(আশির ও নব্বইয়ের দশকে আমরা যখন লেখালেখি শুরু করি তখন ফ্রানৎস কাফকা আর আলবেয়ার কামু- এই দুই অস্তিত্ববাদী ঔপন্যাসিক আমাদের কাছে বিশেষভাবে পরিচিত ছিলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরাজি ও বাংলা বিভাগ, ঢাকার সাহিত্য আড্ডা, কিংবা বামপন্থী বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে Metamorphosis ও The Outsider প্রায় ক্লাসিকের মর্যাদা পাইছিলো। কিন্তু তখন(আমার মনে হয় এখনো) একটা প্রশ্ন খুব কমই করা হইছে- আমরা কাফকা-কামুকে আসলে কীভাবে পড়বো? কেবল আধুনিকতার নায়ক হিসাবে, নাকি খোদাহীন মানুষের গভীর সংকটের লেখক হিসাবে? এইসব প্রশ্ন আজো আমাকে তাড়া করে। এই দুই বিখ্যাত বইয়ের পাঠ-অভিজ্ঞতা নিচে একটু বড় কইরা লিখলাম)।
কাফকার Metamorphosis আর আলবেয়ার কামুর The Outsider এই দুইটা বই শুধু আধুনিক মানুষের একাকিত্ব বা বিচ্ছিন্নতার গল্প না, এই দুই বইয়ের গভীরে আছে আরও বড় একটা প্রশ্নঃ খোদাহীন, অর্থহীন একটা পৃথিবীতে মানুষ আসলে কোন আশায় বাঁচবে?
কাফকার Metamorphosis-এর সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটা হইলো – গ্রেগর সামসা জানেই না তার অপরাধ কী। কেউ তাকে অভিযুক্ত করে না, কোনো আদালত বসে না, কোনো বিচারক রায় পড়ে না। তবু সে এমনভাবে শাস্তি ভোগ করে, যেন সে জন্মগতভাবেই দোষী। এই অজ্ঞাত অপরাধবোধই কাফকার মানুষের অস্তিত্বকে সবচেয়ে নির্মমভাবে উন্মোচন করে। পোকায় রূপান্তরিত হওয়ার পরও গ্রেগরের প্রথম উদ্বেগ নিজের শরীর নিয়া না, তার চিন্তা অফিস, ট্রেন আর বসকে নিয়া। সে ভাবে- আজ কাজে যাইতে না পারলে ম্যানেজার কী বলবে, পরিবারের ঋণ কীভাবে শোধ হবে। অর্থাৎ তার দেহ সম্পূর্ণ অপরিচিত হয়ে গেছে, কিন্তু তার ভেতরের দায়বদ্ধ কর্মচারী একই আছে। শরীর বদলায়, অথচ সামাজিক কর্তব্যের শিকল বদলায় না।
আধুনিক মানুষ অনেক সময় নিজের মানবিক সত্তা দিয়া না, বরং নিজের কাজ, উৎপাদন আর উপযোগিতা দিয়া নিজের মূল্য নির্ধারণ করে। গ্রেগর যখন আর কাজ করতে পারে না, তখন সে শুধু সমাজের কাছেই না, নিজের কাছেও অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। তার ট্র্যাজেডি পোকা হওয়া না, তার ট্র্যাজেডি হইলো এমন এক মানুষ হওয়া, যে শাস্তির কারণ জানে না, কিন্তু তবুও সারাজীবন অপরাধীর মতো বাঁচে।
কাফকা তাই প্রশ্ন করেন- আমি কি সত্যিই স্বাধীন, নাকি অদৃশ্য কোনো ক্ষমতার কাছে আমি এমনিতেই চিরঅভিযুক্ত? এই জায়গাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিকতা যখন খোদাকে জ্ঞান, নৈতিকতা ও সামাজিক জীবনের কেন্দ্র থেইকা সরাইয়া দেয়, তখন খোদার জায়গাটা আসলে খালি থাকে না। সেই জায়গা দখল কইরা নেয় নানা ধরনের পার্থিব কর্তৃত্ব, রাষ্ট্র, আইন, অফিস, পরিবার, বাজার, সামাজিক প্রতিষ্ঠান, এমনকি মানুষের নিজের ভেতরের অপরাধবোধও। ফলে মানুষ একদিকে খোদার চূড়ান্ত বিচারের ধারণা থেইকা দূরে সইরা যায়, কিন্তু অন্যদিকে বিচার, অপরাধ, দায়, শাস্তি, ন্যায় ও ক্ষমার প্রশ্ন থেইকা আবার মুক্তও হইতে পারে না! কাফকার লেখায় এই সংকটটাই খুব তীব্রভাবে ধরা পড়ে। তাঁর জগতে বিচার আছে, কিন্তু বিচারকের উপস্থিতি অস্পষ্ট। অপরাধ আছে, কিন্তু অপরাধটা কী- তা স্পষ্ট না। শাস্তি আছে, কিন্তু শাস্তির যৌক্তিক কারণ জানা যায় না। মানুষ একটা অদৃশ্য ব্যবস্থার সামনে দাঁড়ায়, কিন্তু সেই ব্যবস্থার চূড়ান্ত অর্থ তার কাছে ধরা দেয় না। ফলে তার অপরাধবোধ বাস্তব, ভয় বাস্তব, শাস্তিও বাস্তব, কিন্তু ন্যায়ের চূড়ান্ত ভিত্তিটা অদৃশ্য।
এই জায়গা থেইকা কাফকাকে শুধু আমলাতন্ত্র বা বিচ্ছিন্নতার লেখক হিসেবে পড়লে তার গভীরতা ধরা পড়ে না। তার সাহিত্যকে পড়া যাইতে পারে- খোদাহীন আধুনিক মানুষের এক অস্তিত্বগত সংকট হিসেবে। মানুষ খোদাকে সরাইয়া দিছে, কিন্তু জীবনের চূড়ান্ত অর্থ জানার প্রয়োজনটা সরাইতে পারে নাই। সে এখনো জানতে চায়-সত্য কী, ন্যায় কী, আমি কেন দোষী, মুক্তি কোথায়, আর আমার অস্তিত্বের শেষ অর্থ কী? সমস্যা হইলো, যখন এই প্রশ্নগুলির কোনো চূড়ান্ত মেটাফিজিক্যাল ভিত্তি থাকে না, তখন মানুষ নিজেরই বানানো কর্তৃত্বের জালে আটকা পইড়া যায়। খোদার জায়গায় তখন আইন আসে, আইনের জায়গায় প্রতিষ্ঠান আসে, প্রতিষ্ঠানের জায়গায় প্রশাসন আসে। কিন্তু মানুষের মৌলিক অস্তিত্বগত প্রশ্নগুলার সমাধান হয় না। বরং কর্তৃত্ব থাকে, কিন্তু তার চূড়ান্ত বৈধতার উৎস হারায়া যায়। এই অর্থে কাফকার অন্ধকার শুধু ব্যক্তিগত হতাশার অন্ধকার না, এটা এমন এক সভ্যতার অন্ধকার, যেখানে মানুষ বিচার চায়, কিন্তু বিচার-এর শেষ ভিত্তি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় না। মানুষ মুক্তি চায়, কিন্তু মুক্তির অর্থ জানে না, আবার ন্যায়ের আশা করে, কিন্তু ন্যায়ের চূড়ান্ত উৎসের খবর লাপাত্তা। আর এখানেই কাফকার সাহিত্য আধুনিক মানুষের গভীর সংকটের এক অসাধারণ প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।
গ্রেগর সামসার ট্র্যাজেডি শুধু সে পোকা হয়ে গেছে এইটা না। তার আসল ট্র্যাজেডি হইলো সে নিজের অস্তিত্বের মূল্য নিজে নির্ধারণ করতে পারে না। যতদিন সে টাকা উপার্জন করে, ততদিন সে পরিবারের সদস্য। যেদিন সে আর উপার্জন করতে পারে না, সেদিন সে বোঝা। এখানে কাফকা আধুনিক অর্থনৈতিক মানুষের ভয়ংকর একটা ছবি আঁকেন। মানুষ নিজের জন্য বাঁচে না, সে একটা যান্ত্রিক সিস্টেমের জন্য বাঁচে। তার শ্রমই তার পরিচয়, তার উৎপাদন ক্ষমতাই তার মানবিক মূল্য। তাই পোকায় রূপান্তর আসলে একটা প্রতীকী প্রকাশ। সামসা শারীরিকভাবে পোকা হয় পরে, মানুষের চোখে সে অপর ও অচেনা হয়ে যায় এর আগেই। এইখানে খোদাহীনতার একটা বড় সমস্যা সামনে আসে। যদি মানুষের মূল্য তার স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্কের কারণে নির্ধারিত না হয়, তাহলে মানুষকে মূল্য দেবে কে? সমাজ? বাজার? রাষ্ট্র? পরিবার? নিজের সাফল্য? না দিবে না।
খোদা নাই, তারপর কী হবে ? আলবেয়ার কামু এই প্রশ্নটাকে আরেক ধাপ সামনে নিয়া যান। The Outsider-এর নায়ক মুরসো (Meursault) এমন একটা পৃথিবীতে বাস করে যেখানে জীবনের কোনো চূড়ান্ত অর্থ তার হাতে দেওয়া নাই। মায়ের মৃত্যু, প্রেম, চাকরি, হত্যা, বিচার- কোনোটার মধ্যেই সে কোনো মহাজাগতিক অর্থ খুঁজে পায় না। সে সমাজের তৈরি আবেগের ভাষায় অভিনয়ও করে না। মায়ের মৃত্যুতে সে কাঁদল না- এইটাই সমাজের কাছে তার সবচেয়ে বড় অপরাধগুলির একটা হয়ে দাঁড়ায়। পরে তার হত্যার বিচারও যেন শুধু হত্যার বিচার থাকে না। তার চরিত্র, তার অনুভূতি, তার সামাজিক আচরণ সবকিছুর বিচার হয়। এখানে কামুর একটা ভয়ংকর প্রশ্ন আছেঃ খোদার জায়গায় যদি সমাজ নিজেই নৈতিক বিচারকের ভূমিকা নেয়, তাহলে সমাজের নৈতিকতা কি সত্যিই স্বাধীন? মুরসো সেই নিয়ম মানতে চায় না, সে মিথ্যা অনুশোচনা দেখায় না। সে এমন একটা বিশ্বাসের অভিনয় করে না, যেটা তার ভিতরে নাই। এই কারণে সে outsider। সে সমাজের বাইরে না, কিন্তু সমাজের তৈরি অর্থের ভিতরে সে বাসও করে না।
শূন্যতার মুখোমুখি দাঁড়ানো- কামুর উপন্যাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। কামুর absurd(উদ্ভট) ধারণা আসলে মানুষের জীবনের অর্থের আকাঙ্ক্ষা আর পৃথিবীর নীরবতার সংঘর্ষ। মানুষ জিজ্ঞাসা করে- আমি কেন বাঁচি? মৃত্যু কেন? ন্যায় কী? জীবনের উদ্দেশ্য কী? খোদা কোথায়? কিন্তু পৃথিবী কোনো নিশ্চিত উত্তর দেয় না। এই নীরবতার মধ্যেই absurd-এর জন্ম নেয়। মজার বিষয় হইলো কামু এখান থেকে আত্মহত্যা বা অন্ধ বিশ্বাস- কোনোটাকেই সহজ সমাধান হিসেবে গ্রহণ করেন না। বরং তিনি বলেন, মানুষকে এই absurd অবস্থার মুখোমুখি একদিন দাঁড়াইতে হইবো। এই জায়গায় মুরসোর শেষ অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়াইয়া সে পৃথিবীর উদাসীনতা উপলব্ধি করে। কিন্তু সেই উপলব্ধি তাকে নিছক ধ্বংসের দিকে নিয়া যায় না, বরং তাকে একটা অদ্ভুত স্বচ্ছতার দিকে নিয়া যায়। অর্থাৎ খোদার নিশ্চয়তা নাই, তাই মানুষকে নিজের অস্তিত্বের সত্যের সামনে দাঁড়াইতে হবে- কামুর কাছে এইটাই বিদ্রোহ।
কিন্তু এখানে একটা গভীর সমস্যা আছে। যদি সত্যিই জীবনের কোনো চূড়ান্ত অর্থ না থাকে, তাইলে মানুষের নৈতিকতার ভিত্তি কী? কেন আমি অন্যায় করব না? কেন আমি দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ামু ? কেন মানুষের জীবন মূল্যবান? কেন স্বাধীনতা ভালো? কেন অত্যাচার খারাপ? কামু মানবিকতা, মর্যাদা, সংহতি আর বিদ্রোহের পক্ষে দাঁড়ান। কিন্তু প্রশ্নটা থাইকা যায়- এই মূল্যবোধগুলোর চূড়ান্ত ভিত্তি কোথায়, কোথায় থেইকা সবকিছু শুরু হইছে? যদি খোদাকে বাদ দিয়া মানুষকে নৈতিক হইতে বলা যায়, তখন নৈতিকতার শেষ ভিত্তিটা কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর কামুর কাছে পাওয়া যায় না।
ইসলামী মানবতত্ত্বের সঙ্গে কামু ও কাফকার অস্তিত্বচিন্তার মৌলিক পার্থক্য শুরু হয় মানুষের অস্তিত্বের উৎস ও অর্থ কোথায়- এই প্রশ্নে। অস্তিত্ববাদী দৃষ্টিতে মানুষ এমন এক জগতে নিক্ষিপ্ত, যেখানে কোনো পূর্বনির্ধারিত চূড়ান্ত অর্থ তার হাতে নাই। তাই তাকে নিজের অস্তিত্বের অর্থ নিজেকেই নির্মাণ করতে হয়। এই অবস্থায় স্বাধীনতা যেমন বাড়ে, তেমনি অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ ও অস্তিত্বগত একাকিত্বও গভীর হয়। ইসলামী দৃষ্টিতে মানুষ এই অর্থে ‘নিক্ষিপ্ত’ কোনো পরিত্যক্ত সত্তা না। মানুষ সৃষ্ট, আর সৃষ্টি হওয়ার অর্থই হলো তার অস্তিত্বের একটা ontological(সত্তা-সম্পর্কিত) ভিত্তি আছে। সে নিজে নিজের চূড়ান্ত উৎস না, তার অস্তিত্ব তার নিজের বানানোও না। কুরআনিক মানবতত্ত্বে তাই মানুষকে তার নিজের ইচ্ছা, ভোগ, সাফল্য কিংবা সামাজিক পরিচয়ের মধ্যে দিয়ে পুরোপুরি সংজ্ঞায়িত করা যায় না। মানুষের পরিচয় তার স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যেই সম্পূর্ণতা পায়। এই কারণে ইসলামে মানুষের জীবনের অর্থ নির্মাণ করার বিষয় না, বরং উন্মোচন বা আবিষ্কার করার বিষয়। মানুষ অর্থহীনতার মধ্যে বইসা নিজের জন্য একটা অর্থ বানায় না, বরং সে জানতে চেষ্টা করে কেন তাকে সৃষ্টি করা হইছে, তার দায়িত্ব কী, তার স্বাধীনতার সীমা কোথায়, অন্য মানুষের প্রতি তার দায় কী, এবং শেষ পর্যন্ত তাকে কোথায় ফিরা যাইতে হবে।
এই জায়গায় ইসলামী মানবতত্ত্বের চারটা ধারণা একসাথে কাজ করেঃ উৎস, মর্যাদা, দায়িত্ব ও প্রত্যাবর্তন। ইসলামে মানুষকে মহাবিশ্বের আকস্মিক উৎপাদন হিসেবে দেখা হয় না। তার জন্ম এক স্রষ্টার জ্ঞান, ইচ্ছা ও পরিকল্পনার অংশ। তার মর্যাদা মানুষের নিজস্ব অস্তিত্বগত মূল্য ও আমানতের মধ্যে, তার দায়িত্ব নৈতিক ও সামাজিক জবাবদিহিতার মধ্যে, আর তার প্রত্যাবর্তন চূড়ান্ত বিচারের দিকে মানে আল্লাহর কাছে। ফলে মানুষের জীবন এখানে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা না, একটা বৃহত্তর অর্থপূর্ণ কাঠামোর অংশ। এই কাঠামোর ফলে ইসলাম মানুষের স্বাধীনতাও অস্বীকার করে না, বরং স্বাধীনতাকে দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত করে। মানুষ পছন্দ করতে পারে, ভুল করতে পারে, বিদ্রোহ করতে পারে, কিন্তু তার পছন্দ সম্পূর্ণ অর্থহীন কোনো শূন্যতার মধ্যে ঘটে না। তার কর্মের নৈতিক ও পরিণামগত অর্থ আছে।
তাই কাফকার মানুষ যেখানে অদৃশ্য বিচারব্যবস্থার সামনে দাঁড়ায়, আর কামুর মানুষ যেখানে নীরব মহাবিশ্বের সামনে নিজের অর্থ খুঁজে বেড়ায়, ইসলামের মানুষ সেখানে এক অর্থপূর্ণ মহাবিশ্বের ভিতরে নিজের অবস্থান, দায়িত্ব ও গন্তব্য আবিষ্কার করে। এখানেই মৌলিক পার্থক্যটা। অস্তিত্ববাদের মানুষ অর্থের শূন্যতার মধ্যে অর্থ নির্মাণ করতে চায়, ইসলামের মানুষ সৃষ্টির ভেতরে আল্লাহ প্রদত্ত অর্থকে চিনতে, গ্রহণ করতে এবং তার অনুযায়ী জীবনকে পুনর্বিন্যস্ত করতে চায়। আর সম্ভবত এই জায়গাতেই আধুনিক মানুষের গভীর সংকটের একটা ভিন্ন পাঠ সম্ভব হয়। সমস্যা শুধু এই না যে মানুষ অর্থ হারাইছে, সমস্যা এই যে- সে যে নিজের বাইরে, নিজের ঊর্ধ্বে এবং নিজের চূড়ান্ত উৎসের সঙ্গে যুক্ত এই সত্যটাই সে ভুইলা গেছে। আর এখানেই ইসলামী মানবতত্ত্বের সঙ্গে তার একটা মৌলিক পার্থক্য তৈরি হয়। ইসলামের কাছে মানুষ অর্থহীন মহাবিশ্বে নিক্ষিপ্ত কোনো একাকী প্রাণী না। মানুষকে সৃষ্টি করা হইছে, তার একটা উৎস আছে, একটা মর্যাদা আছে, একটা দায়িত্ব আছে, আর একটা প্রত্যাবর্তনও আছে। অর্থাৎ মানুষের অস্তিত্বের অর্থ মানুষ নিজে বানায় না, মানুষের কাজ সেই অর্থকে আবিষ্কার করা, চিনতে পারা এবং নিজের জীবন দিয়ে গ্রহণ করা। এখানেই ইসলামী মানবতত্ত্ব অস্তিত্ববাদ থেকে মৌলিকভাবে ভিন্ন।
প্রশ্ন-আজকের মানুষ কোনটা? গ্রেগর না মুরসো? আমার মনে হয় আজকের মানুষ একই সঙ্গে গ্রেগর আর মুরসো। সে গ্রেগরের মতো একটা জটিল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে আটকা পইড়া আছে। চাকরি, টাকা, ঋণ, সামাজিক মর্যাদা, সাফল্য- এইসবের ভিতর নিজের অস্তিত্বের মূল্য খুঁজে। আবার সে মুরসোর মতো জীবনের অর্থের সংকটেও ভোগে। সবকিছু আছে, কিন্তু ‘কেন’ প্রশ্নটার উত্তর নাই। তাই আধুনিক মানুষ খুব অদ্ভুত একটা অবস্থায় আছে- সে খোদাকে হারাইছে, কিন্তু খোদার জায়গাটা খালি রাখতে পারে নাই। সেই জায়গায় বসাইছে টাকা, রাষ্ট্র, জাতি, ভাষা, মতাদর্শ, বাজার, সাফল্য, যৌনতা, পরিচয়, প্রযুক্তি এমন অসংখ্য নতুন দেবতা।
কাফকার মানুষ নিজের মানবিক মর্যাদা হারানো মানুষ- যে ধীরে ধীরে উপযোগিতার যন্ত্রে পরিণত হইছে। আবার কামুর মানুষ অর্থহীন মহাবিশ্বের সামনে দাঁড়ায়া থাকা মানুষ, যে সত্য চায়, কিন্তু কোনো চূড়ান্ত উত্তর খুঁজে পায় না। অপরদিকে কুরআনের মানুষ সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সত্তাঃ সে নিজের উৎস (আল্লাহ), দায়িত্ব (খিলাফাহ ও আমানত) এবং প্রত্যাবর্তন (ইন্না ইলাইহি রাজিউন)- এই তিনটি সত্য স্মরণে রাখা মানুষ।
মানুষ শুধু পেটের জন্য বাঁচে না, শুধু সামাজিক স্বীকৃতির জন্যও না, এমনকি নিজের বানানো ব্যক্তিগত জীবনের অর্থের জন্যও না। মানুষের অস্তিত্বের গভীরে একটা অভিমুখ আছে, সে জানতে চায়, আমি কে? কেন আসছি? কোথায় ফিরব? এই প্রশ্নগুলির উত্তর ছাড়া স্বাধীনতাও অস্থির হয়ে যায়, প্রাচুর্যও শূন্য লাগে। অভিমুখ হারানো মানুষ তাই নানা রূপ নেয়। সে কখনো গ্রেগর সামসার মতো নিজের পরিবারেই অচেনা হয়ে যায়, কখনো মুরসোর মতো সমাজের কাছে ‘অপর’ হয়ে দাঁড়ায়। আবার কখনো চারপাশে সাফল্য, প্রযুক্তি আর ভোগের প্রাচুর্য নিয়াও নিঃশব্দে অনুভব করে, সবকিছু আছে, কিন্তু আমার থাকার কারণটা কী- আমি তা জানি না ? তাই বলা যায় আধুনিক মানুষের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি দারিদ্র্য না, নিঃসঙ্গতাও না, বরং উদ্দেশ্যহীনতা। আর কুরআনের সবচেয়ে বড় আহ্বানও ঠিক এখানেই- মানুষকে তার হারানো অভিমুখে ফিরাইয়া আনা, যাতে সে আবার নিজের রব, নিজের দায়িত্ব এবং নিজের চূড়ান্ত গন্তব্যকে চিনতে পারে।
রেফারেন্স:
- Kafka, Franz. The Metamorphosis. Trans. Stanley Corngold. Bantam Classics, 2004.
- Camus, Albert. The Outsider (The Stranger). Trans. Matthew Ward. Vintage, 1989.
- Camus, Albert. The Myth of Sisyphus. Vintage International, 1991.
- Macquarrie, John. Existentialism. Penguin, 1972.
- The Qur’an — 2:30–39; 23:115; 51:56; 59:19; 75:36.
Leave a comment