সূরা ইখলাসকে সাধারণত আল্লাহর একত্বের ঘোষণা হিসেবে পাঠ করা হয়। কিন্তু এর তাৎপর্য কেবল একটি আকীদাগত বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এই সংক্ষিপ্ত সূরাটি মানুষের সমগ্র অস্তিত্বের অভিমুখ (orientation) পুনর্নির্ধারণ করে। এটি শুধু মানুষকে জানায় না যে আল্লাহ এক, বরং এটি মানুষকে শেখায় বাস্তবতা, আত্মপরিচয় ও ক্ষমতার প্রকৃত ভারসাম্য।
সমসাময়িক সিস্টেমস থিওরি, কগনিটিভ সায়েন্স, স্নায়ুতন্ত্র, সাইবারনেটিক্স এবং পরিচয় (identity) বিষয়ক গবেষণায় একটি বিষয় ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে- তা হলো কোনো সিস্টেমই প্রকৃত অর্থে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। জীববৈজ্ঞানিক ব্যবস্থা, স্নায়বিক নেটওয়ার্ক, সামাজিক কাঠামো, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, সংস্কৃতি কিংবা ব্যক্তিগত পরিচয়- সবকিছুই নিজের বাইরের কোনো বাস্তবতার ওপর নির্ভরশীল। কোনো ‘self’ নিজেই নিজের চূড়ান্ত ভিত্তি হতে পারে না।
কিন্তু মানুষের অহং (ego) ঠিক উল্টো প্রবণতার দিকে ঝুঁকে থাকে। এটি নিজেকে কেন্দ্র, মানদণ্ড, উৎস এবং কর্তৃত্বে পরিণত করতে চায়। এমনকি জ্ঞান অর্জনের পরও এই প্রবণতা বিলীন হয় না, বরং আরও সূক্ষ্ম রূপ ধারণ করে। মানুষ প্রায়ই মনে করতে শুরু করে যে তার বোধ, তার অভিজ্ঞতা কিংবা তার পরিচয়ই বাস্তবতার চূড়ান্ত মানদণ্ড। সূরা ইখলাস এই বিভ্রমকে একেবারে মূল থেকে ভেঙে দেয়।
‘বলুন, তিনিই আল্লাহ, আহাদ’
এখানে ‘আহাদ’ কোনো সংখ্যাগত একত্বের ধারণা নয়। এটি এমন এক পরম একত্ব, যা তুলনাহীন, অবিভাজ্য ও সম্পূর্ণ অনন্য। ধ্রুপদী তাফসির- বিশেষত ইবনে কাসীরের ব্যাখ্যা স্পষ্ট করে যে ‘আহাদ’ কোনো শ্রেণির সদস্য নন, বরং তিনি সেই একমাত্র সত্তা, যার কোনো সমকক্ষ, অংশীদার কিংবা তুলনা নাই । এরপর সূরাটি ঘোষণা করে:
‘আল্লাহুস সামাদ’
অর্থাৎ আল্লাহই একমাত্র স্বয়ংসম্পূর্ণ। সমস্ত সৃষ্টি তাঁর ওপর নির্ভরশীল, তিনি কারো ওপর নির্ভরশীল নন। এই ঘোষণার দার্শনিক তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। কারণ এটি শুধু একটি ধর্মতাত্ত্বিক (theological) সত্য নয়, এটি অস্তিত্বের মৌলিক কাঠামোকে সংজ্ঞায়িত করে। বাস্তবতার মধ্যে যা কিছু আছে, সবই নির্ভরশীল। কেবল আল্লাহই স্বাধীন, স্বয়ংসম্পূর্ণ ও পরম।
সিস্টেমস থিওরির ভাষায় বলা যায়, কোনো ব্যবস্থা যখন নিজের বাইরের সত্যের সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে ফেলে, তখন সেটি আত্ম-উল্লেখকারী (self-referential) হয়ে ওঠে। এটি এমন একটি বন্ধ ফিডব্যাক চক্র তৈরি করে, যেখানে সমস্ত শক্তি শেষ পর্যন্ত কেবল নিজের অস্তিত্বকেই পুনরুৎপাদন করতে ব্যয় হয়। যেমন একটি কুকুর নিজের লেজ নিজেই তাড়া করে, অথবা একটি সাপ নিজের লেজই নিজেই খেয়ে ফেলে।
কগনিটিভ সায়েন্সে এই প্রবণতার একটি প্রতিফলন দেখা যায় ‘priors’ বা পূর্বধারণার মধ্যে। মানুষ সাধারণত সেই তথ্যই গ্রহণ করে, যা তার বিদ্যমান বিশ্বাসকে শক্তিশালী করে। ধীরে ধীরে ‘আমি’ হয়ে ওঠে সমস্ত কিছুর কেন্দ্র- আমার পরিচয়, আমার আকাঙ্ক্ষা, আমার মর্যাদা, আমার ভোগ, আমার অনুভূতি ও আমার ভাবমূর্তি। ফলাফল একটাই- ব্যবস্থাটি নিজের ভেতরেই আবর্তিত হতে থাকে।
এই বাস্তবতা কেবল আধ্যাত্মিক জগতে সীমাবদ্ধ নয়। মনস্তত্ত্ব, সমাজবিজ্ঞান, রাজনীতি এবং অর্থনীতিতেও একই নীতি কাজ করে। ব্যক্তি কিংবা সমাজ যখন কোনো উচ্চতর সত্য বা পরম অভিমুখ হারিয়ে ফেলে, তখন জীবন ক্রমশ ভোগ, প্রদর্শনী, ক্ষমতার প্রতিযোগিতা এবং পরিচয় নির্মাণের খেলায় পরিণত হয়। বাইরে থেকে তা শক্তিশালী মনে হলেও, ভেতরে ভেতরে তার সামঞ্জস্য (coherence) ক্ষয় হতে শুরু করে।
আধুনিক অতিভোগবাদী সভ্যতার একটি মৌলিক সংকট এখানেই। প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অভূতপূর্ব, কিন্তু অস্তিত্বগত সামঞ্জস্য খুবই দুর্বল। আকাঙ্ক্ষা সীমাহীন, অথচ নিজেকে উত্তরণ প্রচেষ্টা অনুপস্থিত। সবকিছুই নিজেকে ঘিরে আবর্তিত। নিজের স্বাধীনতা, নিজের পরিচয়, নিজের সাফল্য, নিজের আনন্দ ইত্যাদি।
কিন্তু যে ব্যবস্থা নিজেই নির্ভরশীল, সে কখনোই নিজের উপাসনার ভিত্তি হতে পারে না। কারণ নির্ভরশীল বা শর্তাধীন কোনো সত্তা চূড়ান্ত সত্যের ভার বহন করতে পারে না। এখানেই তাওহীদের প্রকৃত অর্থ উদ্ভাসিত হয়। ইসলাম শুধু একজন আল্লাহতে বিশ্বাসের আহ্বান জানায় না, সাথে সাথে এটি অস্তিত্বের প্রকৃত ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে। এটি শেখায় যে নির্ভরশীল কোনো কিছুকেই পরমে উন্নীত করা যায় না। না অহং, না মতবাদ, না সম্পদ, না রাষ্ট্র, না সমাজ, না প্রবৃত্তি। এমনকি মানুষের নিজের ধর্মীয় পরিচয় বা আমলকেও নয়। পরম একমাত্র আল্লাহ।
ইসলামী ঐতিহ্য মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে আল্লাহ সব তুলনার ঊর্ধ্বে, সব সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে এবং মানুষের সব ধারণা ও ভাষারও ঊর্ধ্বে। তাই তাওহীদ মানে আল্লাহকে কোনো বৌদ্ধিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা নয়, বরং উপলব্ধি করা যে সমস্ত ধারণা, সমস্ত জ্ঞান ও সমস্ত ভাষা শেষ পর্যন্ত তাঁর সামনে নত হয়ে যায়। এই কারণেই ইবরাহিম (আ.) নক্ষত্র, চাঁদ এবং সূর্য- সবকিছুকেই প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। যা উদিত হয় ও অস্ত যায়, যা পরিবর্তিত হয়, যা নির্ভরশীল- তা কখনোই চূড়ান্ত হতে পারে না।
যখন কোনো ব্যবস্থা কেবল নিজেরই সেবা করে, তখন সেটি একটি বন্ধ ফিডব্যাক চক্রে বন্দী হয়ে পড়ে। কিন্তু যখন সেটি নিজের বাইরের সত্যের দিকে, তার সৃষ্টিকর্তার দিকে অভিমুখী হয়, তখনই সে নিজের প্রকৃত অবস্থান উপলব্ধি করতে শেখে। তখন অহং নম্র হয়, ভোগ নিয়ন্ত্রিত হয়, আন্তরিকতা বৃদ্ধি পায় এবং মানুষের চেতনা তার প্রকৃত নোঙর খুঁজে পায়। সম্ভবত সূরা ইখলাসের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা এখানেই। তাওহীদ কেবল একটি ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, এটি অস্তিত্বের মৌলিক বিন্যাস। মানুষ তখনই নিজেকে সঠিকভাবে বুঝতে পারে, যখন সে নিজেকে কেন্দ্র থেকে সরিয়ে একমাত্র স্বয়ংসম্পূর্ণ সত্তার দিকে অর্থাৎ আল্লাহর দিকে ফিরে যায়, যাঁর ওপর সমগ্র সৃষ্টি নির্ভরশীল, অথচ যিনি কারো ওপর নির্ভরশীল নন।
রেফারেন্সঃ
- পবিত্র কুরআন — সূরা আল-ইখলাস (১১২), সূরা আল-আন‘আম (৬:৭৬–৭৯), সূরা ফাতির (৩৫:১৫), সূরা মুহাম্মাদ (৪৭:৩৮)
- তাফসীর ইবন কাসীর
- সাধারণ সিস্টেম তত্ত্ব (General System Theory)
- তরল আধুনিকতা (Liquid Modernity)
Leave a comment