Current date August 23, 2026
অনুবাদ কবিতা

সিমাস হিনি’র ‘ডিগিং’ কবিতার অনুবাদ ও পাঠ

URL copied
digging
Share URL copied

অনেকদিন আগে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময়ই হিনির এই বিশেষ কবিতাটির প্রেমে পড়ে যাই। আসলে এই ধারার কবিতার প্রতি আমার ঝোঁক চিরদিনের। ইতিহাস, ঐতিহ্য, মাটি, মানুষের সংগ্রাম, রক্তপাত, মৃত্যু এইসব কবিতায় যেন এক ধরণের প্রাণ আর জান্তবতা নিয়ে আসে। সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত  ইয়েটস, এলিয়ট, ফ্রস্ট পড়তাম। এলিয়ট ত ভালো লাগতোই, ইয়েটসের চেয়ে বেশি। সাথে সাথে টেড হিউজ আর সিমাস হিনিকে আরো বেশি। হিনি ইয়েটসের দেশেরই লোক, নদার্ন আয়ারল্যাণ্ডের কবি। কিন্তু হিনি যেন ইয়েটসের এক বিপরীতমুখি স্রোত।  ইয়েটস যেখানে বায়বীয়, আকাশে উড়ে বেড়ায়, পরীদের গল্প করে, হিনি সেখানে ভূমিপুত্র, কবিতার শব্দ আর আবহে নিয়ে আসেন বগ এলাকার পচা ভেজা মাটির গন্ধ, তার ভেতরে জমে থাকা ইতিহাসের মানুষ, মানুষের মৃত্যু, মানুষের অমরতা। ভারি জান্তব, পুরাতাত্ত্বিক মাল মসলায় ভরা তার কবিতা। ইয়েটস নয়, সিমাস হিনিই বাঙালির প্রিয় কবি হতে পারত। স্মরণীয় আমাদের কৃষিমুখি সমাজ ব্যবস্থা, পাকিস্তানিদের হাতে আমাদের ভাষা আর সংস্কৃতির ব্লাডি অ্যাসাল্ট, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, দেশের নানা জায়গায় ছড়ানো ছিটানো শহীদদের কবর, কবরের ভেতর মানুষের হাড়, কঙ্কাল।

সিমাস হিনি(জন্ম ১৯৩৯, মৃত্যু ২০১৩) বিংশ শতাব্দির একজন বড় মাপের কবি। স্বভাব আর মননে অতীত আর ঐতিহ্যপ্রেমি এই কবি প্রায়ই চলে যান অতীতে, ইতিহাসের গর্ভে। হিনি এক সময় বলেছিলেন – আমার কাছে এরকম  মনে হয় যে আমি যেন কোনো গুপ্ত, চাপাপড়া জীবন থেকে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় ঢুকে পড়েছি।

কবির এ পর্যন্ত বিশটি কবিতার বই বেরিয়েছে। তার কবিতার লিরিক্যাল সোন্দর্য আর নৈতিক গভীরতা, তার সাথে অলৌকিক ঘটনা আর অতীতগামীতার কারণে তিনি ১৯৯৫ সনে সাহিত্যে নবেল পুরস্কার পান। সিমাস হিনির জনপ্রিয়তা অংশত তার অনন্য সিগনেচার মার্ক বিষয়-বস্তুর জন্য। কী সেই বিষয়বস্তু? নর্দান আইয়ারল্যাণ্ডের খামার জীবন,তার শহরগুলোতে জনরোষ, ব্রিটিশ শাসনের ফলে তার দেশজ সংস্কৃতি আর ভাষার ধ্বংসময়তা যেন তার কবিতায় ফিরি ফিরে আসে। তিনি এক কলম যোদ্ধার মতো  তার কবিতায় তার দেশের অতীত বর্তমান আর ভবিষ্যতকে এঁকে দেন। এদিক থেকে তার তুলনা চলে শুধু টেড হিউজ, পেট্রিক কাভানা আর আর এক খামারবাসী কবি রবার্ট ফ্রস্ট এর সাথে

তার প্রথম জীবনের কবিতার বই -ডেথ অব অ্যা ন্যাচারালিস্ট(১৯৬৬) এবং ডোর ইনটু দ্যা ডার্ক(১৯৬৯) তার খামার জীবন তথা আরকিঅ্য লজিকল মানইণ্ডসেট  ধরা পড়ে। এই বই দুটির  নামকরণই একজন শক্তিশালি কবি, তার নতুন বিষয় ভাবনা ও ভাষার কথা বলে দেয়।  তার কবিতায় হিনি পাঠকদেরকে তার আত্মপরিচয়ের সূত্র তার অতীত,খামার জীবনের রূপ রস গন্ধ দৃশ্য এসব দেখতে বাধ্য করেন। তার এই ডিগিংকবিতাটাও তাই।

বাংলা অনুবাদ

মাটি খোঁড়া

আমার আঙুল আর বুড়ো আঙুলের মাঝখানে

এক পৃথুল কলম বসে থাকে, আরাম করে বন্দুকের মতো।

 যখন কোদাল ঢুকে যায় পাথুরে জমিনে

জানালার নিচে খরখরে আওয়াজ শুনি

দেখি- আমার বাবা মাটি খুঁড়ছে।

আমি নিচে তাকিয়ে থাকি

 

যতক্ষণ না তার টানটান পাছা বসে পড়ছে

ঝুঁকছে নিচু হয়ে- ফুলের বিছানায়।

কুড়ি বছর পার করে চলে আসে সে

এমন করে উবু হয়ে আলু রোপনের ছন্দে

যেখানে সে মাটি খুঁড়ে চলত প্রত্যহ।

 

পুরনো বুট জুতা আশ্রয় নেয় হাতলে

আর লাঠি শক্ত করে বসে পড়ে দুই হাঁটুর মাঝখানে।

নতুন আলু ছড়িয়ে দিতে -যেগুলো আমরা পেরেছি,

সে উপরের লম্বা পাতাগুলো ছেঁটে দেয়

আর গভীরে ঢুকিয়ে দেয় ঘাসের উজ্জল কিনারা

ভালোবাসি আলুগুলোর ঠাণ্ডা শক্ত-কঠোরতা।

 

ও আল্লাহ, বুড়োটা কীভাবে কাজে লাগায় কোদালটাকে

যেমন তার বুড়ো বাবা করত এক সময়।

 

আমার দাদাও মাটির চাপড়া কাটত টোনারের জলায়

অন্য সব লোকের চেয়েও অনেক বেশি বেশি করে।

একদিন আমি তাকে কাগজের ছিপিতে আটকানো

বোতলে দুধ দিতে যাই- মনে পড়ে।

সে বোতলটা সোজাসুজি ধরে পান করল সবটুকু

তারপর সোজা লেগে গেল মাটি কাটার কারুকাজে।

কাধের উপর দিয়ে মাটির চাপড়া উঠিয়ে

নিচে আরো নিচে নামল -ভালো মাটির জন্য

                   মাটি খোঁড়া চলল এভাবে।

 

আলুর দলার ঠাণ্ডা গন্ধ, ভেজা মাটির উপর হেঁটে যাওয়ার

প্যাচ প্যাচে আওয়াজ,  জীবন্ত শেকড়ের মধ্য দিয়ে

ঘাসগুলোর ছোট টুকুরো– আমার মাথার ভেতরে ওঠে জেগে!

কিন্তু আমার কোনো কোদাল নেই

তাদের মতো লোকদের পেছনে যাওয়ার।                                                          

আমার আঙুল আর আমার বুড়ো আঙুলের মাঝখানে

এক পৃথুল কলম বসে থাকে

আমি খুঁড়বো তাকে দিয়ে।

ডিগিং কবিতার পাঠ

ডিগিং এক কথায় ভূমি সংলগ্ন পূর্বপুরুষের মাটিমূখি জীবনগাথা। কোদাল আর কলম এই কবিতার দুটি সভ্যতা, দুটি প্রতিশ্রুতির প্রতীক। দুটোই অস্ত্র–কোদাল বাবার, কলম তার। কবি তার বাবা অথবা পিতামহের মতো হতে পারবেনা, কিন্তু সে এটির প্রতি সগৌরবে শ্রদ্ধাশীল। এই কবিতায় কেন্দ্রীয় উপমা ডিগিং(খনন) এবং রুটস (শেকড়)আমাদেরকে জানান দেয় কবি কীভাবে তার নিজ শেকড় আর আত্মপরিচয়ের সূত্র খুঁজে বেড়ান। মনে রাখি- নিজের ও জাতির আত্মপরিচয় খুঁজে বেড়ানো হিনির কবিতার একটি প্রধান চিহ্ন।

 

কবি কবিতা লিখছেন, আর তার বাবা মাটি খুঁড়ছেন। তাদের মধ্যে এই ‘পেশাগত’ দূরত্বই এই কবিতার মূল সুর। এইবিষয়টি একটি লাইনে ধরা– তার আঙুলের মাঝখানে স্কোয়াট পেন(স্থূল কলম) আরাম করছে বন্দুকের মতো। হিনি তার কবিতা লেখার কলমকে বন্দুকের সাথে তুলনা করেছেন, যেমন বাবাকে দেখেছেন কোদাল দিয়ে জমি খুঁড়তে। তার বাবার পেশা আর তার উল্টোমুখি ক্যারিয়ার নিয়ে অনেকে সমলোচনা করেছেন তাকে। এই কবিতাটি কি তার প্রতি করা সমালোচনার জবাব?

আমরা কবিতার শুরুতে দেখি —জানালা থেকে হিনি বাবার টানটান পিঠের দিকে তাকায়। তার এই কলমঘেঁষা আরাম-অবস্থান, তার বাবার খেটে খাওয়া, শ্রমমূখি অবস্থান থেকে তাকে হয়ত সামাজিকভাবে উঁচুতে নিয়ে যায়, কিন্তু সাথে সাথে তিনি এর মাটির সাথে যোগাযোগের অর্থময়তার কাছে বেশি আনত। এখানে একটা সাময়িক টেনশন কাজ করে তার ভেতর। কিন্তু যখন তিনি বলেন আমি এই কলম দিয়েই খুঁড়বো, তখন বুঝা গেল তিনি বাবার পেশাকেই অনুসরণ করছেন, কিন্তু একটু অন্যভাবে। তিনি কোদাল দিয়ে নয় বরং কলম দিয়ে তার আত্মপরিচয়কে নতুনভাবে আবিষ্কার করবেন।

হিনির কবি জীবনের একটি বড় অংশ বিচ্ছিন্নতা আর নি:সঙ্গতার বিষয় আর আবহে পরিপূর্ণ। এই কবিতাটাও তাই। তার বাবা ভূমি সংলগ্ন হয়ে মাটির কাছাকাছি, হিনি ভূমি বিচ্ছিন্ন,কলমের কাছাকাছি।  হিনি তার বাবার মাটি খননের পেশার সাথে তার কলম চালানোর পেশাগত দূরত্ব তার ভেতরে সেই বিচ্ছিন্নতা আর নি:সঙ্গতাকে জাগিয়ে তোলে । হয়ত তার বাবা আর পিতৃপুরুষের মতো জমি চাষ করার দক্ষতা তার নেই, কিন্তু তার দক্ষতা আছে কলমের সাথেযেটি দিয়ে সে তার জীবনকে অর্থ দিতে পারে জমি খুঁড়ার মতো। এই তার খনন এই তার শান্তি।

90%
Review Overview
Summary

Vestibulum viverra gravida fringilla. Suspendisse accumsan purus quis augue lobortis quis sagittis

The Pros
Colors Size Style
The Cons
Expensive Duration quality
  • Design100%
  • Speed80%
  • Saving90%
  • Features90%
Share URL copied

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট

Related Articles

অ্যাডোনিসের একগুচ্ছ কবিতা

[সিরিয়ান-লেবানিজ কবি অ্যডোনিসের জন্ম ১৯৩০ সনে পশ্চিম সিরিয়ার কাশাবিন নামের একটি গ্রামে।...

তুর্কী কবি সামি বায়দারের চারটি কবিতা

সামি বায়দার (১৯৬২-২০১২) জীবিতকালে প্রায় অস্বীকৃত, অকালপ্রয়াত তুর্কী কবি সামি বায়দার এর...

জালালউদ্দিন রুমির একগুচ্ছ কবিতা

ইয়েটস, এলিয়ট, নেরুদা, উইলিয়াম কালোর্স কিংবা অ্যাশবেরি নয়, পশ্চিমা বিশ্বে এখনো জালাল...