Current date November 9, 2026
স্প্রিচ্যুয়াল লেখা

নফস ও রূহঃ মানুষের দ্বৈত সত্তার দর্শন

URL copied
Share URL copied

মানব অস্তিত্বের মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক সত্তাগত ধারণার মূল ভিত্তি পাওয়া যায় কুরআনের দুইটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়- নফস ও রূহ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে । মানুষ কী, ন্যায়পরায়ণতা কীভাবে ধারণ করা যায়, আত্মসন্তুষ্টি ও শান্তি কীভাবে লাভ করা যায়, কেন মানুষের জীবন শুভ ও অশুভের মধ্যে এক অবিরাম যুদ্ধ- এই প্রশ্নগুলির উত্তর নফস ও রূহকে ভালোভাবে জানার মাধ্যমেই আমরা পাইতে পারি। ইসলামী ঐতিহ্যে মানুষকে কেবল একটি জৈবিক প্রাণী হিসাবে দেখা হয় না বরং মানুষকে দেখা হয় মাটি ও আত্মার, প্রবৃত্তি ও আধ্যাত্মিকতার অর্থাৎ নফস ও রূহের সম্মিলনের ফলাফল। তাই নফস ও রূহ সম্পর্কে জানা জ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

নফস ও রূহ কী? তা জানতে হইলে আমাদেরকে মানুষের সৃষ্টি প্রক্রিয়াটা একটু লক্ষ্য করা দরকার। কুরআনের নিবিড় পাঠে আমরা লক্ষ্য করি কুরআনে মানুষের সৃষ্টিকে দুইটা পৃথক ঘটনার মাধ্যমে বর্ণনা করা হইছে। কুরআন অনুসারে মানুষকে সৃষ্টি করা হইছে মাটি থেকে, আল্লাহ বলেন ‘আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি মাটির নির্যাস থেকে।’ (সুরা আল-মুমিনুন ২৩:১২) এরপর দ্বিতীয় ঘটনা ঘটে আল্লাহ কর্তক মানুষের শরীরে রূহ ফুঁকে দেওয়ার মাধ্যমে- ‘অতঃপর আমি তাকে সুগঠিত করলাম এবং তার মধ্যে আমার রূহ থেকে ফুঁকে দিলাম।’ (সুরা আল-হিজর ১৫:২৯; সুরা সাদ ৩৮:৭২)। তাই নফস ও রূহ এই দ্বৈত বিষয় মানুষের অস্তিত্বের মৌলিক কাঠামো ও চরিত্রের দুইটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মানুষ একই সঙ্গে দুই জগতের অধিবাসী- এক দিকে আছে বস্তু, প্রবৃত্তি ও জৈবিক প্রয়োজনের জগৎ অপর দিকে আছে আধ্যাত্মিকতার জগৎ। নফস মানুষের ফিজিক্যাল এন্টিটি(পার্থিব সত্তা), যা পৃথিবীর দিকে অনুগামী এবং রূহ মেটাফিজিক্যাল এন্টিটি(আধ্যাত্মিক সত্তা) তাই এইটা আল্লাহর দিকে ধাবিত।

নফস কী?

আরবি ‘নফস’ শব্দের আক্ষরিক বাংলা অর্থ হইলো- সত্তা, আত্মা, প্রাণ, মন, অহংবোধ বা নিঃশ্বাস। ইংরাজিতে বলে Soul/Spirit. কিন্তু কুরআনে নফস শব্দটি ইংরেজি ‘Soul/Spirit’ শব্দের চেয়ে অনেক ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত। নফস হইলো মানুষের কামনা, আকাঙ্ক্ষা, ক্রোধ, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, আত্মরক্ষার প্রবৃত্তি ও অহংবোধ। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হইলো, কুরআন নফসকে স্বভাবগতভাবে মন্দ বইলা মনে করে না। কোনো কোনো প্রাচীন ধর্মীয় ও দার্শনিক ঐতিহ্যে এবং প্লেটোর কিছু দার্শনিক আলোচনায় শরীরকে আধ্যাত্মিক মুক্তি ও সত্য উপলব্ধির প্রতিবন্ধক হিসেবে দেখানো হইছে। আমরা প্রাচীন ভারতের জৈন ও হিন্দু ধর্মের কিছু অংশে এই রকমের অনুশাসন দেখতে পাই। কিন্তু ইসলাম শরীর বা প্রবৃত্তিকে পাপের উৎস মনে করে না, বরং নফসকে নৈতিকভাবে নিরপেক্ষ হিসাবে দেখে, যা উত্তম হইতে পারে আবার মন্দও হইতে পারে। যেমন, কুরআন বলে ‘শপথ প্রাণের এবং যিনি তাকে সুবিন্যস্ত করেছেন, অতঃপর তাকে তার পাপপ্রবণতা ও তাকওয়া(আল্লাহ সচেতনতা) উভয় দিকেই অনুপ্রাণিত করেছেন। সফল সে, যে তাকে পরিশুদ্ধ করেছে এবং ব্যর্থ সে, যে তাকে কলুষিত করেছে।’ (সুরা আশ-শামস ৯১:৭-১০) অর্থাৎ মানুষের ভেতরে শুভ ও অশুভ এই দুই প্রবণতাই আছে। এই আয়াত ইসলামী মনস্তত্ত্বের একটা মৌলিক নীতি প্রতিষ্ঠা করে- আমাদের জীবনের লক্ষ্য আত্মাকে মন্দ চিন্তা ও কাজ দিয়া কুলুষিত করা না, বরং তাকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পরিশুদ্ধ করা (তাযকিয়া)।

এইবার আমরা নফসের প্রকার নিয়ে দুই কথা বলবো। ইসলামী স্কলারেরা নফসের তিনটি অবস্থার কথা উল্লেখ করছেনঃ

১. নফসে আম্মারা বা আদেশদাতা নফসঃ এইটা সেই অবস্থা যেখানে মানুষ কু-প্রবৃত্তি ও কামনার দাস হয়ে পড়ে। মানুষের ক্ষুধা, তৃষ্ণা, যৌনাকাঙ্ক্ষা, রাগ, লোভ, হিংসা ও আরাম-আয়েশের ইচ্ছা নফসের মাধ্যমেই পরিচালিত হয়। এই অবস্থার বৈশিষ্ট্য হইলো- তাৎক্ষণিক তৃপ্তির আকাঙ্ক্ষা, অহংকার, ক্ষুধা, তৃষ্ণা, যৌনাকাঙ্ক্ষা, রাগ, লোভ, হিংসা, আরাম-আয়েশ ও দুনিয়ার মর্যাদা ও ক্ষমতার প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি। আধুনিক ভোগবাদী সমাজ অনেকাংশে এই নফসকেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিছে, যেখানে মানুষের সামনে অনন্ত ভোগ ও অবিরাম ইচ্ছাপূরণকে স্বাভাবিক জীবনধারা হিসাবে উপস্থাপন করা হয়। পশ্চিমা এনলাইটনমেন্টের (আলোকায়ন) মূল ভিত্তি হইলো উগ্র ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ- hyper-individualism. আলোকায়নের স্লোগানগুলির কথা- ‘আমার জীবন’, ‘আমার ইচ্ছা’ বা ‘আমার যা খুশি তাই করবো’ একটু মনে করেন। এখানে মানুষের নিজের ইচ্ছাই পরম (absolute)। তখন নাফ্সে আম্মারাই প্রধান পরিচালক হিসাবে কাজ করে যা মানুষকে ধীরে ধীরে তার প্রবৃত্তির অধীন কইরা তোলে। এই মাইন্ডসেটে তার সামনে শুভ অশুভ নির্বাচন করার সময় আসলে, তখন সে অশুভকেই বাইছা নেয়। কিন্তু কুরআনে ইউসুফ (আঃ) এর ঘটনা আমদেরকে স্মরণ করায়, মানুষের সামনে প্রলোভন আসতে পারে, ক্ষমতা ও সুযোগের অপব্যবহার করার পরিস্থিতি তৈরি হইতে পারে। কিন্তু সেই পরিস্থিতিতে মানুষ কোনটা বাইছা নেবে- সেটাই তার নফসের পরীক্ষা। ইউসুফ (আঃ) এর চরিত্র স্খলনের চেষ্টা করা হইছে, তাকে প্রলোভন দেখানো হইছে, কিন্তু তিনি দঢ় চিত্তে ও আল্লাহর দয়ায় সেই অবস্থা থেকে রক্ষা পাইছেন। তিনি বলেন ‘নিশ্চয়ই নফস মানুষকে মন্দ কাজের নির্দেশ দেয়, তবে আমার রব যাকে দয়া করেন সে ব্যতীত।’ (সুরা ইউসুফ ১২:৫৩)।

নফস মানুষকে তাৎক্ষণিক আনন্দ, ব্যক্তিগত স্বার্থ কিংবা ইচ্ছা পূরণের দিকে টানে। কিন্তু নিজের চরিত্র ঠিক রাখা মানে শুধু প্রলোভন থেকে দূরে থাকা না, বরং সুযোগ থাকা সত্ত্বেও নিজেকে ন্যায় ও আল্লাহর নির্দেশের আওতায় রাখা। এখানে নফসকে মানুষের সব আকাঙ্ক্ষা পূরণের দরোজা ভাবা ঠিক হবে না বরং আয়াতটি নফসের সেই প্রবণতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে যা মানুষকে অন্যায় বা অনৈতিক কাজের দিকে ঠেইলা দেয়। একই সঙ্গে এই আয়াতে আল্লাহর রহমতের কথাও বলা হইছে। অর্থাৎ নফস কন্ট্রোল কেবল নিজের শক্তি দিয়া করা যায় না, সাথে সাথে আল্লাহর সাহায্যও চাইতে হবে, কারণ মানুষ খুব দুর্বল।

২. নফসে লাওয়ামাহ বা আত্মসমালোচনাকারী নফসঃ আল্লাহ বলেন ‘আমি শপথ করছি কিয়ামত দিনের। আর শপথ করছি আত্মভর্ৎসনাকারী নফসের।'(সুরা আল-কিয়ামাহ, ৭৫:১–২)। এখানে নফসে লাওয়ামাহ বলতে এমন নফসকে বোঝানো হইছে, যা নিজের কাজের জন্য নিজেকে প্রশ্নের সম্মুখীন করে, ভুলের জন্য অনুতপ্ত হয় এবং নিজের আচরণের ভালো-মন্দ মূল্যায়ন করে। মানুষের ভেতরে যখন নৈতিকতাবোধ জাগ্রত হয়, তখন সে শুধু নিজের কাজের পক্ষে যুক্তি খোঁজে না, বরং নিজের ভুলের মুখোমুখি হওয়ার ক্ষমতাও অর্জন করে। উদাহরণ স্বরূপ- একজন মানুষ রাগের মাথায় অন্য একজনকে অপমান করার পর নিজের রাগকেই ন্যায্য মনে করতে পারে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর তার মনে হইতে পারে, ঐ কথাটা বলা তার ঠিক হয় নাই। তাই সে নিজের আচরণ নিয়ে অস্বস্তি বোধ করে , অনুতপ্ত হয় এবং যাকে কষ্ট দিছে তার কাছে ক্ষমা চাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এই যে মানুষ নিজের আচরণকে পুনর্বিবেচনা করলো, নিজের ভুলের দায় স্বীকার করলো এবং সংশোধনের ইচ্ছা করলো, এইটা আত্মসমালোচনামূলক নফসের একটা সহজ উদাহরণ।

আত্মসমালোচনাকারী নফসের ধারণাটি আরও ভালোভাবে বুঝতে সুরা আশ-শামসের দুটি আয়াতের দিকে আবারো চোখ ফেরানো যায়। আল্লাহ বলেনঃ ‘অতঃপর তিনি তাকে তার পাপ ও তাকওয়ার জ্ঞান দিয়েছেন।’ (সুরা আশ-শামস, ৯১:৮) এরপর বলা হয়েছে: ‘সফল হয়েছে সে, যে আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেছে। আর ব্যর্থ হয়েছে সে, যে তাকে কলুষিত করেছে।’ (সুরা আশ-শামস, ৯১:৯–১০) এই আয়াতগুলি মানুষের নৈতিক জীবনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আনে। প্রথমত, মানুষের মধ্যে পাপ ও তাকওয়ার পার্থক্য উপলব্ধি করার নৈতিক ক্ষমতা আছে। দ্বিতীয়ত, এই সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও আত্মশুদ্ধি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটে না, এর জন্য সচেতন প্রচেষ্টা প্রয়োজন। নফসে লাওয়ামাহকে এই প্রেক্ষাপটে বুঝলে দেখা যায়, মানুষ যখন নিজের ভুলকে ভুল হিসেবে চিনতে শেখে, তখন আত্মশুদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি হয়। সে নিজের আচরণকে ন্যায্য প্রমাণ করার পরিবর্তে তা সংশোধনের চেষ্টা করতে পারে।

এখানে আধ্যাত্মিকতার মানে মানুষ হিসাবে একদম ইন্নোসেন্ট থাকা নয়। বরং ভুলের পর নিজের দায় স্বীকার করা, আল্লাহর কাছে ফিরে আসা এবং সংশোধনের পথে অগ্রসর হওয়া। কুরআন মানুষকে নিজের পাপের জন্য অনন্ত হতাশায় নিমজ্জিত হইতে বলে না। আবার আল্লাহর ক্ষমা করাকে অন্যায় চালিয়ে যাওয়ার অজুহাত হিসেবেও গ্রহণ করে না। তাওবার সঙ্গে পরিবর্তনের সম্পর্ক রয়েছে। নফসে লাওয়ামাহর প্রকৃত তাৎপর্য এখানেই- মানুষ ভুল করতে পারে, সে নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে, আল্লাহর কাছে ফিরে আসতে পারে এবং নিজের আচরণ পরিবর্তনের চেষ্টা করতে পারে। আত্মসমালোচনা তখনই আধ্যাত্মিক বিকাশের অংশ হয়ে ওঠে, যখন তা অনুশোচনা থেকে তাওবা এবং তাওবা থেকে সংশোধিত জীবনের দিকে মানুষকে আগাইয়া নিয়া যায়।

৩. নফসে মুতমাইন্নাহ বা প্রশান্ত আত্মাঃ মুতমাইন্নাহ শব্দটি আরবি ইতমিনান ধাতু থেকে আসছে, যার অর্থ স্থিরতা, শান্ত হওয়া, সংশয়হীন হওয়া বা পুরোপুরি শান্তিতে থাকা। কোরাআনের পরিভাষায়, যে নফস বা আত্মা আল্লাহর স্মরণ, আনুগত্য ও বিশ্বাসের মাধ্যমে যাবতীয় সন্দেহ, অস্থিরতা ও কুপ্রবৃত্তির তাড়না থেকে মুক্ত হয়ে পরম শান্তি ও স্থৈর্য লাভ করছে, তাকেই নফসে মুতমাইন্নাহ বলে। এই আত্মার উল্লেখ আছে সুরা আল-ফজরের ২৭ থেকে ৩০ নম্বর আয়াতেঃ ‘হে প্রশান্ত আত্মা! তুমি তোমার প্রতিপালকের দিকে ফিরে আসো সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে। অতঃপর আমার (নেক) বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হও এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ করো।’ নফসে মুতমাইন্নাহ হইলো মানুষের আধ্যাত্মিক উন্নতির সর্বোচ্চ শিখর। এইটা এমন একটি অবস্থা যেখানে পৌঁছাইলে মানুষের মন থেকে দুনিয়া সংক্রান্ত সব ভয় ও দুশ্চিন্তা দূর হয়ে যায় এবং তার একমাত্র লক্ষ্য থাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। তাফসিরে ইবনে কাসির ও মা’আরিফুল কুরানের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, একজন মুমিনের মৃত্যুর সময় ফেরেশতারা এই আয়াত পড়ে তার আত্মাকে পরম যত্নে স্বাগত জানায়। এ ছাড়া কিয়ামতের দিন পুনরুত্থানের সময় ও জান্নাতে প্রবেশের মূহূর্তেও আল্লাহ এই আত্মাকে এইভাবে ডেকে সম্মানিত করবেন। রাদিয়াতান মারদিয়্যাহ- এই নফস আল্লাহর দেওয়া সব সিদ্ধান্ত, জীবন, জীবিকা ও নিয়তির ওপর নিজে সন্তুষ্ট থাকে (রাদিয়াহ), আর আল্লাহও তার প্রতি ও তার কাজের প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন (মারদিয়্যাহ)।

রূহ কী?

নফসকে মানুষের আচরণ ও অনুভূতির মাধ্যমে বোঝা সম্ভব হইলেও রূহ আধ্যাত্মিকতার সাথে সংশ্লিষ্ট, তাই এর স্বভাব, সত্তা বোঝা সহজ না। ইসলামী চিন্তাবিদরা সাধারণত রূহকে ব্যাখ্যা করেছেন আধ্যাত্মিকতার উৎস হিসাবে। রূহ মানুষের সেই সত্তা যা সত্যকে চিনতে সক্ষম ও আল্লাহর দিকে ধাবিত। কুরআনে রূহ শব্দটি জিবরাঈল আলাইহিস সালাম ও ওহী সম্পর্কেও ব্যবহার করা হইছে। তবে মানুষের ভেতরের ‘আত্মা’ বা ‘প্রাণ’ অর্থে রূহের আলোচনা যেভাবে আসছে, তা এরকম- রূহের প্রকৃত জ্ঞান কেবল আল্লাহর কাছেই, মানুষের জ্ঞান সীমিত, আর রূহের রহস্য অসীম। মক্কার কুরাইশরা যখন মুহাম্মদ(সাঃ)কে রূহ সম্পর্কে প্রশ্ন করছিল, তখন আল্লাহ সরাসরি সূরা আল-ইসরাতে এই আয়াতটি নাজিল করেনঃ ‘তারা তোমাকে রূহ সম্পর্কে প্রশ্ন করে। বলো- রূহ আমার প্রতিপালকের আদেশঘটিত (একটি বিষয়)। আর তোমাদেরকে সামান্য জ্ঞানই দান করা হয়েছে।'[সুরা আল-ইসরা ১৭:৮৫] ইমাম ইবনে কাসির এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, রূহ এমন একটি সত্তা যা মানুষ দেখতে বা পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারে না। এটি আল্লাহর ‘আমর’ বা বিশেষ আদেশের অন্তর্ভুক্ত, যার সূক্ষ্ম রহস্য আল্লাহ মানবজাতিকে জানান নাই।

আল্লাহ তাআলা প্রথম মানব হযরত আদম (আঃ)-কে কাদা মাটি দিয়া তৈরি করার পর তার ভেতরে রূহ ফুৎকার করছিলেন। এর মাধ্যমেই মানুষ এক অনন্য মর্যাদার অধিকারী হয়। কুরআনে আল্লাহ বলেনঃ ‘অতঃপর যখন আমি তাকে সুষম করব এবং তার মধ্যে আমার রূহ থেকে ফুঁকে দেব, তখন তোমরা তার প্রতি সেজদাবনত হয়ো।'[সূরা আল-হিজর ১৫:২৯ ও সুরা ছোয়াদ ৩৮:৭২] এখানে ‘আমার রূহ’ বলার অর্থ- এই রূহ আল্লাহর অংশ নয় বরং এইটা একটি সম্মানসূচক সংযুক্তি। অর্থাৎ, এই রূহটি আল্লাহর অত্যন্ত সম্মানিত একটি সৃষ্টি, যা মানুষকে অন্য সব সৃষ্টি থেকে আলাদা ও শ্রেষ্ঠ করছে।

নফস ও রূহঃ দুই বিপরীতমুখী সত্তা

ইসলামী স্কলারেরা মানুষের জীবনকে নফস ও রূহের মধ্যে একটা টানাপোড়েন হিসেবে দেখেন। নফস মানুষকে হুকুম করে- যা সামনে পাও তাই নিয়ে নাও, এনজয় করো, শক্তি বিস্তার করো, নিজেকে জাহির করো ইত্যাদি। অন্যদিকে রূহ বলে- আল্লাহকে ভয় ও স্মরণ করো, দান খয়রাত করো, মানুষের উপকার করো, নিজের দোষ ত্রুটি আগে দেখো, সবুর করো। নফস মানুষকে তাৎক্ষণিক আনন্দ ও ভোগের দিকে টানে কিন্তু রূহ মানুষকে ইটারনাল সুখের দিকে টানে। যতদিন জীবন আছে ততদিন এই দ্বন্দ্ব মানুষের ভেতর চলতে থাকে, এই সংগ্রামই মানুষের মোরালিটির ভিত্তি। মানুষ ফেরেশতার মতো না, যারা অবাধ্য হইতে পারে না, আবার পশুর মতোও না যাদের নৈতিক দায়বদ্ধতা নাই। মানুষকে এই দুই অবস্থার টানাপোড়নের ভেতর নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা লাগে। ইসলামী আধ্যাত্মিকতায় হৃদয় বা কলব হইলো সেই ক্ষেত্র যেখানে নফস ও রূহের এই সংগ্রাম অব্যাহত থাকে। রাসূলুল্লাহ(স:)বলছেন ‘নিশ্চয়ই মানুষের শরীরে একটি মাংসপিণ্ড রয়েছে। তা যদি সঠিক থাকে, তবে পুরো শরীর সঠিক থাকে, আর তা যদি নষ্ট হয়ে যায়, তবে পুরো শরীর নষ্ট হয়ে যায়। জেনে রাখো, সেটিই হলো কলব(হৃদয়)।’ হৃদয় নফসের প্রলোভন ও রূহের আলোকপ্রাপ্তির মধ্যে মীমাংসাকারী হিসাবে কাজ করে। যখন হৃদয় প্রবৃত্তির অধীন হয়ে পড়ে, তখন তা আধ্যাত্মিকভাবে অন্ধ হয়ে যায়। আর যখন তা আল্লাহর স্মরণ দ্বারা আলোকিত হয়, তখন শান্তি পায় এবং সত্য গ্রহণের ক্ষমতা অর্জন করে।

তাযকিয়াঃ আত্মার শিক্ষা ও পরিশুদ্ধি

ইসলামের শিক্ষা হইতেছে নফসকে(আত্মা) ধ্বংস করা নয়, বরং তাকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচর্চার মাধ্যমে পরিশুদ্ধ করা। নামাজ মুসলমানের চব্বিশ ঘন্টা সময়কে উদ্দেশ্যমুখী(গোল ওরিয়েন্টেড) রাখে, তখন জীবন সুবিন্যস্ত হয়। রমজান মাসের ও নফল রোজা ক্ষুধা ও প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে, যাকাত অতিরিক্ত সম্পদ জমা করার প্রতি আসক্তি কমায়। হজ মানুষকে অহংকার ও সামাজিক মর্যাদার মোহ থেকে মুক্ত হইতে সাহায্য করে। হজের সময় বিত্তশালী মানুষ কিংবা বিত্তহীন মানুষ- সবাইকে একই সুতি কাপড়ের দুইটা সেলাইবিহীন সাদা চাদর (ইহরাম) পরতে হয়। সেখানে দামী কাপড়, রাজকীয় পোশাক বা ব্র্যান্ডের কোনো স্থান নাই। এই পোশাকের সমতা মানুষকে মনে করাইয়া দেয় যে, আল্লাহর কাছে সবাই সমান। এইভাবে প্রতিদিনের ইবাদতের মাধ্যমে নফস ধীরে ধীরে আল্লাহর নির্দেশনা ও রূহের উচ্চতর আকাঙ্ক্ষার অধীন হয়ে, নরম হয়ে আসে। এই কারণেই কুরআন বারবার মুক্তি ও সফলতাকে সম্পদ ও বুদ্ধিবৃত্তিক অর্জনের সঙ্গে না বরং আত্মশুদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করে- ‘নিশ্চয়ই সফল হয়েছে সে, যে তার নফসকে পরিশুদ্ধ করেছে।’ (সূরা আশ-শামস ৯১:৯)

আধুনিকতা, নফস ও রূহ

আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ মানুষকে এমন এক স্বয়ংসম্পূর্ণ সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে, যার কামনা বাসনা(নফস বা প্রবৃত্তি) যেন তার সত্যিকারের পরিচয়। কিন্তু কুরআনের মানবতত্ত্ব এই দর্শন থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। মানুষ নিজেই নিজের উৎস না, আল্লাহই সবকিছুর উৎস ও মালিক। সেই অর্থে স্বাধীনতা মানে প্রতিটি আকাঙ্ক্ষার অনুসরণ করা না বরং কোরানের গাইডলাইনস অনুসরণ করা। কোরান আমাদেরকে এই বিষয়ে সতর্ক করে ‘তুমি কি সেই ব্যক্তিকে দেখেছ, যে নিজের প্রবৃত্তিকেই নিজের প্রভু বানিয়ে নিয়েছে?’ (সূরা আল-জাসিয়া ৪৫:২৩) কী মারাত্মক কথা! নিয়ন্ত্রণহীন নফস নিজেই এক ধরনের মূর্তিতে পরিণত হয়ে পড়ে, যার হুকুম পালনের মাধ্যমে মানুষ তাকেই ইবাদত করে। তাই মানুষের সত্যিকার মানবিক পরিপূর্ণতা নিহিত রইছে নফসের সঠিক ব্যবহারে। মানুষ যখন আল্লাহর নির্দেশাবলী পালন করার মাধ্যমে নফসের নিয়ন্ত্রণ ও পরিচর্যা করবে, তখন তার আত্মা সমস্ত পার্থিব অপ্রাপ্তি, অস্থিরতা ও কলুষতা অতিক্রম করে আল্লাহর কাছে সমর্পিত হওয়ার সন্তোষ ও প্রশান্তি লাভ করবে।


তথ্যসূত্রঃ

১. আল-কুরআন: ১২:৫৩, ১৫:২৯, ১৭:৮৫, ২৩:১২-১৪, ৩৮:৭২, ৪৫:২৩, ৭৫:২, ৮৯:২৭-৩০, ৯১:৭-১০

২. সহিহ বুখারি

৩. সহিহ মুসলিম

৪. ইমাম গাজ্জালী, ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন

৫. ইবনুল কাইয়্যিম আল-জাওযিয়্যাহ, কিতাবুর রূহ এবং মাদারিজুস সালিকীন

৬. ফখরুদ্দীন আর-রাযী, তাফসীরুল কাবীর

Share URL copied

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট

Related Articles

হাবিল-কাবিল: ক্ষমতা, ঈর্ষা ও মানুষের পতন

ইসলামের ইতিহাস ও কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী (আল-মায়িদাহ, আয়াত ২৭-৩১), হাবিল ও কাবিলের...

সূরা ইখলাস: অস্তিত্বের অভিমুখ ও নির্ভরশীলতার দর্শন

সূরা ইখলাসকে সাধারণত আল্লাহর একত্বের ঘোষণা হিসেবে পাঠ করা হয়। কিন্তু এর...

সূরাহ ফাতিহা: অস্তিত্বের অভিমুখ ও সিস্টেমের পুনঃসংগঠন

যদি সূরাহ ইখলাস আমাদের শেখায়, এই বিশ্বজগতের একমাত্র পরম ও স্বাধীন সত্তা...