সালাতকে সাধারণভাবে ধর্মীয় কর্তব্য, ব্যক্তিগত ইবাদত কিংবা আধ্যাত্মিক প্রশান্তির মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু সালাতের অর্থ এর চেয়েও বিশাল। কিন্তু যদি আমরা আধুনিকতা উত্তর-আধুনিকতা, দর্শন, সভ্যতা, ভাষা ও সংস্কৃতির আলোকে সালাতকে দেখি, তাইলে দেখবো সালাত মানুষের নিজের কেন্দ্রহীনতা, ভোগবাদ, সময়ের দাসত্ব, ভাষার শূন্যতা এবং সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার হাত থেকে পুনরুদ্ধারের এক গভীর অনুশীলন। সালাত শুধু মানুষকে আল্লাহর সামনে দাঁড় করায় না; এইটা মানুষকে আধুনিক বিশ্বের সভ্যতাকেন্দ্রিক কিছু ধারণার কাছেও দাঁড় করায়। মানুষ কি স্বয়ংসম্পূর্ণ? স্বাধীনতা কি শুধু ইচ্ছাপূরণের নাম? সময় কি কেবল উৎপাদনের উপাদান? দেহ কি শুধু ভোগ ও প্রদর্শনের বস্তু? ভাষা কি কেবল যোগাযোগের মাধ্যম? সভ্যতার অগ্রগতি কি মানুষের নৈতিক উন্নতিও নিশ্চিত করে? সালাত এসব প্রশ্নের একটি স্বতন্ত্র উত্তর নির্মাণ করে। নিচে আমরা উত্তরগুলি নিয়া কথাবার্তা বলবোঃ
আধুনিকতার স্বয়ংসম্পূর্ণ মানুষ ও সালাতের নির্ভরশীল সত্তা
আধুনিকতার অন্যতম প্রধান আবিষ্কার হইলো ‘স্বায়ত্তশাসিত মানুষ’ ধারণা, যে নিজেই নিজের বিচারক, নিজের লক্ষ্য নির্ধারক এবং নিজের জীবনের চূড়ান্ত কেন্দ্র। ইউরোপীয় আলোকায়ন মানুষকে ধর্মীয় কর্তৃত্ব, ঐতিহ্য ও অতিপ্রাকৃত জগতের নিয়ন্ত্রণ থেইকা মুক্ত করার চেষ্টা করছিল। সত্য এই মুক্তি জ্ঞান, বিজ্ঞান ও রাজনৈতিক অধিকারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও ধীরে ধীরে তা মানুষকে এমন এক সত্তা হিসাবে গইড়া তুলছে যে মানুষ মনে করে সে কারও ওপর আর নির্ভরশীল না। সালাত এই স্বয়ংসম্পূর্ণতার ধারণাকে ধ্বংস করে। মানুষ যখন “আল্লাহু আকবার” বইলা সালাত শুরু করে, তখন সে ঘোষণা করে- নিজের বুদ্ধি, ক্ষমতা, রাষ্ট্র, বাজার, প্রযুক্তি ও ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা কোনো কিছুই চূড়ান্ত না। মানুষের স্বাধীনতা আছে, কিন্তু সে অস্তিত্বগতভাবে নির্ভরশীল। সে সৃষ্ট, সীমিত ও জবাবদিহিমূলক। আধুনিক মানুষ বলে- আমি নিজেই আমার জীবনের মালিক। কিন্তু সালাত শেখায় তুমি দায়িত্বপ্রাপ্ত, কিন্তু চূড়ান্ত মালিক নও। এই পার্থক্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সালাত মানুষের স্বাধীনতাকে অস্বীকার করে না; বরং স্বাধীনতাকে নৈতিক দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত করে।
আধুনিক সময়ের যান্ত্রিকতা ও সালাতের পবিত্র সময়
আধুনিক সভ্যতায় সময়কে প্রধানত ঘড়ি, উৎপাদন, শ্রম, মুনাফা ও দক্ষতার মাধ্যমে পরিমাপ করা হয়। শিল্পবিপ্লবের পর সময় ধারণা আর শুধু দিন-রাতের স্বাভাবিক প্রবাহ না। সময় হইয়া ওঠে অর্থনৈতিক সম্পদ। “সময়ই টাকা (time is money)” এই বাক্য আধুনিক জীবনের গভীর মনস্তত্ত্ব ও দাসত্ব প্রকাশ করে। সালাত এই সময়চেতনাকে ভিন্নভাবে বিন্যস্ত করে। পাঁচ ওয়াক্ত সালাত মানুষকে মনে করা- সময় শুধু উৎপাদনের জন্য না, সময় স্মরণেরও। সময় শুধু কাজের না, সময় জবাবদিহিতারও। সময় শুধু সামনে আগানোর না, সময় থামার, ফিরা দেখার এবং নিজেকে সংশোধনেরও। ফজর দিনকে আল্লাহর নামে শুরু করে, যোহর কাজের মধ্যখানে মানুষকে থামায়। আসর ক্ষয়িষ্ণু দিনের মতো জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব স্মরণ করায়। মাগরিব আলো থেকে অন্ধকারে প্রবেশের সীমান্তকে পবিত্র করে। ইশা ঘুমের আগে মানুষকে তার উৎস ও পরিণতির দিকে ফিরাইয়া আনে। সালাত তাই আধুনিক জীবনের তাড়াহুড়ার বিপরীতে বিরতির পবিত্র সংস্কৃতি। এইটা মানুষের সময়কে বাজারের সম্পত্তি হইতে দেয় না।
উত্তর-আধুনিক কেন্দ্রহীনতা ও সালাতের অভিমুখ
উত্তর-আধুনিকতা স্থির সত্য, একক পরিচয়, মহা-বয়ান ও চূড়ান্ত অর্থের ধারণাকে প্রশ্ন করে। এইটা বহু আধিপত্যশীল ভাষ্য ভাঙতে সাহায্য করছে। কিন্তু একই সঙ্গে উত্তর-আধুনিকতা মানুষকে প্রায়ই অর্থের অনিশ্চয়তা, পরিচয়ের ভাঙন ও নৈতিক আপেক্ষিকতার মধ্যে ঠেইলা দিছে। মানুষ তখন বহু পরিচয়ের অধিকারী হয়, কিন্তু কোনো কেন্দ্রের অধিকারী হয় না। তার জীবন অসংখ্য ছবি, মত, আকাঙ্ক্ষা, তথ্য ও ক্ষণস্থায়ী অনুভূতির মধ্যে ছড়াইয়া পড়ে। সালাত এই কেন্দ্রহীনতার বিপরীতে একটি অভিমুখ বা কেন্দ্র নির্মাণ করে। কিবলামুখী হওয়া শুধু ভৌগোলিক দিক নির্বাচন না, এইটা অস্তিত্বের দিক নির্বাচন। পৃথিবীর নানা ভাষা, জাতি ও সংস্কৃতির মানুষ একই দিকে মুখ ফিরায়। এর অর্থ, মানবজীবন সম্পূর্ণ এলোমেলো বা দিকহীন নয়। মানুষের একটি কেন্দ্র আছে, একটি জবাবদিহির স্থান আছে এবং একটি নৈতিক দিক আছে। উত্তর-আধুনিক মানুষ প্রায়ই বলে- সত্য বহুবিধ, পরিচয় পরিবর্তনশীল ও অর্থ নির্মিত। সালাত বলে: মানুষের অভিজ্ঞতা বহুবিধ হইতে পারে, কিন্তু সত্য কেন্দ্রহীন নয়। মানুষের জীবন আল্লাহর দিকে অভিমুখী না হইলে তা বহুত্বের মধ্যে ভেঙে পড়ে।
দার্শনিকভাবে সালাত: অস্তিত্ব, জ্ঞান ও নৈতিকতার সংযোগ
দর্শনের ভাষায় সালাতকে তিনটি স্তরে দেখা যায়: সত্তাতত্ত্ব, জ্ঞানতত্ত্ব ও নৈতিকতা।
সত্তাতাত্ত্বিক স্তরঃ সালাত মানুষকে তার অস্তিত্বের প্রকৃতি শেখায়। মানুষ নিজে নিজে অস্তিত্বশীল নয়, সে নির্ভরশীল, ক্ষণস্থায়ী ও সীমাবদ্ধ। সিজদা এই সত্যের শারীরিক স্বীকৃতি। মানুষ কপাল মাটিতে রাখে, কারণ তার সৃষ্টি মাটি থেকে। কিন্তু একই সঙ্গে সে আল্লাহর নিকটবর্তী হয়। অর্থাৎ মানুষের মর্যাদা তার অহংকারে নয়; তার সচেতন বন্দেগিতে।
জ্ঞানতাত্ত্বিক স্তরঃ সালাতে মানুষ শুধু নিজের কথা বলে না, সে ওহির ভাষা পাঠ করে। জ্ঞান কেবল মানুষের অভিজ্ঞতা, যুক্তি ও ইন্দ্রিয় থেইকা আসে না। ওহিও জ্ঞানের উৎস। সূরা আল-ফাতিহায় মানুষ বারবার হিদায়াত চায়। এই প্রার্থনা স্বীকার করে যে মানুষ জানে, কিন্তু তার জ্ঞান অসম্পূর্ণ। সে দেখে, কিন্তু ভুল চোখে দেখে। সে বিচার করে, কিন্তু প্রবৃত্তি ও স্বার্থ তার বিচারকে বিকৃত করে।
নৈতিক স্তরঃ সালাতের সত্যতা আচরণে পরীক্ষিত হয়। কুরআন বলে, সালাত অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। ফলে সালাত শুধু অন্তর্গত অনুভূতি না, এইটা নৈতিক চরিত্রের দাবি করে। যে সালাত মানুষকে সত্যবাদী, ন্যায়পরায়ণ, বিনয়ী ও দায়িত্বশীল করে না, সেই সালাতের রূপ আছে, কিন্তু তার নৈতিক প্রাণ দুর্বল।
সভ্যতার দৃষ্টিতে সালাত: সীমা, শৃঙ্খলা ও মানবিকতা
আধুনিক সভ্যতা প্রযুক্তি, চিকিৎসা, যোগাযোগ ও উৎপাদনে অভূতপূর্ব অগ্রগতি অর্জন করছে। কিন্তু এই অগ্রগতি মানুষের অহংকার, যুদ্ধ, পরিবেশ ধ্বংস, ভোগবাদ ও বৈষম্যও বাড়াইছে। মানুষ বাইরের জগত নিয়ন্ত্রণে দক্ষ হইছে, কিন্তু নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণে সফল হয় নাই। সালাত সভ্যতাকে মনে করায়, বাহ্যিক উন্নতি নৈতিক উন্নতির সমান না। একটি সভ্যতা মহাকাশে পৌঁছাইতে পারে, কিন্তু মানুষের মর্যাদা রক্ষা করতে ব্যর্থ হইতে পারে। একটি রাষ্ট্র শক্তিশালী হইতে পারে, কিন্তু ন্যায়পরায়ণ নাও হইতে পারে। একজন মানুষ শিক্ষিত হইতে পারে, কিন্তু বিনয়ী নাও হইতে পারে। সালাত সভ্যতার শক্তিকে সীমার মধ্যে রাখে। রুকু বলে: তোমার জ্ঞান সীমিত, সিজদা বলে: তোমার ক্ষমতা পরম নয়। কিয়াম বলে: তুমি দায়িত্বশীল। সালাম বলে: তোমার উপস্থিতি অন্যের জন্য নিরাপত্তার উৎস। এইভাবে সালাত নৈতিক সভ্যতার দৈনিক অনুশীলন।
ভাষার আলোকে সালাত: শব্দ থেকে উপস্থিতির দিকে
উত্তর-আধুনিক ভাষাতত্ত্ব দেখাইছে যে ভাষা কেবল বাস্তবতা প্রকাশ করে না, ভাষা বাস্তবতাও নির্মাণ করে। মানুষ যে শব্দ ব্যবহার করে, সেই শব্দ তার চিন্তা, সম্পর্ক ও তার দুনিয়া বোঝাকে প্রভাবিত করে। সালাতের ভাষা এই দিক থেইকা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। “আল্লাহু আকবার”(আল্লাহ সবকিছুর চেয়ে মহান)- মানুষের মূল্যবোধের ক্রম পরিবর্তন করে। “ইয়্যাকা না’বুদু”(আমরা কেবল তোমারই ইবাদত করি)- মানুষের আনুগত্যের কেন্দ্র নির্ধারণ করে। “ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকিম”(আমাদের সরল পথ দেখাও)- মানুষের জ্ঞানগত সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে। “সুবহানা রব্বিয়াল আযীম”(আমার মহান প্রতিপালক সকল অপূর্ণতা ও ত্রুটি থেকে পবিত্র)- মহত্ত্ব আল্লাহর দিকে ফিরাইয়া আনে। “সুবহানা রব্বিয়াল আলা”(আমার সর্বোচ্চ প্রতিপালক সকল অপূর্ণতা ও ত্রুটি থেকে পবিত্র)- সিজদার সর্বনিম্ন অবস্থায় আল্লাহর সর্বোচ্চতাকে ঘোষণা করে। এই ভাষা শুধু তথ্য দেয় না, এইটা মানুষের অবস্থান নির্মাণ করে। প্রতিদিন একই সত্য উচ্চারণ মানুষের চেতনাকে একটি নির্দিষ্ট নৈতিক ব্যাকরণ শেখায়। সালাতের ভাষা মানুষের “আমি”-কে “আমরা”-র মধ্যে স্থাপন করে। সূরা ফাতিহায় বলা হয় না, “আমি তোমার ইবাদত করি”, বলা হয়, “আমরা তোমারই ইবাদত করি।” ফলে সালাতের ভাষা ব্যক্তিকেন্দ্রিকতাকে ধ্বংস করে মানুষকে উম্মাহ, সম্প্রদায় ও সম্মিলিত দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত করে।
বাজার-সভ্যতা ও সালাতের বিরোধ
আধুনিক বাজার মানুষের পরিচয়কে ভোক্তার পরিচয়ে নামাইয়া আনে। মানুষ কী কিনে, কী পরে, কোথায় যায় এবং কী প্রদর্শন করে- এইসব দিয়া তার মূল্য নির্ধারিত হয়। সালাত এই বাজার-নির্মিত পরিচয়কে বিলুপ্ত করে। মসজিদের কাতারে মানুষের পোশাক, গাড়ি, পদমর্যাদা ও সম্পদের গুরুত্ব কইমা যায়। সবাই একই আল্লাহর সামনে দাঁড়ায়। এখানে মানুষ ভোক্তা না, বান্দা। সে পণ্য নির্বাচনকারী না, নৈতিক সিদ্ধান্তগ্রহণকারী। সে বাজারের লক্ষ্য না, আল্লাহর আমানত বহনকারী। সালাত মানুষকে ভোগ থেইকা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে না; বরং ভোগকে সীমা, কৃতজ্ঞতা ও জবাবদিহির মধ্যে রাখে।
প্রযুক্তি, মনোযোগ ও সালাত
বর্তমান মানুষ তথ্যের অভাবে না, অতিরিক্ত তথ্যের চাপে বিপর্যস্ত। মোবাইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল সংস্কৃতি মানুষের মনোযোগকে খণ্ডিত কইরা ফেলে। মানুষ একই সঙ্গে বহু বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত, কিন্তু গভীরভাবে কোনো কিছুর সঙ্গেই থাকে না। সালাত মনোযোগের একটি বিপরীত অনুশীলন। এখানে মানুষ ইলেক্ট্রনিক পর্দা থেকে মুখ ফিরায়, গতি কমায়, নির্দিষ্ট দিকে দাঁড়ায় এবং শব্দ, ভাষা, দেহ ও চেতনাকে একই কেন্দ্রে আনতে চেষ্টা করে। সালাতে এই মনোযোগ তাই শুধু আধ্যাত্মিক গুণ না, মনোযোগ-বিভক্ত সভ্যতার বিপরীতে গভীর উপস্থিতির চর্চা। সালাতে মন বারবার সইরা যায়, আবার ফিরাইয়া আনা হয়। এই ফিরা আসা মানুষকে শেখায়- মনোযোগ হারানো মানবিক, কিন্তু কেন্দ্র হারানো অমানবিক।
সালাত ও বিকল্প স্বাধীনতা
আধুনিক সংস্কৃতিতে স্বাধীনতা প্রায়ই বাধাহীন ইচ্ছাপূরণ বোঝানো হয়। আমি যা চাইব, তাই করব- এই ধারণাকে আমরা স্বাধীনতা বলি। কিন্তু মানুষের ইচ্ছা নিজেই যদি বাজার, বিজ্ঞাপন, প্রবৃত্তি ও সামাজিক স্বীকৃতির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তবে সেই স্বাধীনতা কতটা স্বাধীন? সালাত স্বাধীনতার ভিন্ন সংজ্ঞা দেয়।সত্যিকারের স্বাধীনতা হইলো নিজের প্রবৃত্তি, ভয়, লোভ এবং মানুষের প্রশংসার দাসত্ব থেকে মুক্ত হওয়া। আল্লাহর সামনে নত হওয়া মানুষকে অন্য সব মিথ্যা প্রভুত্বের সামনে নত হওয়া থেইকা রক্ষা করে। সিজদা বাহ্যিকভাবে নত হওয়া, কিন্তু অস্তিত্বগতভাবে মুক্ত হওয়ার দরকারী অনুশীলন।
উপসংহার
আধুনিকতা মানুষকে ক্ষমতা দিছে, কিন্তু সবসময় অভিমুখ বা কেন্দ্র দেয় নাই। উত্তর-আধুনিকতা বহু আধিপত্য ভাঙছে, কিন্তু মানুষকে কেন্দ্রহীন করার জোর কোশেশ করে। বাজার মানুষকে পছন্দের স্বাধীনতা দিছে, কিন্তু আকাঙ্ক্ষার দাসও বানাইছে। প্রযুক্তি মানুষকে সংযুক্ত করছে, কিন্তু মনোযোগকে খন্ডিত করছে। সভ্যতা বাহ্যিকভাবে অগ্রসর হইছে, কিন্তু নৈতিকভাবে মানুষকে পিছাইয়া রাখছে। এই সংকটের মধ্যে সালাত মানুষের অস্তিত্বকে আবার বিন্যস্ত করে। এইটা মানুষকে শেখায়- সে স্বাধীন, কিন্তু স্বয়ংসম্পূর্ণ না, সে জ্ঞানী, কিন্তু সর্বজ্ঞ নয়। সে মর্যাদাবান, কিন্তু অহংকারের অধিকারী না। সে পৃথিবীতে সক্রিয়, কিন্তু পৃথিবীই তার চূড়ান্ত গন্তব্য না। সালাত তাই শুধু ধর্মীয় আচরণ নয়, এইটা আধুনিক কেন্দ্রহীনতা, উত্তর-আধুনিক অনিশ্চয়তা, ভোগবাদী সংস্কৃতি ও নৈতিকতাহীন সভ্যতার বিপরীতে একটি পূর্ণাঙ্গ কুরআনিক মানবদর্শন। এখানে মানুষ প্রতিদিন পাঁচবার নিজেকে নতুন কইরা আবিষ্কার করে। ভোক্তা হিসাবে না, ক্ষমতাবান সত্তা হিসেবে না, বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি হিসাবেও না। বরং আল্লাহর বান্দা, নৈতিক সত্তা ও মানবসমাজের দায়িত্বশীল সদস্য হিসাবে।
রেফারেন্সঃ
আল-কুরআন: সূরা আল-ফাতিহা ১:৫–৬; সূরা ত্ব-হা ২০:১৪; সূরা আন-নিসা ৪:১০৩; সূরা আল-আনকাবুত ২৯:৪৫; সূরা আল-মুমিনুন ২৩:১–২; সূরা আল-আলাক ৯৬:১৯; সূরা আল-মাউন ১০৭:১–৭
ইমাম আল-গাজালি, ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন, কিতাবু আসরারিস সালাত
আলিজা ইজেতবেগোভিচ, Islam Between East and West
মুহাম্মদ ইকবাল, The Reconstruction of Religious Thought in Islam
সাইয়্যেদ হোসেইন নাসর, Knowledge and the Sacred; The Heart of Islam
চার্লস টেইলর, A Secular Age
জিগমুন্ট বাউমান, Liquid Modernity
মিশেল ফুকো, Discipline and Punish
মার্টিন হাইডেগার, Being and Time
Leave a comment