Current date September 24, 2026
মানুষ, দর্শন, ইতিহাস, সভ্যতা

আসল রুমির সন্ধানে

URL copied
আসল রুমির সন্ধানে
Share URL copied

ঠিক একই ভাবে পশ্চিমাদের রুমি-পাঠ এই ওরিয়েন্টালিস্ট দৃষ্টিকোণের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমাদের মনে রাখতে হবে সাম্রাজ্যবাদ নির্ভর ক্ষমতায়নের যুগে ভাষা একটি বিরাট অস্র। আপনি গায়ের জোরে কিছু পারছেন না, আসেন ভাষা নিয়ে, ভাষা পরিবর্তন করেন, তখন এমনিতেই কম বেশি সবাই আপনার পক্ষে এসে যাবে। তাই রুমি-অনুবাদ পশ্চিমাদের জন্য খুব জরুরি। আশ্চর্য মনে রাখবেন, রুমির ‘ইমেজ’ নির্ভর- পাগড়ি মাথায় দাড়িওয়ালা সৌম্য চেহারার যে রুমি আমরা আজ দেখতে পাই, তা তাদের অন্তসারশূন্য গুরুবাদি ধ্যান ধারণাকে ‘দরবেশ’ মোড়কে ঢেকে প্রচারণা ছাড়া আর কিছুই  নয়। আপনার চেহারাও বিরাট শক্তি। রুমির ফেইস ভ্যালু ঠিক আছে, কিন্তু তাকে দিয়ে নিজেদের ক্ষয়ে যাওয়া, রগ্ন আত্মাকে ঢাকার যে কৌশল তা সহজ মানুষ ধরতে পারেন না। মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি আসলে স্বাধীনতার পায়ে বেড়ি, আপনি দেখবেন এই পশ্চিমা সংস্কৃতির হেজেমনি তাদেরকে পায়ের মধ্যে না শুধু, মনেও বেড়ি পরিয়ে দিয়েছে। তারা মানসিকভাবে বাঁচার জন্য বা মুক্তির জন্য, যা পারে- ইয়োগা থেকে শুরু করে চাইনিজ হারবাল, যোগির সাথে গুহায় রাত্রিযাপন সবই ট্রাই করে।  এই যে এই  শূন্যতা তার থেকে মুক্তি লাভের জন্য মাঝে মাঝে কবিতা মানে ভাষার কাছেও তাদেরকে যেতে হয়। রুমি -অনুবাদ বা রুমি-ডিস্কোর্স  এমন একটি প্রকল্প যেখানে আমরা দেখব জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ রুমি থেকে- ‘মুহাম্মদ’ নামটা বাদ দিয়ে ‘রুমি’ নামের সিগ্নিগাইয়ারে এমন একটা সিম্বলিক চেইনের সেগ্নিফাইড তিরি করা হইছে যে এর কাছ থেকে ইসলামিক রেফারেন্সগুলো সুচতুরতার সাথে আস্তে আস্তে মুছে ফেলা হয়েছে।        

রুমি-পাঠ আজ আর শুধু কবিতা পাঠের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, কেউ কেউ বিশেষ করে ধর্ম নিরপেক্ষ যারা, মুক্তমনা বা লিবারেল বলে নিজেদেরকে দাবী করেন তারা এর মধ্যে এমন এক দাওয়াই পেয়েছে গেছেন বলে মনে হয় যে রুমির কবিতা আজ তাদেরকে এই বস্তুবাদি দুনিয়ার মধ্যে এক ঝলক প্রশান্তি এনে দিয়েছে! এক প্রকারের অর্থনৈতিক মুক্তি, দায়-দায়িত্বহীন যৌনতা নির্ভর সোস্যাল ইন্টার-একশন, সম-সেক্সের মত প্রকৃতি-বিরোধি কাজও যখন তাদেরকে শান্তি দিতে পারছে না, তারা রুমি-পাঠে এমন কী মধুর খোঁজ পেল যে তারা মনের দুঃখ কষ্ট ভুলে গেল!  এ জন্য আমাদেরকে রুমিপাঠের ব্যাকগ্রাউন্ডে লুকানো রুমি অনুবাদকারিদের মনোভূমি দেখতে হবে। দেখতে হবে রুমি কীভাবে মাওলানা জালালউদ্দিন মুহাম্মদ রুমি থেকে হয়ে গেছেন শুধুই ‘রুমি’।  জানা যায় যে আমেরিকান অভিনেত্রি গিনিথ পালট্রোর সাথে ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর, বিশ্ব বিখ্যাত ব্যাণ্ড সঙ্গীতশিল্পি ক্রিস মার্টিনকে তার বন্ধুরা একটি বই উপহার দিয়েছিলেন। কিসের বই এটি?  বইটি ছিল তেরশ শতকের ইরানিয়ান কবি জালালউদ্দিন মুহাম্মদ রুমির কবিতাসংগ্রহ। বইটি অনুবাদ করেছেন কোলমেন বার্কস। মার্টিন বলেছিলেন যে এটি তার জীবন এক রকম পাল্টে দেয়। কোল্ড প্লের সাম্প্রতিক এলবামে একটি ট্র্যাক যোগ করা হয়েছে যেখানে বার্ক স্বয়ং রুমির কবিতা পড়ছেনঃ

আমি হলাম একটি অতিথি বাড়ি

প্রতি সকালে ঘটে নতুন আগমন

হাসি খুশি, দুঃখ অথবা হীনমন্য মন

কিছু ক্ষণস্থায়ী বোধ আসে-

অনাকাঙ্ক্ষিত দর্শন-প্রার্থীর মত।   

জালালউদ্দিন মুহাম্মদ রুমি তেরশত শতাব্দিতে আফগানিস্তানে জন্ম গ্রহণ করেন। পরে তিনি পরিবার সহ কনিয়াতে(বর্তমান তুর্কির একটি ঐতিহাসিক শহর) হিজরত করেন। তার বাবা ছিলেন একজন সুন্নি ইসলাম ধর্ম প্রচারক ও ইসলামিক স্কলার। কথিত আছে তিনি এক সময় রুমিকে সুফিইজমের সাথে পরিচয় করে দিয়েছিলেন। সুফিইজম তখনো অক্ষত ছিল, মানে তখনো কোরান আর সুন্নাহ নির্ভর ছিল। তখনো তা স্থানীয় ও অস্থানীয় সর্বপ্রাণবাদী ধর্ম ও লোকাচারের সংস্পর্শে না এসে, কোরান ও নবী মুহাম্মদ(সাঃ) এর ইসলামের ওপর নির্ভর ছিল। তাই রুমিও সুফিইজমকে কোরান আর সুন্নাহর বাইরে কিছু মনে করেন নি। কারণ কোরান সুন্নাহ তথা ইসলামের পাচ স্তম্ভের  ওপর প্রতিষ্ঠিত না থাকলে সেটি সুফিইজম নয়, সেটি হয়ে যায় ভণ্ডামি। রুমি কীভাবে মুল ধারার ইসলামের কাছে নিজকে সঁপে দিয়েছেলেন নিচের কবিতার লাইন দুটি পড়লেই টের পাওয়া যায়।

Muhammad broke many idols in the world, so that (religious)
communities were saying, “O (our Sustaining) Lord!”

If it had not been for Muhammad’s efforts, you also would have
worshiped idols like your ancestors.

(from Mawlânâ’s Masnavî, Book 2)

যা হোক, রুমি সেই সময় সিরিয়াতে সুন্নি ইসলামের ফিকহ এর ওপর অগাধ জ্ঞান অর্জন করেন এবং পরে কনিয়াতে ফিরে এসে শিক্ষকতার কাজে নিয়োজিত হোন। ঠিক এই সময় তার সাথে শামস তাবরিজি নামের একজন বয়সী মিস্টিক ভ্রামণিকের সাথে পরিচয় ঘঠে। যিনি অচিরেই রুমির মেন্টর হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। এই সাক্ষাৎ তার জীবন অনেকটা পাল্টে দেয়। তাদের দুজনের মধ্যে গড়ে ওঠা গভীর সম্পর্ক বিষয়ে ঐতিহাসিকদের মাঝে বিতর্ক আছে , কিন্তু এটি বলার অপেক্ষা রাখে না যে রুমির ধর্মীয় চিন্তাধারা ও ইসলামিক জীবনাচরণে শামস তাবরিজির প্রভাব গভীর। জনাব ব্রড গুচের করা রুমির নতুন জীবনীতে দেখা যায়- যে শামস তাবরিজি কীভাবে রুমির- ফিকহ শিক্ষাকে প্রশ্নের সম্মুখীন করে, কোরানিক ব্যাখ্যা নিয়ে তর্ক হাজির করে, শুধু কীভাবে আল্লাহর সাথে একাত্ম হওয়া যায় সেই ধারণার ওপর জোর দেয়ার জন্য প্রভাব বিস্তার করেন। আমাদের দেশেও দেখবেন এই ধারাটি বেশ সচল। বিভিন্ন সুফি তরিকার লোকজনের সাক্ষাৎ পাওয়া যায় যারা একজন গুরু বা বাবার সাহচার্যে আসেন, বায়াত গ্রহণ করেন। কিন্তু তাদের মধ্যে ইসলাম সম্পর্কে গাফলতি দেখা যায়, দেখা যায় ইসলামে যা নাই তাই তারা বেশি করে করেন। শামস তাবরিজির সঙ্গ লাভের  পর রুমি তার কবিতায় কোরানের বিধি বিধানের সাথে, আল্লাহ ও রাসুলের প্রতি প্রেম ও ভালবাসা ও মিস্টিক্যাল চিন্তার মিস্রণ ঘটান। কেশাভারেজের মতে এই অদ্ভূত বুনুন রুমিকে সমকালীন অন্যান্য অনেকের কাছ থেকে আলাদা করে ফেলে। কস্মোপলিটান কনিয়া, সুফি, মুসলমান সাহিত্যিক গোষ্ঠি, থিওলোজিয়ান, খ্রিস্টান, ইহুদি এবং স্থানীয় সেলজুক সুন্নি শাসক গোষ্ঠির ভেতর রুমির বিরাট অনুসারী গড়ে ওঠে। ‘রুমি’স সেক্রেট’ বইতে গুচ সেই সময়ের রাজনৈতিক, ধর্মীয় শিক্ষা কিভাবে রুমিকে আন্দোলিত করেছিল তা তুলে ধরেন। গুচ বলেন রুমি একটি মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন এবং আজীবন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এবং অন্যান্য ইস্লামিক বিধান যেমন- সিয়াম, হজ্জ, জাকাত, কোরানপাঠ ও কোরান অন্তস্থকরণ সবই কোঠর ভাবে পালন করেন। যদিও গুচের বইয়ে রুমির জীবনের এই সত্যতাকে এড়িয়ে রুমিকে প্রেম-ধর্মের গুরু বা  ইরোটিক-প্রেমের কবি রুমি বানানোর এক ধরনের চাপা উত্তেজনা দেখা যায়। যার ফলে এই সব পাঠে যা হয় তা হল-  রুমির ইসলামিক ব্যাকগ্রাউণ্ড চাপা পড়ে গেল, তার কবিতায় কোরান ও সুন্নার প্রভাব আড়ালে চলে গেল। মোজাজেদ্দি দেখান যে কোরান মুসলমান ও খ্রিস্টানদেরকে আহলে কিতাব -পিপল অব দ্যা বুক বলে যে কথা বলে, তা আসলে সর্বজনীনতায় নিয়ে যায়। এই যে বিশ্বজনীন তত্ত্ব আমরা রুমির কবিতায় পাই এবং তাকে মান্য করি তার কবিতার মূলধন হিসাবে এটি আসলে এসেছে রুমির কোরান পাঠ থেকেই।  

মনে রাখতে হবে রুমির কবিতা থেকে ইসলামকে মুছে দেয়ার যে প্রজেক্ট তা কিন্তু কোল্ড প্লের অনেক আগেই শুরু হয়েছে। ওমিদ সাফি, অধ্যাপক মিডল ইস্টার্ন এবং ইসলামিক স্টাডিজ, ডিউক ইউনিভারসিটি, বলেন- এটি আসলে পরিকল্পিত ভাবে শুরু হয়েছে ভিক্টোরিয়ান যুগেই, যেখানে রুমির মিস্টিক্যাল কবিতাগুলি তার ইসলামিক শেকড় থেকে উপড়ে ফেলা হয়েছে। সে সময়ের অনুবাদক এবং ধর্মতাত্ত্বিকগণ ‘মরুভূমি’র ধর্ম বলে খ্যাত ইসলামিক বিধিবিধান  তথা তার অসাধারণ নৈতিক ও আইনি অনুশাসনের সাথে রুমি  ও হাফিজের মরমী কবিতাগুলোকে মেলাতে পারেন নি। বলা যায় মেনে নিতে পারেন নি। অধ্যাপক সাফির মতে- তারা এই ন্যারেটিভিটি পশ্চিমা বিশ্বে তৈরি করতে সম্ভব হোন যে – রুমি মিস্টিক্যাল কবি ইসলামের জন্য হয় নি, বরং ইসলামকে বাদ দিয়ে। এতে তারা প্রবলভাবে সফল হয়েছে বলে মনে করি। কারণ পশ্চিমা বিশ্ব, এমন কি প্রাচ্য বলে আমরা যে দেশগুলো জানি তারা বিশেষ করে মধ্য প্রাচ্য, ভারত ও  বাংলাদেশের পাঠক ও  লেখকগণ রুমির ইসলামিক ব্যাকগ্রাউণ্ডের কথা আমলেই নেন না। ওরিয়ণ্টালিস্টরা যে পর্দা ফেলতে সক্ষম হয়েছে তার ফলাফল আমরা রুমি পাঠেই দেখতে পাই। রুমিকে সুফিকবি, গুরুকবি,  মিস্টিক ইত্যাদি অভিধায় মূল্যায়ন করে তার খাঁটি মুসলমান পরিচয়কে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে। এর সাথে কিছু ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক কারণও জড়িত। আমেরিকায় এক সময়  মুসলমানদেরকে লিগ্যাল ডিস্ক্রিমিনেশনের জন্য টার্গেট করা হয়। ১৭৯০ সালে আইন করে মুসলমানদের আমেরিকা আসা ব্যাপক হারে কর্তন করা হয়। ঠিক এর এক শতাব্দি পরে আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট এই বলে মত দেন যে মুসলমানরা অন্যান্য ফেইথের বা সেক্টের লোকদের প্রতি শক্ত শত্রুতা পোষণ করে। এর হাত ধরে ১৮৯৮ সালে ‘মাসনভি’ অনুবাদের ভূমিকায়, স্যার জ্যাম্বস রেডহাউস বলেন যে-  ‘মাসনভি’ সেই সকল মানুষদের উদ্দেশে লেখা যারা পৃথিবীর মোহ ত্যাগ করে সৃষ্টিকর্তাকে জানতে চায় ও তার সাথে থাকতে চায়। তাদের আমিত্বকে ধংস করে দেয়, নিজেদেরকে আধ্যাত্মিক ধ্যানে সঁপে দেয়। এখানে চতুরতার সাথে  রুমির কোরান ও নবীজির সাথে নিবিড় যোগাযোগের কথা বেমালুম নাই করে দেয়া হয়। এভাবে ইসলাম ও রুমি আলাদা হয়ে যায়, বলা যায়- রুমি থেকে ইসলামের বিচ্ছেদ ঘটানো হয়।         

বিংশ শতাব্দীতে এক ঝাঁক রুমি অনুবাদক যেমন- আর এ নিকোলসন, এ জে আরবেরি এবং এনমেরি শিম্মেল ইংরেজি ভাষায় রুমিকে ব্যাপক ভাবে পরিচয় করিয়ে দেন। কিন্তু বার্ক হল সেই রুমি অনুবাদক যে কিনা রুমি-পঠনের বিস্তৃতি ঘটান ব্যাপকভাবে। তিনি আসলে একজন অনুবাদক, রুমির কবিতার ব্যাখ্যাকারি নন। তিনি ফারসি লিখতে পারেন না পড়তেও পারেন না। রুমির কবিতার ব্যাকগ্রাউন্ড না জেনে বা এড়িয়ে গিয়ে তিনি উনবিংশ শতাব্দির অনুবাদগুলোকে আমেরিকান হালকা, সেক্সি পদ্যে পরিণত করে। বার্ক সাহেবের জন্ম ১৯৩৭ সালে, বড় হয়েছেন ছাত্তানুগা, টেনেসিতে। তিনি পি এইচ ডি করেন ইংলিশ লিটেরেচারে এবং তার প্রথম বই, কবিতার বই- ‘রস’ বের হয় ১৯৭১ সালে। পরের দশকে তিনি প্রথম রুমির কথা জানতে পারেন যখন কবি রবার্ট ব্লাই তাকে আরবেরির করা রুমির অনুবাদ উপহার দেন। রবার্ট ব্লাই তাকে বলেন যে- এইগুলি তাদের খাঁচা থেকে বের করে আনতে হবে। মানে এইগুলোকে আমেরিকান স্বাদে ও স্টাইলে অনুবাদ ও প্রকাশ করতে হবে।

অবশ্য আরো অনেকের মতো ওমিদ সাফি কিন্তু বার্ককে ক্রেডিট দিতে ভুলে যাননি। কেননা বার্ক জীবনের অনেক সময় রুমি-অনুবাদে ব্যয় করেছেন, শত হলেও আমেরিকায় লক্ষ লক্ষ পাঠকের সাথে রুমিকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন, তার কবিতাকে আমেরিকান কবিতা হিসাবে অন্তকরণ করিয়েছেন। এটিও বা কম কীসে? কিন্তু রুমির কবিতার আরো কয়েকটা সংস্করণ আছে, যেমন দীপক চোপরা এবং ড্যানিয়েল লাডিন্সকির নিউ এজ বুকস- যেগুলির বাজারজাতকরণ ও বিক্রি বহুল। কিন্তু সেগুলো রুমির কবিতার সাথে কোনো মিল নাই। চোপরা যিনি আধ্যাত্মিক বইয়ের একজন লেখক, তিনি স্বীকার করেছেন যে এই অনুবাদগুলোতে অন্তর্ভুক্ত কবিতাগুলো আদৌ রুমির কবিতা নয়। যেমন তিনি ‘রুমির প্রেমের কবিতা’ এর ভূমিকাংশে বলেছেন সেগুলো বরং একধরণের রুমি-আবহ, রুমি-ভাব বা পরিবেশ। তাই ইসলাম এখানে অনুপস্থিত। সাফি আরো বলেন- এই অনুবাদগুলো পড়ে আমি যা দেখতে পাই তা হলো- এক ধরণের ‘স্প্রিচুয়্যাল কলোনিয়ালিজম’ আধ্যাত্মিক উপনিবেশবাদ, যা কিনা একটা বিরাট বিচ্যুতি, তারা স্বার্থকভাবে মুছে ফেলছে ইসলামের শেকড়। বানানো নতুন ইরোটিক ভাষা দিয়ে দখল করছে একটি ইসলামিক আধ্যাত্মিক ভূ-স্বর্গ যার মাধ্যমে বসনিয়া থেকে ইস্তাম্বুল, ইস্তাম্বুল থেকে কনিয়া, কনিয়া থেকে মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার  মুসলমানেরা হাজার বছর ধরে শ্বাস প্রশাস নিয়েছে, তাদেরকে নিজের করে নিয়েছে। তিনি আরো বলেন- ইসলামিক রেফারেন্সকে রুমির কবিতা থেকে সরিয়ে নিলে সেই কবিতা আর রুমির কবিতা থাকে না, সেগুলি হয়ে যায় অনুবাদকারীর খেয়াল ও হেয়ালির ফসল।     

রুমি তার কবিতায় কোরান হাদিস ও ইসলামিক অনুষঙ্গ ব্যবহার করেছেন একটি অনুসন্ধানি মন নিয়ে। সত্য যে তিনি অনেক কিছুকেই প্রশ্ন করেছেন- কিন্তু মূল ধর্ম থেকে বিচ্যুত হন নি। কিন্তু বার্কের অনুবাদে ইসলাম বার বার হারিয়ে গেছে। যেমন বার্কের  জনপ্রিয় অনুবাদে- রুমি অনুবাদ এরকম- ‘মন্দকাজ আর ভালো কাজের বাইরে আছে একটি মাঠ। আমাদের দেখা হবে সেখানে’। কিন্তু মূল ফারসি কবিতায় মন্দ কাজ বা ভালো কাজের কোনো উল্লেখ নাই।  রুমি লিখেছেন ‘ইমান’ ও ‘কুফর’। চিন্তা করে দেখলে অবাক হতে হয় এই ভেবে- যে একজন বিশিষ্ট ইসলামিক স্কলার জালাল উদ্দীন মুহাম্মদ রুমিকে অনুবাদকেরা কীভাবে ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে গেছে। সাফি মনে করেন এ কারণেই ঐতিহাসিক ভাবে কোরানের পাশাপাশি মুসলমানদের চিন্তাধারাকে রুমি, হাফিজ এভাবেই গড়ে দিয়েছেন।  লেখক এবং অনুবাদক সিনান আন্তুন বলেন- ভাষা শুধুমাত্র যোগাযগের মাধ্যম নয়। ভাষা হলো ইতিহাস ঐতিহ্য ও  স্মৃতির ধারক। দুই সংস্কৃতির মধ্যে মিলনক্ষেত্র হিসাবে একজন অনুবাদক আসলে যেন একটি রাজনৈতিক প্রজেক্ট হাতে নেন। তাদেরকে অবশ্যই একটি গ্রহণযোগ্য মেথোডোলজি বের করতে হবে- যার মাধ্যমে তেরশ শতাব্দীর একজন ফার্সি ভাষার কবিকে এই সময়ের আমেরিকান ও পৃথিবীর অন্যান্য ভাষার পাঠকদের কাছে পরিচয় করিয়ে দেয়া যায়। কিন্তু তাদেরকে অবশ্যই মূল কবিতার কাছে সত্য থাকতে হবে, তাদেরকে আরো দায়িত্বশীল হতে হবে। যার ফলে এখনকার পাঠকেরা এই ভেবে পুলকবোধ করবেন- যে একজন ইসলামিক শরিয়ার শিক্ষকও কেমন করে পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় ভালোবাসার কবিতাগুলো লিখে গিয়েছেন ।


সহায়ক পাঠঃ

রোজিনা আলি ‘ দ্য ইরেজার অব ইসলাম ফ্রম দ্য পোয়েট্রি অব রুমি’ ২০১৭

ওরিয়েন্টালিজম, এডওয়ার্ড সাঈদ, ভিনটেজ বুকস, নিউ ইয়র্ক, ১৯৭৯

Share URL copied

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট

Related Articles

নারীঃ মর্যাদা, স্বাধীনতা ও ক্ষমতার সুলুক সন্ধান

এই কথা অস্বীকার করার উপায় নাই যে- আধুনিক পশ্চিমা নারীবাদ নারীর শিক্ষা,...

Metamorphosis ও The Outsider: অস্তিত্বের অন্ধকারে কাফকা ও কামু

(আশির ও নব্বইয়ের দশকে আমরা যখন লেখালেখি শুরু করি তখন ফ্রানৎস কাফকা...

মানবসৃষ্টির দর্শন, জ্ঞানতত্ত্ব ও অহংকারের উৎপত্তি

সূরা আল-বাকারার ৩০–৩৪ নম্বর আয়াতগুলিতে আমরা কুরআনের মানবতত্ত্বের ভিত্তিপ্রস্তর লক্ষ্য করি। এই...