সুফি ঘরানার কবি এমিলি ডিকিনসনের জন্ম ১৮৩০ সালে, যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের ছোট্ট শহর অ্যামহার্স্টে। তিনি তখনকার সচ্ছল ও শিক্ষিত এক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। জীবনের অধিকাংশ সময় তিনি নিজের বোনের সঙ্গে প্রায় নিভৃতবাসে কাটায়া দেন, জীবনে কখনো বিয়া করেন নাই। তার দিন ও রাত কাটছে মূলত চিঠি ও কবিতা লেইখা। ছোটবেলায় তিনি Amherst Academy-তে পড়াশোনা করছেন, কিন্তু শারীরিকভাবে দুর্বল থাকায় তাঁর বাবা-মা দীর্ঘ সময় তাকে ঘরেই রাইখা দেন। অল্প বয়স থেইকাই এমিলি লেখালেখি, ভাষা ও রচনাশৈলীতে অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দিছিলো। চেনা জানা শব্দের ভেতর দিয়া তিনি এমন এক ব্যক্তিগত কাব্যভাষা নির্মাণ করেন, যা পরবর্তীকালে ইংরেজি সাহিত্যের অন্যতম স্বতন্ত্র কণ্ঠ হয়ে ওঠে।
ডিকিনসন বড় হইয়া উঠছেন ক্যালভিনবাদী (Calvinism) খ্রিস্টীয় পরিবেশে। এই মতবাদ অনুযায়ী মানুষ জন্মগতভাবেই পাপগ্রস্ত, যিশু খ্রিস্টের প্রতি বিশ্বাসের মাধ্যমেই তার মুক্তি সম্ভব। কিন্তু যৌবনের পরবর্তী সময়ে তিনি এই ধর্মতত্ত্বকে প্রশ্ন করতে শুরু করেন। পরিবারের সবাই যে গির্জার সদস্য ছিলেন, তিনি সেখানে যাইতেন না। তবে তাঁর কবিতায় পরমের সাক্ষাতের জন্য আকুতি, নির্জনতা, আত্মার অমরত্ব, মৃত্যু চিন্তা বারবার ফিরা আসছে যা আমাদেরকে সুফি কবিতার কথা মনে করাইয়া দেয়।
ডিকিনসনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর অন্তর্মুখিতা। তিনি বাইরের পৃথিবীর ঘটনার মাধ্যমে খুব একটা আলোড়িত হন নাই। নিজের অভিজ্ঞতা, স্মৃতি ও অনুভূতিকে কাব্যের বিষয় বানাইছেন। আবার তাঁর কবিতা ব্যক্তিগত হইলেও কখনো আত্মকেন্দ্রিক নয়। কারণ তিনি এমন ভাষায় লেখেন, যেখানে পাঠক নিজের জীবনকেও খুঁজে পায়। যখন তিনি লেখেন ‘The Heart asks for Pleasure- first’ তখন সেইটা শুধু তার হৃদয়ের কথা না, মানুষের অস্তিত্বের এক সার্বজনীন সত্য হয়ে ওঠে।
যৌবনে ডিকিনসন একের পর এক ব্যক্তিগত শোকের মুখোমুখি হইছিলেন- প্রথমে তার বহু ঘনিষ্ঠ বন্ধু মারা যায়, পরে হারান তার বাবা ও মাকে। এইসব মৃত্যু অভিজ্ঞতা তাকে, নিঃসঙ্গ ও নির্জনতাপ্রিয় কইরা তোলে। জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি প্রায় সম্পূর্ণভাবে জনজীবন থেকে সইরা আড়ালে চইলা গেছিলেন। এমনকি শেষ তিন বছর তিনি বাইরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ প্রায় বন্ধ কইরা দেন। ১৮৮৬ সালে মাত্র ৫৫ বছর বয়সে স্ট্রোকে তাঁর মৃত্যু হয়।
জীবদ্দশায় ডিকিনসনের মাত্র দশটি কবিতা প্রকাশিত হইছিল, তাও অধিকাংশই নাম ছাড়া। এইগুলি প্রকাশ করার ইচ্ছা তার ছিল কি না, সে বিষয়ে কোনো নিশ্চিত প্রমাণ নাই। মৃত্যুর পর তাঁর বোন লাভিনিয়া প্রায় ১,৮০০টি কবিতা আবিষ্কার করেন। এইগুলি ছোট ছোট, হাতে সেলাই করা পাণ্ডুলিপিতে অত্যন্ত যত্নে সংরক্ষিত ছিল। এইটাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জন্মায়- তিনি কি ইচ্ছাকৃতভাবে মৃত্যুর পর প্রকাশের জন্য এগুলি রাইখা গেছেন? তার নিশ্চিত উত্তর নাই। তবে তিনি শুধু লেখেন নাই, সম্পাদনা করছেন, বিকল্প সমাপ্তি লিখছেন, শব্দ পরিবর্তন করছেন, স্তবক পুনর্গঠন করছেন। অর্থাৎ তিনি নিজের কাজকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করছিলেন বইলা মনে হয়। ১৮৯০ সালে Poems by Emily Dickinson গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় মেবেল লুমিস টড-এর সম্পাদনায়।
তার কবিতায় প্রায়ই চার লাইনের স্তবক ব্যবহার করতে দেখা যায়, যার উৎস খ্রিস্টীয় স্তোত্র ও গীতসংহিতা। কিন্তু সেই পরিচিত কাঠামোর ভেতর তিনি সৃষ্টি করেন সম্পূর্ণ নতুন ধরণের কবিতা। তার বৈশিষ্ট্যগুলা হইলোঃ ড্যাশ (-) দিয়া চিন্তার বিরতি, অসম্পূর্ণ বাক্য, অপ্রত্যাশিত বড় হাতের অক্ষর, স্বল্প শব্দে বহুস্তর অর্থ। তিনি যেন ভাষাকে প্রসারিত করেন না, সংকুচিত করেন। কয়েকটি শব্দের ভেতর সম্পূর্ণ দার্শনিক অভিজ্ঞতা ধরে ফেলেন। যেন এ সময়ের উত্তর আধুনিক কবিতা।
ডিকিনসনের কবিতার সবচেয়ে প্রিয় বিষয়- মৃত্যু। কিন্তু তাঁর মৃত্যু-ভাবনা সিলিভিয়া প্লাথের ট্র্যাজেডির মত না। তিনি মৃত্যুকে অস্তিত্বের এক রহস্য হিসেবে দেখেন। ‘I felt a Funeral, in my Brain’ কবিতায় জানাজা আসলে মস্তিষ্কের ভেতরে ঘটে। শোকযাত্রা মানসিক ভাঙনের রূপক হয়ে যায়। আবার ‘Because I could not stop for Death’-এ কবরকে তিনি বাড়ি বইলা আখ্যায়িত করেন, অর্থাৎ মৃত্যু যেন এক নতুন আবাস, ধ্বংস নয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি তাকে পাশ্চাত্যের বহু কবির চেয়ে আলাদা কইরা ফেলছে।
উনবিংশ শতকের আমেরিকান কবিতা মূলত দুইটি বড় ধারায় প্রবাহিত হইছিলো- একদিকে ওয়াল্ট হুইটম্যান, অন্যদিকে এমিলি ডিকিনসন। হুইটম্যানের কবিতা বড়, মুক্তছন্দে লেখা। এমিলির কবিতা সংক্ষিপ্ত ও ঘনীভূত। হুইটম্যানের কবিতা যেখানে জনতা ও গণতন্ত্র নিয়া ব্যস্ত সেখানে এমিলির কবিতা আত্মা ও অন্তর্জগৎ নিয়া শান্ত ও অন্তর্মুখী ধ্যান যেন। হুইটম্যান যেখানে আমেরিকার রাস্তা, শ্রমিক, নদী ও গণতন্ত্রের কবি, ডিকিনসন সেখানে মানুষের নিঃশব্দ হৃদয়ের কবি। একজন ভাষাকে বিস্তার দেন, অন্যজন ভাষাকে সংকোচন করে গভীরতা সৃষ্টি করেন। এমিলির জীবনের সবচেয়ে বড় বিস্ময় সম্ভবত এইটাই- যে নারী জীবদ্দশায় প্রায় অপ্রকাশিত ছিলেন, তিনিই মৃত্যুর পর বিশ্বসাহিত্যের সবচেয়ে জীবন্ত কণ্ঠগুলোর একজন হয়ে উঠলেন।
বিশ শতকের আধুনিক কবি সিলভিয়া প্লাথ ও অ্যান সেক্সটন যখন নারীর মানসিক যন্ত্রণা, বিষণ্নতা, আত্মপরিচয় ও মৃত্যুচেতনা নিয়ে লেখেন, তখন সমালোচকেরা প্রায়ই তাঁদের শিকড় খুঁজতে গিয়া এমিলি ডিকিনসনের নাম উচ্চারণ করেন। সত্য ডিকিনসন সেই দরজাটি প্রথম খুইলা দিছিলেন, যেখানে কবিতা মানুষের অন্তর্জগতের সবচেয়ে গোপন কণ্ঠস্বর হইয়া উঠছিলো। কিন্তু তাদের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য আছে।
প্লাথ ও সেক্সটনের কবিতার আত্মা মানসিক বিকার বা যন্ত্রণায় প্রায়ই ভেঙে পড়ে। তাদের ব্যক্তিগত কষ্ট, ক্ষোভ ও আত্মবিনাশের আকাঙ্ক্ষা ভাষার কেন্দ্রে আইসা দাঁড়ায়। ডিকিনসনও মৃত্যু, শোক ও নিঃসঙ্গতা নিয়া লেখছেন, কিন্তু তিনি কখনো নৈরাশ্যে বা হতাশার কবি ছিলেন না। তার কবিতায় অন্ধকার আছে, তবে সেই অন্ধকারের ভেতরও আশার পাখি, অনন্তের সম্ভাবনা, প্রকৃতির নীরব সৌন্দর্য, মানুষের আত্মিক মর্যাদা ও পরমের ওপর ভরসা থাকে।
নিচে পাঠকদের জন্য এমিলি ডিকিনসনের পাঁচটি কবিতার অনুবাদ/ভাবানুবাদ রাখা হইলঃ
আমার জীবন ছিল এক ভরা বন্দুক
আমার জীবন ছিল এক ভরা বন্দুক,
ঘরের কোণে নীরবে পড়ে,
একদিন মালিক এসে আমাকে চিনল,
তারপর তুলে নিল সঙ্গে করে।
এখন আমরা ঘুরি স্বাধীন বনের ভেতর,
হরিণের পিছু ধাওয়া করি দুইজনে
আমি যখন তার ভাষায় উচ্চারণ করি,
পাহাড় সঙ্গে সঙ্গে প্রতিধ্বনি করে।
আমি যখন হাসি- এমন আন্তরিক আলো
উপত্যকার বুক জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে,
যেন ভিসুভিয়াসের অগ্নিমুখ হঠাৎ
নিজের আনন্দ উগরে দিলো।
রাত নেমে এলে দিনের সব কাজ শেষে,
আমি পাহারা দিই আমার প্রভুর শিয়র,
রাজহাঁসের কোমল পালকের বালিশের চেয়েও
এই প্রহর আমার কাছে অধিক প্রিয়।
যে তাঁর দুশমন, আমিও তার মরণ-দুশমন।
দ্বিতীয়বার আর কেউ নড়ে না-
যার দিকে আমি ছুঁড়ে দিই হলুদ চোখের দৃষ্টি
অথবা আমার দৃঢ় বৃদ্ধাঙ্গুলি।
হয়তো আমার আয়ু তার চেয়ে দীর্ঘ,
তবু বেঁচে থাকতে হবে তাকেই আমার আগে,
কারণ আমার আছে শুধু হত্যা করার ক্ষমতা
মরে যাবার ক্ষমতা নাই কোনো।
আমার মাথার ভেতর এক জানাজা
মনে হলো- আমার মাথার ভেতর জানাজা চলছে।
শোকাতুর মানুষেরা এদিক ওদিক যাওয়া আসা করে,
ওরা এমন ভাবে হাঁটাহাঁটি করে অবিরাম- যেন
আমার বোধের দেয়াল ক্রমশ ভেঙে পড়ছে ।
সবাই যখন নিজেদের আসনে স্থির হয়ে বসল,
তখন প্রার্থনার শব্দ- যেন কোনো ঢাকের মতো
বেজে চলল বেজেই চলল, যতক্ষণ না আমার মনে হলো
আমার হৃদয় একদম অবশ হয়ে পড়ছে।
এরপর শুনলাম তারা এক কফিন তুলছে জড়ো হয়ে
যেন ধীরে টেনে নিয়ে গেল আমার আত্মার ওপর দিয়ে,
আর সীসার মত ভারী বুটের শব্দ আবার ফিরে এলো
তখন সমগ্র মহাশূন্য শোকঘণ্টার মতো বেজে উঠলো ।
মনে হলো সমস্ত আকাশ এক বিশাল ঘণ্টা,
আর অস্তিত্ব যেন কেবল এক জোড়া শ্রবণ।
আমি আর নীরবতা এক অদ্ভূত প্রজাতি
ভগ্ন, নিঃসঙ্গ, এইখানে পড়ে আছি পরিত্যক্ত।
হঠাৎ যুক্তির সাঁকোর একটি তক্তা ভেঙে গেল,
আর আমি পড়তে লাগলাম- নিচে, আরও নিচে
প্রতিটি পতনে স্পর্শ করলাম এক একটি পৃথিবী,
তারপর জেনে ওঠার সব ক্ষমতা শেষ হয়ে গেলো।
আশা’ হলো পালকওয়ালা সেই ছোট্ট পাখি
‘আশা’ হলো পালকওয়ালা সেই ছোট্ট পাখি,
যে মানুষের আত্মার ডালে আইসা বসে
কোনো শব্দ ছাড়াই একটানা গান গায়,
আর কখনোই থামে না।
ঝড়ের ভেতরই তার গান সবচেয়ে সুন্দর!
তাই ঝড়কে হতে হয় ভীষণ নির্মম,
যদি সে থামাতে চায় সেই ছোট্ট পাখিটাকে
যে অগণিত হৃদয়কে রেখেছে উষ্ণ ।
আমি তার গান শুনছি সবচেয়ে শীতল ভূখণ্ডে,
সবচেয়ে অচেনা সমুদ্রের বুকেও।
তবু সবচেয়ে চরম দুর্দিনেও
সে আমার কাছে চায় নাই এক টুকরো রুটি ।
যেহেতু আমি মৃত্যুর জন্য থামতে পারিনি
যেহেতু আমি মৃত্যুর জন্য থামতে পারিনি,
মৃত্যুই দয়া করে থেমেছিল আমার কাছে
গাড়িটিতে ছিলাম শুধু আমরা দুইজন
আর আমাদের সঙ্গী ছিল সেই অবিনশ্বর।
আমরা ধীরে চলছিলাম, তার কোনো তাড়া ছিল না
আমিও ফেলে এসেছিলাম
আমার শ্রম, আমার অবসর
সবকিছু, তার আমন্ত্রণের প্রীতি রেখে।
আমরা পেরিয়ে গেলাম সেই বিদ্যালয়,
যেখানে শিশুরা বিরতির খেলায় মগ্ন,
পেরিয়ে গেলাম দুলতে থাকা শস্যক্ষেত,
পেরিয়ে গেলাম অস্তগামী সূর্য।
অথবা বলা ভালো সূর্যই আমাদের পেরিয়ে গেল
শিশির কাঁপতে কাঁপতে নেমে এলো শীতল হয়ে।
আমার গায়ে ছিল শুধু মাকড়সার জালের মতো পাতলা পোশাক,
আর কাঁধে ছিল কেবল স্বচ্ছ টিউলের ওড়না।
আমরা থামলাম এক ঘরের সামনে
যা দেখে মনে হলো- মাটির বুকের সামান্য উঁচু ঢিবি
ছাদ প্রায় চোখেই পড়ে না,
কার্নিশও ডুবে আছে মাটির ভেতর।
তারপর থেকে কেটে গেছে শত শত বছর
তবু মনে হয়, সেদিনের সেই যাত্রার চেয়েও ছোট!
যেদিন প্রথম বুঝেছিলাম-
ঘোড়াগুলোর মাথা ঘুরে আছে অনন্তের দিকে।
আমি কেউ না! তুমি কে?
আমি কেউ না! তুমি কে?
তুমিও কি কেউ না?
তাহলে তো আমরা দুইজন হলাম এক !
কাউকে বলো না- ওরা ঢাকঢোল পিটিয়ে জানিয়ে দেবে!
কী ক্লান্তিকর ‘কেউ একজন’ হয়ে থাকা!
প্রকাশ্য ব্যাঙের মতো!
সারাটা জুন মাস জুড়ে
মুগ্ধ জলাভূমির সামনে
নিজের নামই শুধু ডেকে যাওয়া!
তথ্যসূত্রঃ
Emily Dickinson, The Poems of Emily Dickinson, ed. R. W. Franklin (Harvard University Press, 1998).
Richard B. Sewall, The Life of Emily Dickinson (Harvard University Press, 1974).
Leave a comment