্ব জন্মগত না, অর্জিত। সে জ্ঞানের মাধ্যমে উন্নত হয়, বিনয়ের মাধ্যমে পরিপূর্ণ হয় এবং আনুগত্যের মাধ্যমে খিলাফতের দায়িত্ব পালন করে। অন্যদিকে ইবলিস আমাদের মনে করায়- জ্ঞান, ইবাদত কিংবা ক্ষমতা কোনোটাই মানুষরে মহান বানায় না, যদি তার অন্তরে অহংকার বাসা বাঁধে। তাই কুরআনের প্রথম মানবিক শিক্ষা আমি কোন পরিবারে, কোন বংশে জন্ম গ্রহণ করলাম তা না, দেখার বিষয় হইলো আমার চরিত্র, আমার মূল্যবোধ আল্লাহ যেভাবে চাইছেন, সেভাবে গইড়া উঠছে কিনা। প্রথম রাজনৈতিক শিক্ষা ক্ষমতা না, আমানত। প্রথম বৌদ্ধিক শিক্ষা তথ্য না, জীবনের আসল অর্থ খুঁইজা পাওয়া। আর প্রথম নৈতিক শিক্ষা অহংকার ও অবাধ স্বাধীনতা না, বিনয়। আল-বাকারার এই কয়টা আয়াত শুধু আদমের কাহিনি না, মানুষের ‘মানুষ’ হওয়ার কাহিনি। এখানে মানুষকে কেবল একটি জীব হিসেবে নয়, বরং নৈতিক, জ্ঞানসম্পন্ন ও স্বাধীন সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হইছে। তার শ্রেষ্ঠত্ব জন্মগত নয়, অর্জিত। সে জ্ঞানের মাধ্যমে উন্নত হয়, বিনয়ের মাধ্যমে পরিপূর্ণ হয় এবং আনুগত্যের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে তার দায়িত্ব পালন করে। অন্যদিকে ইবলিস স্মরণ করাইয়া দেয় যে জ্ঞান, ইবাদত বা ক্ষমতা কোনোটিই মানুষকে মহান করে না, যদি তার অন্তরে অহংকার বাসা বাঁধে।
তথ্যসূত্রঃ
- আল-কুরআন, সূরা আল-বাকারা (২:৩০–৩৪); সূরা আল-হিজর (১৫:২৬–৪৪); সূরা সাদ (৩৮:৭১–৮৫) সূরা আল-আরাফ(৭-১২)
- সহিহ মুসলিম, কিতাবুল ঈমান
- Tafsir Ibn Kathir
- Al-Jami’ li Ahkam al-Quran
- Mafatih al-Ghayb
- The Message of the Qur’an — Muhammad Asad
- Ali Shariati, Man and Islam
Leave a comment