বাংলা আমার মায়ের ভাষা, আমাদের প্রাণের ভাষা। নিজের ভাষার প্রতি ভালোবাসা থাকা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু ভাষাকে অতিরিক্ত ভক্তি, মহব্বত কইরা তাকে পূজার জায়গায় স্থান দিলে, সেইটা তখন আর ভাষা থাকে না, সেইটা তখন আর একটা ধর্মে পরিণত হয়। কথা বলার সাথে সাথে সেই ভাষায় সাহিত্য করা, নিজের ইতিহাস ঐতিহ্য বর্ণনা করা, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কাজ কারবার করা- একটা জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অধিকার। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন ভাষাকে শুধু যোগাযোগের মাধ্যম হিসাবে না দেইখা বা ইতিহাস ঐতিহ্যের অংশ না দেইখা মানুষের প্রধান আইডেন্টিটি বানানো হয়। তখন এইটা হয়ে পড়ে ভাষা ভিত্তিক জাতীয়তাবাদ, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদ। যখন এই ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদকে বাঙালি মুসলমানের প্রধান পরিচয় বানানোর জোড় চেষ্টা চলে, তখন এইটা আর একটা নিরীহ সাংস্কৃতিক ধারণা থাকে না। তখন এইটা একটা পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক ধর্মে পরিণত হয়। এই ধর্মে বাংলা ভাষা পবিত্র, বাঙালি জাতি চিরন্তন, কিছু কালচারাল সিম্বলস(সাংস্কৃতিক প্রতীক) প্রায় ইবাদতযোগ্য ও কিছু ঐতিহাসিক ন্যারাটিভ ধর্মীয় অনুশাসনের মতো। তখন কায়দা করে বাংলাদেশিদেরকে বলা হয়- তুমি আগে বাঙালি, তারপর তুমি মুসলমান বা অন্য কিছ। মানে তোমার মুসলমান পরিচয়টা পার্সোনাল কিন্তু বাঙালি পরিচয়টাই রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে আসল। তুমি নামাজ পড়ো, রোজা রাখো মসজিদে যাও কিন্তু তোমার ইসলাম তোমার সমাজ, রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি বা নৈতিকতার ব্যাপারে কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে না। অর্থাৎ ইসলাম থাকবে, কিন্তু বাসা বাড়ির ভেতরে থাকবে, মসজিদ মক্তবের ভিতরে থাকবে মানে খুবই ব্যক্তিগত হয়ে থাকবে। ইসলাম বাঙলা ভাষা ও সংস্কৃতির সামনে সেকন্ডারি মর্যাদা নিয়া থাকবে- এইটাই ভাষাভিত্তিক উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের পছন্দের ইসলাম।
ভারতীয় উপমহাদেশের দীর্ঘ ইতিহাসের দিকে চোখ দিয়া দেখা যায়, বাঙালি মুসলমানের পরিচয় এক দিনে গইড়া উঠে নাই। তাই তাকে এক বাক্যে প্রকাশ করা সম্ভব না। সে শুধু বাংলা ভাষায় কথা বলা একজন মানুষ না, তার আত্মপরিচয়ের ভিতরে আছে বিভিন্ন বাঁক। তার যেমন আছে বাংলা ভাষা, তেমনি আছে ইসলাম, আরবি, ফারসি জ্ঞান। তার যেমন আছে নদ,নদী বাহিত ভাটি বাংলার ইতিহাস, তেমনি আবার আছে নামাজ রোজা, কুরআন, আজান, মসজিদ, মক্তব ও উম্মাহর ঐতিহ্য। এই বহুস্তরীয় পরিচয়কে একমাত্র বাঙালি পরিচয়ের ভিতরে আটকাইয়া রাখলে তাকে খণ্ডিত করা হয়। উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদ এইটাই চায়। তারা চায় বাঙালি মুসলমান তার ধর্মীয় ইতিহাস, স্মৃতি, তার আরবি-ফারসি জ্ঞানের সাথে সম্পর্ক এবং বিশ্ব মুসলিম জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তার উম্মাহ কেন্দ্রিক যোগাযোগ ছিহ্ন করুক। কারণ তারা মনে করে- এইসব জ্ঞান ও সম্পর্ক যত থাকবে, ততই ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তা সর্বোচ্চ পরিচয় হইতে পারবে না। তাই বাঙালি মুসলমানকে এমনভাবে শিক্ষা দেওয়া হয় যেন তার ধর্মীয় ইতিহাস বাংলার বাইরের, আর তার আসল ইতিহাস শুধু বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও কিছু বাঙালি প্রতীকের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
বাংলা ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা এমনভাবে কথা বলে যেন বাঙালি জাতি ইতিহাসে চিরকাল ছিল। যেন বাঙালি জাতি হাজার বছর ধরে একই পরিচয়, একই চেতনা, একই সংস্কৃতি নিয়া ইতিহাসে হাজির আছে। আসলে আধুনিক ‘বাঙালি’ পরিচয় সৃষ্টি হইছিলো ঔপনিবেশিক আমলে (১৭৫৭-১৯৪৭)। মূলত ব্রিটিশ শাসন, ইংরেজি শিক্ষা এবং কলকাতা-কেন্দ্রিক হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণী, বাবু সমাজের হাত ধইরা। ব্রিটিশদের আগমনের আগে এই অঞ্চলের মানুষের মূল পরিচয় ছিল ধর্ম ও পেশাভিত্তিক। ১৮০০ সালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার পর ব্রিটিশরা শাসনকাজের সুবিধার্থে বাংলা ভাষা থেইকা আরবি ফারসি ও তুর্কী ভাষা বাদ দিয়া এইটাকে তথাকথিত প্রমিত রূপ দেয়। তারপর ইংরাজি শিক্ষিত হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণী এই ভাষার ওপর ভিত্তি কইরা একটা রাজনৈতিক পরিচয় খুঁজতে শুরু করে। আর উনিশ শতকে কলকাতা-কেন্দ্রিক বাংলার যে ‘নবজাগরণ’ ঘটে, তা শিক্ষিত হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণী নিয়ন্ত্রিত বাঙালি জাতীয়তাবাদী সংস্কৃতির জন্ম দেয়। বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম চন্দ্র, রবীন্দ্রনাথসহ এরকম সাহিত্যক ও বুদ্ধিজীবীদের সাহিত্য ও চিন্তার মাধ্যমে এই আধুনিক ‘বাঙালি’ পরিচয়ের ক্রমশ বিকাশ ঘটে। ইউরোপের এক ভাষা, এক জাতি (Nation-State) তত্ত্ব অনুসারে তৎকালীন এই এলিট শ্রেণী বাংলা ভাষাভাষী মানুষকে রাজনৈতিক জাতি হিসাবে সামনে আনে। ঔপনিবেশিক আমলে তৈরি হওয়া এই বাঙালি পরিচয় মূলত ছিলো কলকাতার উচ্চবর্ণের হিন্দু সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি কইরা গড়া একটা পরিচয়, তাই তাতে ছিলো না বাঙালি মুসলমানের সহজ অংশগ্রহণ ও বিকাশের পথ। ফলে এই বাঙালি জাতীয়তাবাদের খপ্পরে পইড়া পূর্ব বাংলার বিশাল গ্রামীণ, মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস, ভাষা, ইসলামী ঐতিহ্য ও ইতিহাস হুমকির সামনে পড়ে।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেইকা বাঙলা ভাষাকেন্দ্রিক উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদ ঘেঁষা পাঠ্যবই, সংবাদপত্র, শিল্প সাহিত্য ও ইতিহাসের মাধ্যমে জাতির মনস্তত্ত্ব তৈরি করা হইছে। তাই রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সাংস্কৃতিক হেজিমনির কেন্দ্রে থাকা বাঙালি জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক সুশীল গোষ্ঠী(!) সহজেই ঠিক কইরা দেয়- স্কুলে কলেজে কোন পাঠ্যসূচি অন্তর্ভূক্ত হবে, কোনটা হবে না, কারা বন্ধু কারা শত্রু, কারা নায়ক কারা ভিলেন, কোন ঐতিহাসিক দিবস পালিত হইবো, কোন পোশাক পরলে বাঙালি হওয়া যাইবো, কোন ইসলামি অনুষ্ঠান পালন যোগ্য, কোন উৎসব সর্বজনীন ইত্যাদি। তারপর এই কৃত্রিম কাঠামোকে বলা হয় বাঙালি সংস্কৃতি। যে সংস্কৃতি আসলে একটা বিশেষ সমাজ ও শ্রেণীর সংস্কৃতি, যে সংস্কৃতি তাদের স্বার্থ সার্ভ করে, সেইটারে জাতীয় সংস্কৃতি বইলা চাপানো হয়। যদি বাঙালি মুসলমান এই সংস্কৃতিকে, এই কালচারাল হেজিমনিকে প্রশ্ন করে, তখন তাকে হয় সাম্প্রদায়িক বা পাকিস্তানপন্থী বইলা ট্যাগ দেওয়া হয়।
আবারও একটু ব্যাকগ্রাউণ্ড চেক। ১৭৯৩ থেকে ১৮৩৫ সালের মধ্যবর্তী সময়ে বাংলার ইতিহাসে কয়েকটা মারাত্মক ঘটনা ঘটছিল। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু (১৭৯৩), ফারসি ভাষার বিলুপ্তি ও ইংরেজি ভাষার প্রবর্তন (১৮৩৭), হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা(১৮১৭) ও ছাপাখানা ও নতুন সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠান (১৮০০-১৮১৮) তৈরি ঘটনাগুলির কারণে বাঙ্গালি হিন্দু সমাজের ভাগ্যের উন্নতি ও বাঙ্গালি মুসলমানের ভাগ্যের অবনতি হয়। এই সুবিধাজনক পরিবেশে, ঊনবিংশ শতাব্দীর কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু বাবু সমাজের মাধ্যমে বাংলার আধুনিক বাঙালি সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল গইড়া ওঠে। তারা ইংরাজি শিক্ষা, ঔপনিবেশিক প্রশাসন, ছাপাখানা ও নতুন সাহিত্যিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সুবিধা নিয়া বাংলা ভাষাকেন্দ্রিক হেজিমনি, রুচি ও শক্তি তৈরি করতে সক্ষম হয়। সেই সময়ে যারা Think Tank (বুদ্ধিবৃত্তিক গোষ্ঠী) হিসাবে হাজির হোন তারা হইলেন- রাজা রামমোহন রায় (১৭৭২–১৮৩৩), হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও (১৮০৯–১৮৩১), ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০–১৮৯১), বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮–১৮৯৪) ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১–১৯৪১)। উনাদের প্রত্যেকেরই মিল ছিল এক জায়গায়- উনারা প্রত্যেকেই কলকাতার হিন্দু কলেজ, ফোর্ট উইলিয়াম বা সংস্কৃত কলেজের সাথে যুক্ত ছিলো, ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন এবং ঔপনিবেশিক প্রশাসনের আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা পুরাপুরি নিছিলেন। অন্যদিকে ওপরের প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ও শিক্ষাব্যবস্থা পরিবর্তনের কারণে বাঙালি মুসলমান শিক্ষা, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে অনেক পিছনে পইড়া যায়। পূর্ববঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের জীবন ছিল কৃষি নির্ভর, দরিদ্র ও আধুনিক শিক্ষার সুযোগ থেইকা বঞ্চিত। তাদের জীবন ঘেরা ছিলো- মক্তব-মাদ্রাসা, পুঁথিসাহিত্য, পীর-দরবেশ, গ্রামীণ কবিতা ও সামাজিক স্মৃতি দিয়া। কলকাতাকেন্দ্রিক আধুনিক বুদ্ধিজীবীদের চোখে এইগুলি ছিল জাস্ট গ্রাম্য সংস্কৃতি! তখন বাঙালি কালচার ও সাহিত্য নামের যে স্ট্যান্ডার্ড প্রতিষ্ঠিত হইলো, সেই মানদণ্ডের ভিতরে মুসলমানরে ঢুকতে হইল নিজের ইতিহাস, ঐতিহ্য বাইরে রাইখা। হিন্দু বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা এই হেজিমনি প্রতিষ্ঠা করলো যে- মুসলমানদের ইতিহাস আরব, ইরান তুরানের ইতিহাস, আরবি-ফারসি শব্দভান্ডার অপর, ধর্মীয় পোশাক গ্রাম্য, পুঁথিসাহিত্য ঊন সাহিত্য। এই সাংস্কৃতিক আধিপত্যের কারণে বাঙালি মুসলমান, কেউ কেউ নিজের ধর্মবোধ নিয়া সন্দেহের মধ্যে পইড়া গেলো। তাকে ইন্ডাইরেক্টলি বলা হইলো আধুনিক হও মানে ধর্ম ছাড়ো, ঘরের বাইরে আসো, খাঁটি বাঙালি হও। আর এই খাঁটি বাঙালি হওয়ার শর্ত হইল, হিন্দু বাঙালি জাতীয়তাবাদের পতাকা উচা কইরা ধরা আর নিজের ধর্মীয় ভাষা ও ইতিহাস, ঐতিহ্য থেইকা দূরে থাকা।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে পূর্ব বাংলার মানুষের ন্যায্য অধিকার, সামাজিক মর্যাদা ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠার লড়াই। বলার অপেক্ষা রাখে না যে এই আন্দোলনের প্রধান অংশগ্রহণকারীদের বড় অংশই ছিল বাঙালি মুসলমান। তারা বাংলা ভাষায় কথা বলার অধিকার চাইছিল, ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করতে চায় নাই। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ভাষা আন্দোলনকে নিয়া বাঙালি জাতীয়বাদীরা এমনভাবে একটা ন্যারেটিভ সামনে নিয়া আসে, যার মাধ্যমে মুসলিম পরিচয় আর বাঙালি পরিচয়ের মধ্যে একটা টেনশন, একটা দ্বন্দ্ব তৈরি হইলো। সত্য পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী রাষ্ট্রের শাসন ও ইসলামী ঐতিহ্য এক কইরা রাজনীতি করতে চাইছিল। কিন্তু পরে ভাষাভিত্তিক উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা এই রাজনীতিকে হীন চক্রান্ত কইরা অন্য দিকে প্রবাহিত করলো। তারা পাকিস্তানি শাসকদের জেল জুলুম ও ইসলামকে এক জিনিস বইলা একটা মিথ্যা বয়ান দাঁড় করাইতে সক্ষম হইলো। যার ফলে পাকিস্তানের সমালোচনা ধীরে ধীরে মুসলমান পরিচয়ের সমালোচনায় পরিণত হইল। এর ফাঁদে জনগণ পা রাখলো এবং উর্দুর বিরোধিতা মানে ইসলামি পরিচয় ও ঐতিহ্যের বিরোধিতায় গড়াইল। এইভাবে ভাষার ন্যায্য আন্দোলনকে বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা একটা মতাদর্শিক অস্ত্রে পরিণত করলো।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়া রাজনীতি। আমরা জানি যে মুক্তিযুদ্ধ কোনো একক দলীয় যুদ্ধ ছিল না। গ্রামের কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, শিক্ষক, ধর্মপ্রাণ মুসলমান, বামপন্থী, সব ধরনের মানুষ এই যুদ্ধে অংশ নিছে। কিন্তু স্বাধীনতার পর এমন একটা বয়ান তৈরি করা হইছে, যেখানে ধর্মপ্রাণ সাধারণ মুসলমানের ভূমিকার কথা তেমন বলা হয় না। মনে হয় মুক্তিযুদ্ধ কেবল ধর্মনিরপেক্ষ, বাঙালি সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদীরা করছে। এই বয়ান শুধু ভুল না, রাজনৈতিকভাবেও বিপজ্জনক, কেননা কিছু ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূমিকার দায় সমগ্র ইসলামের ঘাড়ে চাপানো হইছে। উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের দরকার পরিষ্কার নায়ক ও পরিষ্কার শত্রু। ফলে যে মানুষ তাদের বয়ানের সমালোচনা করে, তাদের মতে তারা স্বাধীনতাবিরোধী হয়ে যায় ।
উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদিরা, তাদের ক্ষমতা ও প্রভাব ধইরা রাখার জন্য সব সময় একটা কল্পিত, আদর্শ বাঙালি বানায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেই আদর্শ বাঙালি হইলো শহুরে, শিক্ষিত, বিশেষ সাহিত্যিক রুচির, বিশেষ উৎসবপ্রিয় এবং ইসলাম ধর্ম পালনের ব্যাপারে উন্নাসিক ও ফাসিক বাঙালি। কেউ এই ছাঁচের বাইরে গেলেই তাকে ট্যাগিং করা হয় যেমন হিজাব পরলে নিপীড়িত, দাড়ি রাখলে মৌলবাদী, আরবি নাম রাখলে ইরান তুরানি, নামাজ রোজা করলে পশ্চাৎপদ। এইভাবে তারা মুসলমানদেরকে তাদের নিজের সমাজে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করায়া দেয়। কপাল মন্দ! বাঙালি মুসলমানকে গত ৫০ বছর যাবৎ বারবার প্রমাণ করতে হইছে – সে বিপজ্জনক না বা সে বাংলাদেশ বিরোধী না, সে আরব দেশের না, সে শত ভাগ বাংলাদেশের। কিন্তু একজন ধর্মনিরপেক্ষ বাঙলা ভাষা ভিত্তিক, সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদীকে কখনো প্রমাণ করতে হয় না যে সে কিভাবে বাংলাদেশ প্রেমিক।
ভাষা শুধু শব্দ দিয়া গইড়া উঠে না, ভাষা মানুষের স্মৃতি, ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের মাধ্যমেও অগ্রসর হয়। বাঙালি মুসলমানের কথ্য ও লেখ্য বাংলায় আরবি-ফারসি শব্দের উপস্থিতি তার ইতিহাস ও জীবনধারার স্বাভাবিক ফল। তার ভাষায় ব্যবহার করা- আল্লাহ,সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, ঈমান, আমল, নামাজ, রোজা, নবী, রাসুল, হালাল, হারাম, মেহনত, খেদমত ইত্যাদি আরবি ফারসি শব্দ তার প্রতিদিনের জীবন ও চেতনার অংশ। কিন্তু বাঙালি জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক শুদ্ধিবাদীরা সংস্কৃতঘেঁষা শব্দরে বলে শুদ্ধ কিন্তু মুসলিম শব্দভান্ডারকে বলে সাম্প্রদায়িক। তাদের মতে প্রার্থনা, নিমন্ত্রণ, পূণ্য এইসব শব্দ সভ্য ও সংস্কৃতিবান, অপরদিকে আরবি শব্দ দোয়া, দাওয়াত, বারাকাহ সংকীর্ণ ও কম মার্জিত। একইভাবে কবিতায় ব্যবহৃত জল কাব্যিক, কিন্তু পানি মুসলমানি। এইসব শব্দের রূপ, গুণ বিচার আসলে ভাষাবিজ্ঞানের না, এইগুলি হেজিমনি ও ক্ষমতার বিচার। এইগুলির মাধ্যমে বাঙালি মুসলমানের মধ্যে তার নিজস্ব শব্দ ব্যবহার করতে লজ্জাবোধ তৈরী করানো হয়। তার ফলে সে নিজের ভাষা জনপরিসরে ব্যবহার করতে সংকোচ বোধ করে। তখন ধীরে ধীরে তার ভাষাই তার কাছে অপরিচিত হইয়া যায়।
বাঙালি কালচারাল হেজিমনির কারণে বাংলাদেশের ইতিহাস দীর্ঘদিন যাবৎ খণ্ডিত ও অর্ধ সত্য উপকরণ দিয়া লেখা। আজ বাংলাদেশের ইতিহাস বলতে আমরা কী জানি? নির্দিষ্ট কিছু রাজা, মহারাজা, নির্দিষ্ট কিছু কবি সাহিত্যিক, কলকাতাকেন্দ্রিক নবজাগরণ, কিছু লোকজ উৎসব, ভাষা আন্দোলন আর ৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধ। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাস তো শুধু এইগুলির সমাবেশ না। বাংলাদেশের ইতিহাস বাংলার মুসলিম সুলতানি যুগ, মসজিদ স্থাপত্য, পুঁথিসাহিত্য, সুফি আন্দোলন, মুসলিম কৃষকের সামাজিক ইতিহাস, ফরায়েজি আন্দোলন, ঔপনিবেশিকতাবিরোধী আলেমদের সংগ্রাম ইত্যাদির উল্লেখ ছাড়া অসম্পূর্ণ। বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা এই কাজটাই খুব কৌশলে করে। তারা বাংলাদেশের এই উল্লেখযোগ্য অধ্যায়গুলির কথা কদাচিৎ উল্লেখ করে। মহাকবি আলাওল, সৈয়দ সুলতান, শাহ মুহম্মদ সগীর, আবদুল হাকিম- খাঁটি বাঙালি মুসলমান। ভাটি বাংলার মুসলিম কৃষক, শ্রমিক বাঙালি ইতিহাসের আসল বাংলাদেশের নির্মাতা। বাংলাদেশের গ্রামের মসজিদ, মক্তব, খানকা, পুঁথি, জারি, হামদ, নাত- এইগুলি বাংলাদেশের অমূল্য সাংষ্কৃতিক সম্পদ। কিন্তু উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদ ইসলামী ঐতিহ্য ও মুসলমানদেরকে বাংলাদেশের ইতিহাসের কেন্দ্রে রাখতে চায় না। যার ফলে বাঙালি মুসলমান তার ইসলামী সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে নিজেদের সৃজনশীল ইতিহাস হিসাবে দেখতে একপ্রকার দ্বন্দে ভোগে। ভাষা ভিত্তিক বাঙালি জাতীয়বাদীরা জানে- যে বাঙালি মুসলিমের ইতিহাস আড়াল করতে পারলে তার আত্মবিশ্বাসও কাইড়া নেওয়া সম্ভব।
বাঙালি জাতীয়বাদীরা তাদের কালচারাল হেজেমনি টিকাইয়া রাখার জন্য কিছু কালচারাল আইকন তৈরী কইরা নিছে। এর মধ্যে অন্যতম হইলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সন্দেহ নাই রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যের বিরাট প্রতিভা। কিন্তু প্রশ্ন সৃষ্টি হয় যখন তাকে সমগ্র বাঙালি পরিচয়ের একমাত্র সাংস্কৃতিক আইকন বানানো হয়। রবীন্দ্রনাথে কোনো অসুবিধা নাই, অসুবিধা রাবীন্দ্রিনাথকে এককভাবে ব্যবহার করায়। আমরা দেখি শিক্ষা, সংগীত, নান্দনিকতা, সংস্কৃতিবোধ- সবখানে রবীন্দ্রঘেঁষা একটি বিশেষ ধারাই বাঙালিত্বের চূড়ান্ত প্রতিনিধি বইলা প্রকাশ করা হইছে। এর ফলে বাংলাদেশের অন্যান্য সাংস্কৃতিক ধারাগুলি মাথা উঁচু কইরা দাঁড়াইতে পারে নাই। একজন মুসলমান রবীন্দ্রনাথ পড়তে পারে কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে প্রশ্নাতীত সাংস্কৃতিক আইকন হিসাবে মানতে বাধ্য কেন হবে? জাতীয়তাবাদীরা ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের বিশেষ কইরা মুসলমান ধর্মের ব্যক্তিত্বের সমালোচনার স্বাধীনতা চায়, কিন্তু নিজের সাংস্কৃতিক আইকনের সমালোচনা সহ্য করতে পারে না। এই দ্বৈততা তাদের হিপোক্রেসিই প্রমাণ করে।
এইখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট যোগ করা দরকার। উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা বাঙালি মুসলমানকে সরাসরি ইসলাম ছাড়তে বলে না। তারা তলে তলে খুবই কৌশলীভাবে কয়েকটি ধাপে আগায়- ১) প্রথমে সে মুসলমানের ভেতর তার ইসলামিক ঐতিহ্য নিয়া লজ্জাবোধের বীজ বুনে দেয় ২) তার ধর্মীয় ভাষাকে অকেজোর তকমা লাগায় ৩) তার বিশ্বাসকে ব্যক্তিগত বিশ্বাস বানায় ৪) তার ইসলামিক পোশাককে পশ্চাৎপদ হিসাবে প্রচার করে ৫) এবং সবশেষে সে এমন এক কালচারাল মুসলমান তৈরি করে, যে ঈদ করে কিন্তু ইসলামি সভ্যতা চেনে না, নামাজ পড়ে কিন্তু শারিয়া মানে না, মুসলিম নাম বহন করে কিন্তু নিজের মুসলিম ঐতিহ্য নিয়া হীনমন্যতায় ভোগে। এইটাই বাঙালি মুসলমানের ধর্মবোধ নষ্ট করার সবচেয়ে বিপজ্জনক ধাপ। এইটা বাংলাদেশের কবি লেখক সাহিত্যিকদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।
এইটা মনে রাখা গুরুত্ত্বপূর্ণ যে সংস্কৃতি মানুষের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক কিন্তু সত্য ও ঈমানের মাপকাঠি সংস্কৃতি না। জাতি মানুষের সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন কিন্তু মানুষের চূড়ান্ত আনুগত্যের অধিকার জাতির নাই। তাই বাঙালি মুসলমান তার বিশ্বাসকে কোনো রাজনৈতিক চাপের মুখে সন্দেহের চোখে দেখবে না, আবার বাংলা ও ইসলামকে একে ওপরের মুখোমুখি করবে না । বাঙালি মুসলমানের উচিত হবে নিজের ভাষার ভিতরে দাঁড়াইয়া নিজের নিজের মুসলমানি ইসলামী সভ্যতাগত আত্মপরিচয় সদর্পে ঘোষণা করা ।
উগ্র জাতীয়তাবাদের কাছে একটা গ্রহণযোগ্য ইসলাম আছে। সেইটা কোন ইসলাম? সেইটা ওই ইসলাম, যা জুলুমকে প্রশ্ন ও প্রতিরোধ করে না, সংস্কৃতির ভালো মন্দ বিচার করে না, যে ইসলাম রাষ্ট্র ও কালচারাল হেজিমোনির কাছে সবসময় মাথা নুইয়া রাখে। উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদের কাছে লোকজ ইসলাম গ্রহণযোগ্য, মাজারের গান ও লালন ফকির গ্রহণযোগ্য, কবিতায় সুফিবাদ গ্রহণযোগ্য। কিন্তু কুরআনের দাবি বা ইসলামি আইন কার্যকর করা অস্বস্তিকর। খেয়াল করেন- ভোগবাদ, সুদ, যৌননীতি, পরিবার, ক্ষমতা ও রাষ্ট্র নিয়া মুসলমান যদি আলাপ করে বা বাধা দেয় সেইটারে পশ্চাদপর বা মৌলবাদ বইলা ট্যাগ দেয়া হয়। এইটার মানে হইলো – ইসলাম থাকবে শুধু নান্দনিকতায়, লোকজ আচার অনুষ্ঠানে, ইসলাম থাকবে না নৈতিক কর্তৃত্বে। এইভাবে ইসলামকে প্রথমে লোকসংস্কৃতিতে নামাইয়া নিষ্ক্রিয় কইরা ধীরে ধীরে জনগণের মনকে থেইকা মুইছা ফেলার প্রকল্প করা হয়।
এইবার আধুনিক বাঙালি মুসলমানের ভুল জীবন দর্শন নিয়া একটু আলাপ করবো। আধুনিক শিক্ষিত বাঙালি মুসলমান কলকাতাকেন্দ্রিক বাংলা সাহিত্য ও পাশ্চাত্য জ্ঞান কাঠামোর অনেককিছুই অন্তঃকরণ করছে, কিন্তু নিজের ইসলামী ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জ্ঞানকাঠামো সম্পর্কে তাদের সম্মান ও জ্ঞান দুইটাই দুর্বল। তারা হাফ সেক্যুলার হাফ মুসলমান, নিয়মিত নামাজ পড়ে না, কোরান পড়ে না, ইসলামের ইতিহাসও জানে না। এই বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতা তৈরি হইছে বাংলাদেশের সেক্যুলার, কোথাও কোথাও ইসলাম বিরোধী শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে। তারা মনে করে দুই বাংলার সেক্যুলার লেখক, কবি সাহিত্যিকেরা জীবন সম্পর্কে যা বলে তাই গ্রহণযোগ্য, তেমনিভাবে পাশ্চাত্য জ্ঞান ও দর্শন অনুসরণযোগ্য, কিন্তু ইসলামি দর্শন ‘আরব দেশের’ তাই বহিরাগত। পশিচমা ধর্ম নিরপেক্ষতা তত্ত্ব মূল্যবান ও বুদ্ধিবৃত্তিক কিন্তু কুরআনের আদেশ নিষেধ ব্যক্তিগত ব্যাপার। ফলে একজন শিক্ষিত মুসলমান নিজের ধর্ম বিষয়ে অজ্ঞ থেইকা বৌদ্ধিকভাবে আলোচনা করতে অক্ষম। এই দুর্বলতার সুযোগে উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদিরা তাকে মিথ্যা ন্যারাটিভ বুঝাইতে সক্ষম হইছে যে ‘ইসলাম মধ্য যুগীয় ধর্ম।
পশ্চিমা ফেমিনিজম(নারীবাদ) এর ওপর ভিত্তি কইরা উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা নারী স্বাধীনতার একটা ন্যারেটিভে তৈরি করে। সেই ন্যারেটিভ অনুযায়ী নারী পশ্চিমা ধরণের পোশাক আশাক পরবে, বাংলা ও বাংলা ভাষা কেন্দ্রিক অনুষ্ঠানগুলিতে অংশ গ্রহণ করবে, কিন্তু ইসলামী আচার অনুষ্ঠান থেইকা দূরে থাকবে। কোনো বাঙালি মুসলমান নারী যদি তার ইচ্ছা অনুযায়ী হিজাব পরে, ধর্মীয় জীবন বাইছা নেয় বা ইসলামী জীবন ও চিন্তার ভেতর নিজের মর্যাদা ও শান্তি পায়, তার পছন্দকেও স্বাধীন পছন্দ হিসাবে মানতে সমস্যা থাকার কথা না । কিন্তু বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা তা মানতে রাজি না। পশ্চিমাদের কায়দায়, তারা ইসলামিক অনুশাসন মানা নারীদেরকে নিয়ন্ত্রিত, নিপীড়িত, পশ্চাৎপদ বইলা ট্যাগ দেয়। অন্যদিকে তাদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিজ্ঞাপন, বাজার ও বিনোদনশিল্প নারীর শরীর দেখানো হইলে এইটাকে তারা নারী স্বাধীনতা ও আধুনিকতা বইলা স্বীকৃতি দেয়। তাই ধর্মনিরপেক্ষতা ও আধুনিকতার নামে বাঙালি মুসলমান নারীর বিশ্বাস ও সিদ্ধান্তকে অপমান করা হিপোক্রেসি ছাড়া কিছুই না।
স্বাধীনতার ৫৬ বছর পরেও একটা উদ্দেশ্য প্রনোদিত(সাংঘর্ষিক) প্রশ্ন ‘তুমি আগে বাঙালি, না মুসলমান?’ সামনে হাজির কইরা বাংলাদেশের মানুষকে দুই ভাগে ভাগ কইরা রাখা হইছে। এইটার রুট সেই বাঙালি জাতীয়তাবাদের আঁতুড়ঘরেই যে জন্ম হইছে এইটা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। কারণ তারা জানে যে দুর্বল ঈমানের লোকেরা বাঙালিকেই বাইছা নিবে এবং ইসলামকে চাপানো বা দূরের কিছু বইলা মনে করবে। ফলে সে ধীরে ধীরে ইসলাম থেকে সরে যাবে। একজন বাঙালি মুসলমানকে যখন এই প্রশ্ন করা হয়, তখন বোঝা যায় যে এইটা একটা রাজনৈতিক ফাঁদ। কিন্তু ইতিহাসের দিকে তাকালেই এইটাকে সহজেই ফয়সালা করা যায়। বাংলা ও বাঙালি তার ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয়। মুসলমান তার ধর্মীয় পরিচয়, বাংলাদেশি তার নাগরিক পরিচয়। এই পরিচয়গুলি একই স্তরের না, কিন্তু আলাদাও না । তাই একটার সাথে আরেকটার প্রতিযোগিতা তৈরি করার মধ্যে হীন চক্রান্তের কথা প্রমাণিত হয়। একজন মুসলমানের চূড়ান্ত নৈতিক আনুগত্য আল্লাহর প্রতি, কিন্তু সেই আনুগত্য তাকে নিজের সংস্কৃতি, ভাষা, দেশ ও ইতিহাসের নিরবচ্ছিন্ন উপস্থিতি থেইকা দূরে সরাইয়া দেয় না। ইসলাম আরবদেশে, আরবি ভাষায় নাজিল হইছে সত্য, কিন্তু একজন চীন দেশের লোক ইসলাম গ্রহণ করলে তার চীনা ভাষা ও সংস্কৃতিকে সে বাদ দিতে পারবে না। কোরান ও হাদিসে এমন কোনো নির্দেশ নাই। ইসলাম বাংলা ভাষাকে বাদ দিতে বলে না, ইসলাম চায়- দেশ, ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য সত্য ও ন্যায়ের অধীন থাকবে।
বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়ের এই কৃত্রিম সংকট দূর করতে হইলে নিজের বহুমাত্রিক পরিচয়কে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। তাকে ভাবতে হবে- আমার পরিচয়ের প্রধানতম ভিত্তিগুলি হইলো ১) পরম করুণাময় আল্লাহর প্রতি চূড়ান্ত সমর্পণ ও আনুগত্য ২) বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষা। সাথে সাথে বাংলা ভাষাভিত্তিক উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের বিদ্বেষমূলক, দ্বিচারিতাপূর্ণ অবস্থানকেও গভীরভাবে আইডেন্টিফাই করা প্রয়োজন। যারা মুখে অসাম্প্রদায়িকতার বুলি আওড়ান, অথচ এই ভূখণ্ডের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুভূতিকে অবজ্ঞা করে, তাদের জাতীয়তাবাদ আসলে ভণ্ডামিরই নামান্তর। তারা বাঙলা ভাষা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদকে ধর্মের মর্যাদা দিতে গিয়া বাংলাদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর শত বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আত্মিক সত্তাকে সচেতনভাবে আড়াল করতে চান। তাদের এই হিপোক্রেসি একদিকে যেমন মুসলমানকে নিজের শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে, অন্যদিকে সমাজে এক গভীর বিভাজন তৈরি করে। তাই বাঙালি মুসলমানের বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব হইলো- এই দ্বিচারিতাকে সাবধানে মোকাবিলা করা এবং বাংলার মুসলিম ঐতিহ্যের যে সমৃদ্ধ ইতিহাস, মূল্যবোধ, শিক্ষা, সাহিত্য ও সমাজচেতনা আছে, তাকে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ও জনপরিসরে পুনরুজ্জীবিত করা। একই সাথে, বাংলা ভাষায় এমন একটি শক্তিশালী ইসলামিক জ্ঞান কাঠামো, সাহিত্য ও সমাজচিন্তা গড়ে তুলতে হবে, যা ধর্মীয় অনুভূতির প্রতিফলন ঘটানোর সাথে সাথে সমকালীন দেশীয় ও বৈশ্বিক সংকটে মানবজাতিকে নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পথ দেখাবে।
নোটসঃ রচনাটির চিন্তা শুরু ২০২০ সালে, লেখা শুরু ২০২১ সালে, শেষ ২০২৫ সালে
তথ্যসূত্রঃ
বদরুদ্দীন উমর, The Emergence of Bangladesh
আহমদ ছফা, বাঙালি মুসলমানের মন
আনিসুজ্জামান, মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য
Talal Asad, Formations of the Secular (2003)
Partha Chatterjee, The Nation and Its Fragments (1993)
Richard Eaton, The Rise of Islam and the Bengal Frontier (1993)
Rafiuddin Ahmed, The Bengal Muslims 1871–1906
Benedict Anderson, Imagined Communities (1983)
Ernest Gellner, Nations and Nationalism (1983)

Review Overview
Summary
Pellentesque iaculis gravida nulla ac hendrerit. Vestibulum faucibus neque at lacus tristique eu ultrices ipsum mollis. Phasellus venenatis, lacus in malesuada pellentesque, nisl ipsum faucibus velit, et eleifend velit nulla a mi. Praesent pharetra semper purus, a vehicula massa interdum in.
The Pros
Eclectic and evocative soundtrack Rhythm gameplay Tough challengeThe Cons
Woefully out of place Pacing slows Exploration sequences feel drawn out- Design4.5
- Usage4
- Document4.5
Leave a comment