আমরা সাধারণত Enlightenment (আলোকায়ন) Modernity (আধুনিকতা) ও Islam (ইসলাম) এই তিনটা বিষয়রে ধর্ম বনাম যুক্তি, কিংবা বিজ্ঞান বনাম বিশ্বাসের দ্বন্দ্ব হিসেবে উপস্থাপন করি। কিন্তু এই ব্যাখ্যা অসম্পূর্ণ ও সন্দেহজনক। গভীরভাবে দেখলে দেখা যায়, প্রকৃত বিতর্কটা যুক্তি আর ধর্মের মধ্যে না, বরং মানুষ কে, জ্ঞানের উৎস কী, স্বাধীনতার অর্থ কী এবং সভ্যতার ভিত্তি কী-এই মৌলিক প্রশ্নগুলির মধ্যে ঘোরাফেরা করে। নিচে এই বিষয়ে আমরা একটু বিস্তারিত আলাপ করবো।
আলোকায়ন কী জিনিস?
সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে হাজির হওয়া ইউরোপীয় আলোকায়ন চার্চের একচ্ছত্র কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করছিল। আলোকায়নের (Enlightenment) আগে ইউরোপের চার্চগুলি ত্রিত্ববাদী (Trinity) খ্রিস্টধর্মের ঈশ্বরের উপাসনা করত। তারা বলতো- মানুষের মুক্তি কেবল ঈশ্বরের মাধ্যমে সম্ভব। আর সেই ঈশ্বরের ইচ্ছার বৈধ ব্যাখ্যাকারী একমাত্র প্রতিষ্ঠান হইলো চার্চ। ফলে ধর্মীয় কর্তৃত্ব ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্তৃত্বে রূপ নেয়। মানে হইল- সত্য, নৈতিকতা, শিক্ষা চার্চ ঠিক করবে। সাথে সাথে রাজা বৈধ কি না, কে ধর্মদ্রোহী সেইগুলিও চার্চ ঠিক করে দিবে। ফলে মানুষেরা এক প্রকারের যুলুমের শিকার হইতে থাকে। এই সময়ে বিজ্ঞানি ও বুদ্ধিজীবী যেমন রেনে দেকার্ত, জন লক, ইমানুয়েল কান্ট ও ভলতেয়ারের মতো চিন্তাবিদেরা তাদের লেখায় সত্য নির্ধারণে চার্চ নয়, মানব যুক্তি ও পর্যবেক্ষণকে গুরুত্ব সহকারে তুইলা ধরলো।
তারা যুক্তি, অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান ও ব্যক্তিস্বাধীনতাকে জীবনের মাণদণ্ড হিসাবে প্রতিষ্ঠা করলো। এই সকল চিন্তাবিদেরা যুক্তি দিলো যে- মানুষকে ইতিহাস ও ঐতিহ্যসূত্রে পাওয়া চার্চের শক্তি ও কর্তৃত্বের উপর নির্ভর না করে নিজের রিজন(বুদ্ধি) ব্যবহার করতে হইবো। কান্টের ভাষায়- আলোকায়ন হইলো মানুষের নিজের বুদ্ধি ব্যবহার করার সাহস অর্জন। যার ফলে চার্চের অনুশাসন থেইকা ধীরে ধীরে সইরা গিয়া পশ্চিমা মানুষ আলোকায়নের পতাকাতলে দাঁড়াইল। সত্য আলোকায়ন বিজ্ঞান, সাংবিধানিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও মানবাধিকারের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। কিন্তু একই সঙ্গে এইটা মানব যুক্তিকে সত্য অনুসন্ধানের একটা বিশেষ টুল থেইকা সত্যের সর্বোচ্চ বিচারক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করছে। বিশেষ কইরা পশ্চিমা জগতে।
অন্যদিকে ইসলামের দৃষ্টিতে আকল (ʿaql) বা বুদ্ধিবৃত্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুরআন বারবার মানুষকে চিন্তা, পর্যবেক্ষণ ও অনুধাবনের আহ্বান জানায় (৩:১৯০–১৯১; ৩০:২১–২৪)। কিন্তু ইসলাম যুক্তিকে কখনোই স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করে না। যুক্তি বাস্তবতার অনেক কিছু বুঝতে পারে, কিন্তু মানুষের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য, নৈতিকতার পরম ভিত্তি কিংবা অস্তিত্বের চূড়ান্ত অর্থ নির্ধারণ করতে পারে না। যেমন বিজ্ঞান আমাদের বলতে পারে মানুষ কীভাবে জন্ম নেয়, কিন্তু কেন জন্ম নেয় বা জীবনের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য কী- এইসবের উত্তর দিতে পারে না। আগুনের তাপ বিজ্ঞান ব্যখ্যা করতে পারে, কিন্তু মানুষের জীবনের চূড়ান্ত অর্থ ব্যাখ্যা করতে পারে না। বিজ্ঞান মৃত্যুর কারণ বলতে পারে, কিন্তু মৃত্যুর পর কী আছে, সে বিষয়ে নীরব। এইসব সীমাবদ্ধতার কারণেই মানুষের জন্য ওহি অপরিহার্য।
যুক্তিবাদ থেইকা অটোনোমাস সেলফ
আধুনিকতা আলোকায়নের দর্শনকে(যুক্তি, বিজ্ঞান) সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির বাস্তব কাঠামোতে রূপ দেয়। আধুনিক মানুষকে শেখানো হয়- সে নিজেই নিজের পরিচয়ের নির্মাতা, নিজের মূল্যবোধের স্রষ্টা এবং নিজের জীবনের একমাত্র নির্ধারক। সমাজতাত্ত্বিক চার্লস টেইলর দেখাইছেন, আধুনিকতার মানুষ এক ধরনের Buffered Self (সুরক্ষিত সত্তা), যে নিজেকে ইচ্ছা কইরা অতীন্দ্রিয় বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন কইরা রাখে। জিগমুন্ট বাউমানের ভাষায়, আধুনিক সমাজ Liquid Modernity (তরল আধুনিকতা) যেখানে পরিচয়, সম্পর্ক ও মূল্যবোধ সবই পানির মত, তরল ও অস্থায়ী। বিখ্যাত জার্মান-দক্ষিণ কোরীয় দার্শনিক এবং সাংস্কৃতিক তাত্ত্বিক বাইয়ুং-চুল হান আবার দেখান, আজকের মানুষ বাহ্যিক শাসনের চেয়ে নিজের ইচ্ছার কাছেই বন্দী। সে নিজের উপরই অবিরাম উৎপাদনশীলতা, সাফল্য ও উন্নতির চাপ সৃষ্টি করে। ফলে আধুনিকতার প্রধান সংকট অর্থনৈতিক বা প্রযুক্তিগত সংকট না বরং anthropological (নৃতাত্ত্বিক)। মানুষ ধীরে ধীরে তার স্রষ্টা, নৈতিক ভিত্তি ও চূড়ান্ত উদ্দেশ্য থেইকা বিচ্ছিন্ন হইয়া ভোগ, উৎপাদন ও ব্যক্তিগত পছন্দের মাধ্যমে নিজের identity(পরিচয়) নির্মাণ করতে শুরু করে!
মানুষের চেতনাকে কেন্দ্রে ফিরাইয়া আনার প্রেস্ক্রিপশন
কুরআন মানুষের একেবারেই ভিন্ন আইডেনটিটি দেয়। মানুষ নিজেই নৈতিকতার স্রষ্টা না, আবার ভাগ্যের অসহায় খেলনাও না। মানুষ আল্লাহর ‘আবদ’ (বান্দা) ও পৃথিবীতে তাঁর খলিফা (প্রতিনিধি) (কুরআন ২:৩০)। ইসলামে তাওহিদ(আল্লাহর একত্ববাদ) কেবল আল্লাহ এক- এই আকীদার(ইসলামিক পরিভাষায় আল্লাহর একত্ববাদ, ফেরেশতাকুল, আসমানি কিতাবসমূহ, নবী-রাসূলগণ, পরকাল এবং ভাগ্যের ভালো-মন্দের ওপর মনে-প্রাণে অটল বিশ্বাস স্থাপন করাকে আকীদা বলে) ঘোষণা না। তাওহিদ এমন একটি বিশ্বদর্শন যেখানে জ্ঞান, নৈতিকতা, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ ও আধ্যাত্মিকতা একই বাস্তবতার অংশ। এইগুলি আল্লাহর সার্বভৌমত্বের বাইরে না। তাই ইসলামে স্বাধীনতা মানে সব ধরনের কর্তৃত্ব থেকে মুক্ত হওয়া না, বরং নফস, প্রবৃত্তি, সম্পদ, ক্ষমতা এবং মানুষের তৈরি মিথ্যা উপাস্যগুলোর দাসত্ব থেইকা মুক্ত হইয়া কেবল আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করা (২৫:৪৩; ৪৫:২৩)। এই আত্মসমর্পণই প্রকৃত মুক্তি।
ওহি ও যুক্তির সমন্বয়
আলোকায়নের পর পশ্চিমা জ্ঞানতত্ত্ব ক্রমশ অভিজ্ঞতা ও যুক্তিকে জ্ঞানের প্রধান উৎস হিসাবে গ্রহণ করে। ইসলাম অভিজ্ঞতা ও যুক্তিকে অস্বীকার করে না বরং এই গুলিকে ওহির সঙ্গে সমন্বয় করে। কারণ মানুষের ইন্দ্রিয় ও বুদ্ধির সীমাবদ্ধতা আছে। মৃত্যুর পরের জীবন, নৈতিক দায়িত্ব, আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক কিংবা অস্তিত্বের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য- এইসব কেবল পরীক্ষাগারে আবিষ্কার করা সম্ভব না বা বিজ্ঞান এইগুলির উত্তর দিতে পারে না। ইসলামে ওহি যুক্তির প্রতিদ্বন্দ্বী না বরং যুক্তির দিকনির্দেশক।
দুনিয়ার দুই ভিন্ন মত
প্রত্যেক সভ্যতার পেছনে মানুষের কিছু শিক্ষালব্ধ বা অভিজ্ঞতালব্ধ ধারণা কাজ করে। আজকের আধুনিক সভ্যতা মূলত দাঁড়ায়া আছে- ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা, প্রযুক্তিগত আধিপত্য, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, ভোগবাদ এবং প্রকৃতির উপর মানুষের নিয়ন্ত্রণের ধারণার ওপর।
অন্যদিকে ইসলামিক সভ্যতার ভিত্তি হইলো তাওহিদ, আদল (ন্যায়বিচার), রাহমাহ (করুণা), খিলাফাহ (দায়িত্বশীল প্রতিনিধিত্ব), আমানাহ (অর্পিত দায়িত্ব), এবং আল্লাহর সামনে জবাবদিহিতা। এখানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তারা কখনোই চূড়ান্ত লক্ষ্য না বরং নৈতিক ও মানবিক উদ্দেশ্য পূরণের উপায়।
শেষ কথা
আমরা বলতে পারি যে আলোকায়ন, আধুনিকতা ও ইসলামের মধ্যকার প্রকৃত বিতর্ক বিজ্ঞান বনাম ধর্মের বিতর্ক না। আমরা প্রশ্ন করতে পারি- মানুষ কে? জ্ঞানের সর্বোচ্চ উৎস কী? মানুষের ওপর চূড়ান্ত কর্তৃত্ব কার? আলোকায়ন মানুষের স্বায়ত্তশাসিত যুক্তির উপর আস্থা রাখে। আধুনিকতা সেই ধারণাকে সমাজ, রাষ্ট্র, সংস্কৃতি ও অর্থনীতিতে বিস্তার করে এবং স্বনির্ধারিত ব্যক্তিসত্তাকে আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। ইসলাম যুক্তি, জ্ঞান ও মানব স্বাধীনতাকে স্বীকার করেও এগুলিকে তাওহিদের(আল্লাহর একত্ববাদ) কাঠামোর মধ্যে পুনর্বিন্যাস করে। এখানে স্বাধীনতা মানে সীমাহীন স্বায়ত্তশাসন না বরং আল্লাহর ইচ্ছার কাছে সচেতন আত্মসমর্পণের মাধ্যমে নফস, প্রবৃত্তি ও ক্ষমতার দাসত্ব থেকে মুক্ত হওয়া। এই অর্থে ইসলাম আধুনিকতার সব অর্জনকে প্রত্যাখ্যান করে না বরং আধুনিকতার সেই প্রবণতার সমালোচনা করে, যা মানুষের জ্ঞান, নৈতিকতা ও সভ্যতাকে তাদের আধ্যাত্মিক ভিত্তি থেইকা বিচ্ছিন্ন কইরা ফেলে।
রেফারেন্স:
Seyyed Hossein Nasr, Knowledge and the Sacred (1981).
আল-কুরআন: ২:৩০; ৩:১৯০–১৯১; ২৫:৪৩; ৩০:২১–২৪; ৪৫:২৩।
Immanuel Kant, An Answer to the Question: What Is Enlightenment? (1784).
Charles Taylor, A Secular Age (2007).
Zygmunt Bauman, Liquid Modernity (2000).
Byung-Chul Han, The Burnout Society (2015).
Talal Asad, Formations of the Secular (2003).
Alija Izetbegović, Islam Between East and West (1984).
Leave a comment