Current date August 23, 2026
মানুষ, দর্শন, ইতিহাস, সভ্যতা

ম্যাকবেথ: শেক্সপিয়ারের ট্র্যাজেডিতে ফেইট ও ফ্রি-উইলের দার্শনিক পাঠ

মধ্য আশির দশকে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজি সাহিত্যে পড়ার সময়, আমাদেরকে রোমান্টিক কবি- জন কিটস, শেলি, বায়রন, ও আধুনিক এলিয়ট, ইয়েটস, ডিলান টমাস, ফ্রস্ট ইত্যাদি পড়ার সাথে সাথে জিনিয়াস শেক্সপিয়ারও পড়তে হইত। শেক্সপিয়ারের চারটা ট্রাজেডি আমাদের সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত ছিল- হ্যামলেট, ওথেলো, কিং লিয়ার ও ম্যাকবেথ। সত্য যে তখন শুধু পড়ার জন্য পড়তাম, পরীক্ষা পাশের জন্য অথবা […]

URL copied
Share URL copied

মধ্য আশির দশকে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজি সাহিত্যে পড়ার সময়, আমাদেরকে রোমান্টিক কবি- জন কিটস, শেলি, বায়রন, ও আধুনিক এলিয়ট, ইয়েটস, ডিলান টমাস, ফ্রস্ট ইত্যাদি পড়ার সাথে সাথে জিনিয়াস শেক্সপিয়ারও পড়তে হইত। শেক্সপিয়ারের চারটা ট্রাজেডি আমাদের সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত ছিল- হ্যামলেট, ওথেলো, কিং লিয়ার ও ম্যাকবেথ। সত্য যে তখন শুধু পড়ার জন্য পড়তাম, পরীক্ষা পাশের জন্য অথবা চাকরি পাওয়ার জন্য পড়তাম। প্রায় না বুইঝা, না ভালোবাইসা পড়তাম। অবশ্য মাঝে মাঝে যে শেক্সপিয়ারের লিঙ্গুয়িস্টিক ও পোয়েটিক জিনিয়াস দেইখা অবাক হইতাম না যে- এমন না। আলবৎ হইতাম। তার প্রতিভা বিস্ময়কর মানি। কিন্তু শেক্সপিয়ার তো ইংরেজ, ওরিয়েন্টালিস্ট কবি ও নাট্যকার। তার ওথেলো ও টেম্পেস্টকে হয়ত এদিকে দিয়া পাঠ করা যায়। এডওয়ার্ড সাঈদ তেমনি ইঙ্গিত দিছে তার বিখ্যাত বই ওরিয়েণ্টালিজমে। অথবা উত্তর-আধুনিক ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোর পাওয়ার ও নলেজের ঐতিহাসিক নাড়ি ধইরা তার নাটকগুলিরে পাঠ করা যায়।

 

তার নাটকগুলি এখন যদি পড়ি, মনে হয় নতুন ভাবে পড়ি। জানা, বোঝা ও আনন্দের জন্য পড়ি। প্রথমেই যেই এলিমেন্টের কথা মনে আসে সেইটা হইল, শেক্সপিয়ারের চরিত্রগুলি যত না যুগের, তার চেয়ে ভাষার তৈরি। তার ভাষাই চরিত্র। তাই তার ঘন, লেয়ার ভিত্তিক দার্শনিক, পোয়েটিক ভাষার ভেতরে গিয়া চরিত্রগুলির মেন্টালিটি, আশা, ইচ্ছা, ক্রোধ, হিংসা, জিঘাংসা, প্রেম, ভালোবাসা, প্রতিশোধ ও পতন ইত্যাদি মানবিক ও দানবিক চারিত্রিক এলিমেন্টগুলির দেখা পাওয়া যায়। এই সেইদিন ম্যাকবেথ হাতে নিয়ে পড়তে পড়তে ভাবছিলাম আসলে শেক্সপিয়ার কী বলতে চায় এই নাটকে? দেখলাম শেক্সপিয়ার তখনকার এলিজাবিথিয় যুগের শিভালরি ও রক্ষণশীলতার সাথে সাথে নতুন পৃথিবী আবিস্কারের দূরাগত ধ্বনি, সামন্ত যুগের মালিক-কৃষকের টানাপোড়েন ও ধীরে ধীরে জমে ওঠা ব্যক্তি স্বাধীনতার স্বাদে- মানুষের ব্যক্তিগত চয়েসের দিকে যাত্রার দিকে তিনি ইঙ্গিত দিতে চাইছেন। লিটেরেচার সমাজ ধইরাই তৈরি হয়, তবে জিনিয়াস লেখকেরা তাদের সমকালীন সমাজে প্রচলিত ডিস্কোর্সগুলিরে শুধু এম্বেড বা ব্যাখ্যা করেন না, তারা এইগুলারে নতুনভাবে নির্মাণ করেন, ট্রান্সডেন্টাল করেন। তাদের প্রতিভাদীপ্ত চিন্তা ভাবনার কারণে তাদের লেখাগুলি কাল অতিক্রম করে যায়।

 

তাই তো মোটা দাগে বলা যায় শেক্সপিয়ারের ট্রাজিডিগুলি ব্যক্তির ট্রাডিশনাল ভ্যালুজ থিকা বার হইয়া- তার ‘ব্যক্তি মানুষ’ হয়ে ওঠার সাথে সাথে- রেনেসাঁর হাওয়াতে- তার এডভেঞ্চারাস, উচ্চাকাঙ্খি- ‘মেকাভেলিয়ান’ পলিটিকাল মানুষ হওয়ার গল্প যেন। সেই সময়ে এলিজাবেথান মানুষেরা নিজেদেকে জানা ও বোঝার সাথে সাথে তাদের ডেসটিনি নিয়া সন্দেহপ্রবণ হয়ে পড়লো। তাই শেক্সপিয়ার ম্যাকবেথ নাটকে দেখাতে চাইলেন মানুষের ভেতর কাজ করে দ্বিরাচারিতা, দ্বৈততা, এক ‘অচেনা মানুষ’ । মানুষ একই সময়ে হইতে পারে ভালো ও মন্দ, সে দেখল যে তার ডেসটিনি আর রাজা বা সামন্ত প্রভুর কাছে ধরা নয়, বরং তা তার চয়েসের কাছেই সেইটি ধরা। শেক্সপিয়ার বলতে চাইলেন গুড ও ইভলের অস্তিত্ব মানুষের কাছেই, মানুষ তার কর্মের ফলেই ভাল বা মন্দ ফলাফল লাভ করে। শেক্সপিয়ার আরো দেখতে চাইলেন মানুষ কিভাবে তার ফ্রি উইল ব্যবহার করে- কেউ তাকে বাধ্য করে না ইভলকে বাইছা নিতে। এই নাটকে ম্যাকবেথ সব সময়ই তার চয়েসের ব্যাপারে সচেতন ছিল, সে তার উইলকে কন্ট্রোল করছিল ভালোভাবে। রাজা ডানকান কে মারার আগে ও পরে সে যে কথাগুলি বলছে তা থেকে প্রমাণিত হয় যে সে জাইনা শুইনাই রাজাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। বলা যায় ম্যাকবেথ তার প্রবল ইচ্ছা শক্তিকে কাজে লাগাইয়া শুধু রাজার সাথেই বিশ্বাসঘাতকতা করে নাই, সে পুরা ন্যাচারাল সিস্টমের সাথেই বিশ্বাঘাতকতা করছে।

 

পড়তে পড়তে মনে হইছে- ম্যাকবেথে প্রধান যে আইডিয়াটা তলে তলে কাজ করছে সেইটা হইলো- ফেইট ও ফ্রি উইল। নাটকের শুরুতে যখন তিন ডাইনি বলছিলো যে একদিন ম্যাকবেথ রাজা হবে, তখন মনে হইতেছিল তাদের কথাই হয়ত সত্য হবে। এই তিন ডাইনি আর এক সেনা বাংকোকেও বলছিলো যে তার ছেলেও একদিন রাজা হবে। বাংকো কিন্তু ডানকানকে মারার কথা চিন্তা করে নাই। অপরদিকে ম্যাকবেথ লোভে হোক আর নিজের ইভল বাসনার কারণেই হোক বা ডাইনিদের পুঁতা ইভল বাসনা-বীজের কারণেই হোক, ম্যাকবেথ কিন্তু তার নিজের ইচ্ছাতেই ডানকানকে হত্যা কর। এই নাটকে ম্যাকবেথ ফেইটের কারণে রাজা হইছে ঠিকই কিন্তু তার নিজের অতি এম্বিসাস বাসনা ও চয়েসের কারণেই সে ডানকানকে হত্যা করে। ম্যাকবেথের এই ক্রাইমটা আমাদেরকে সেমেটিক ধর্মের বিশেষ করে ইসলাম ধর্মের প্রিডিটার্মিনেশনের কথা মনে করাইয়া দেয়। প্রিডিটারমিনেশন ধইরা আমাদের ভাগ্যের চাকা চলতে থেকে সত্য, কিন্তু আমরা আসলে নিজেরাই চুজ করি আমরা কিভাবে আমাদের সেই প্রিডিটারমাইন্ড ডেসটিনিতে পৌঁছাবো।

Share URL copied

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট

Related Articles

হাবিল-কাবিল: ক্ষমতা, ঈর্ষা ও মানুষের পতন

ইসলামের ইতিহাস ও কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী (আল-মায়িদাহ, আয়াত ২৭-৩১), হাবিল ও কাবিলের...

মানুষ, শয়তান ও স্বাধীনতা

মানুষের ইতিহাস কোথা থেইকা  শুরু হইছে?, এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়া বিভিন্ন...

আসল রুমির সন্ধানে

পাশ্চাত্য(ওয়েস্ট) ও প্রাচ্যে(ইস্ট) রুমি-পাঠ একটা হটকারি গ্লাসের মাধ্যমে দেখা ওরিয়েন্টালিস্ট পাঠ। এতে...