Current date August 23, 2026
কবিতাকাব্যগ্রন্থ

‘মায়া কমলাপুর’ থেকে কয়েকটি কবিতা

URL copied
মায়াকমলাপুর
Share URL copied

ভবিষ্যৎ কবিতার সম্ভাবনাগুলি

একটি পাতা থেকে

আর একটি পাতায় যেতে যেতে

লাল পিপড়া থেমে গেলো

বন্দুকের খোঁজে।

ভোর হতে অনেক রাত বাকী।

গাছের ভেতর ঘুমিয়ে পড়া পাখিগুলি

মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে বিস্ময়ে।

যেমন রক্তমাখা দুলদুল পড়ে থাকে

                   কারবালার ঘাসে।

*

গোলাপের লাল থেকে

আর একটি গোলাপ বড় হতে থাকে।

বিছানায় তখনো আপেলকাটা লালের প্রতিমা।

আস্তে আস্তে কীভাবে এসব কাটা আর খাঁজে

প্রাগতৈহাসিক পোকা ঢুকে পড়ছে-

ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ছে রাতের সহিস।

এক সময় তাঁবু ও তাতার অবষন্ন।

একটি ধাত্রিসন্ধ্যা দোল খায়

             দুই লালের মাঝখানে।

*

দূর থেকে তাকিয়ে থাকে

পিঞ্জর ও পারাবত।

কীভাবে কবিতা হয়? কীভাবে গুপ্তভাষা

ভাষার লেগুন পায়চারি করে

পাগলের পাগড়িতে!

তখন সন্ধ্যাবিলে টহল মারে

টাকি ও দারকিনা!

শিকার আর শিকারির মাঝখানে

এ কী সখ্য হয়, মাবুদ তুমি বলো!

যেমন পারস্যপথে অবাক হয়

              সোহরাব ও রুস্তম। 

*

কবরখানার পাশ দিয়ে মসজিদে যাই।

এই হলো দুধসাদা পায়রাদের রাস্তা।

পাশ দিয়ে শান্ত হাসকিসান বিচের দরবার।

মাঝখানে ঢেউ ওঠে আর

গোত্তা মারে সীগাল।

আযান কি শুনেছি ব্লুগামের মাথায়?

শীত পরে গাছের বল্কল।

হাই আলাস সালাহ- হাই আলাল ফালাহ

কী নেশায় ঘুমিয়ে পড়ে ফুল ও ভোমর! 

হাতের দস্তানা ক্রমশ পাখি হয়ে যায়।

*

জাগিয়ে দিয়েছি রৌদ্র

মোরগ ডাকার আগে।

যেন আলাদিনের চেরাগ

ঝলসে উঠবে দরবেশ ও শয়তান।

এমন সময় বাহাদুরাবাদের ট্রেন ভিজিয়ে দেয়

আম্মার বুটিকের শাড়ি।

কলতলায় আগুন জ্বলছে

মেয়েরা রুটি ভাজছে হাজার বছর।

কেউ আর সংবাদ নিয়ে আসছে না-

পথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে শুক্রবারে।

*

আমাকে অমর করো!

যেভাবে গোপন গ্রীবা, ঠোঁট আর লজ্জাস্থান

পাগল করে তোলে, সেভাবে গান তোলো।

যুদ্ধের জায়গা আর একটাও বাকী নেই।

এখন সবই তোমার শরীরের গন্ধ।

সবই তোমার নাভিতে নীল সরোবর।

তোমার বুকের দিকে তাকিয়ে ফসল ওঠে,

কৃষকেরা বেহালা বাজায়

ঘরে ঘরে শান্তি আসে।

আমি আর ঘোড়া দৌড়াতে চাই না

      পানিপথ আর পলাশীর পথে!

মায়ের মুখ

কোথাও একটা রৌদ্র পড়ে আছে

মায়ের মুখের মতো।

ব্রিজ ভেঙ্গে পাখি তো উড়ল।

হাত থেকে সরে গেল গলিপথের বাবলা।

হাতি চলে, হাতি চলে

সমস্ত পাড়া গাঁ সিরাজ হয়ে যাওয়ার গান।

দেখি কোলাকুলি করছে কলকাতার ঝাউগুলো।

নিচে নেমে যায় হালকা চালের গীতিময় সন্ধ্যা।

বাড়িতে এলেই- বাবা তুই ভাত খাবি?

অপেক্ষার ছায়াগুলো গোলাপ গাছের চারা।

ভাত ভাড়া, কাপড় ধোয়া- এরকম স্নেহগুলো

কবরের ধারে শিউলি ফুলের ঘ্রাণ।

দূরে যাওয়া তো দূরে যাওয়াই

মাশরুম ফোটে মেরুন শীতের গ্রামে।

সাদা শান্তি- সন্ধ্যাতারার শাড়িটা। 

আমি তো লম্বা একটা সিরাজ ছাড়িয়ে

আমবাগানের রক্ত নিয়ে নিদ্রায় উঠে পড়েছি।

তোমরা দ্বিতীয় কোনো পলাশী করো! 

রহস্যদুপুর

মেরিমবুলা নামের সমুদ্র উপকূলে এসে ডলফিন আর তিমি মাছের লাফালাফি দেখি। এই রৌদ্র এই বৃষ্টি, এমন রহস্যদুপুরে, জাহাজের পাশ দিয়ে চলে গেছে লম্বা এক পাহাড়ি জল-পাইন। দূরে সী-গালের উড়াল, পালকের নিচে ঢুকে পড়ছে রুপালি সারডিনের মুখ। আমি ভাবি এমন জলবাংলায়, রাতারগুল হলে ভালো হতো। অথবা ঘুমের মাঝে মেরিমবুলাকে আজ রাতারগুল বলে ডেকে তুলছি। সাগর লাফানোর আর কোনো বিকাল নেই কোনোখানে। দরোজা খোলা হলে শীতের সন্ধ্যায় মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে যুদ্ধ থামানোর গল্প করি। দেখছি সীমান্তে কাঁটাতারে- পাখির মত ঝুলে আছে কন্যা ফেলানি!  ভুমিযুদ্ধ শেষ, পিতৃহত্যার স্মৃতি নিয়ে রিফিউজি ক্যাম্পে উঠে গেছে ফিলিস্তিনের এক ইয়াতিম বালিকা। মেরিমবুলায় সেই রক্ত নেই। শধু তিমি মাছের শরীর ধরে উঠে গেছে হা হা করা সাদা যুবতীদের নীল চোখ।

হাশর

আমিও হঠাৎ উড়ে পড়ব সীমান্তে। তপ্ত বালিসৌধে
গুলিবিদ্ধ ডানা আর রক্তচক্ষু উজাড় করে দেখবো
গুটি পোকার মতোন মানুষের ঢল, খাঁ খাঁ বায়ুস্বর,
আত্মভোলা, মূর্তি-সেবীদের ঘুর্ণিনৃত্য, অগ্নিঘর । 
দেখবো আকাশ চূর্ণ হয়ে পড়ছে অবাক লোকালয়ে!
যেন কার্পাসের ফুল, মাথায় রোদের ছুরি- জল,পানি দূর।
তখন একাকী নিরিবিলি তোমার পাগল দুটি চোখ,
হে গভীর বনভূমি থেকে ডানা ঝাপটিয়ে আসা
বিস্ময় সুন্দর!  আমাকে কি চোখ তুলে দেখবে না?
যখন সন্তান চিনবে না তার মাতা ও পিতাকে,
বোন চিনবে না ভাইকে। যখন সারি সারি
আগুনের ড্রাগনকলাম  দাউ দাউ
গলা পর্যন্ত উঠবে।
বালকেরা বুড়ো হয়ে যাবে ক্রমাগত,
চারদিকে মানুষের কলরব বাঁচাও, বাঁচাও।
সূর্য গিলে খাবে মস্তকের টাটকা গোলাপ।
তুমি কি তাকাবে না আমার দিকে?
ভাবিয়ে দেবে না এক বৃষ্টি পড়া রাতের করবীগান?
একটা ডালিম গাছবেয়ে নেমে আসা ত্রস্ত গিরগিটি।
জাগিয়ে দেবে না- নিঝুম পাতালের ঘুম ভেঙে
গলাগলি করে থাকা দুটি হতভম্ব মাছরাঙা পাখি?

কিছু জন্ম

রৌদ্র ও ভাষার কলি। দিকে দিকে ছু, চম্পা
ঝরাপাতা, হাওয়ার করতালি।
দেখি আলোর বাজনা, রূহ মাতম, শান্ত মৌ কেরেদানি।
রবাহুত ডেকেছো কি অপরূপ গুচ্ছ জামরুল, বাদামে?
আমার আজ উড়াল হলো দ্বীপদেশ, দরগাখানায়।
ফুল ঝরছে, পাখি নাচছে, দল ছল পিপড়ার বাজিখানা আড়ালে।
দেখছি আপেলফুল তুষার কলমে
দেখছি মাছসেনাদের সাঁতার সমুদ্র-তাঁবুতে।
পা পড়ছে, গ্রীবা দুলছে, নাভি কাঁপছে বালিসোনা, স্বর্ণ দেয়ালে।
মিরাজ তুমি বলো, কোলাজ তুমি বলো
বলো স্বপ্নতন্দুর, লাল জন্ম আগুনের।
আমি শান্ত কবিতাখনি ফুটছি রৌদ্র ছায়া, করবী, গোলাপে।

মায়া কমলাপুর

আমিরগঞ্জ আসলেই মায়ের বাড়ির ছাদ।
আহা! মা কি এখনো নীল জামা পরে
আর বাবলাগাছে পাখি ধরে?
তখনো দুপুর,
একটা ট্রেন বুকের কাছে বেথেলহেমের গির্জাধ্বনি।
সকাল হয় হয় আর শীতের মালভূমি ধরে
ফিরে আসে তন্দ্রাগ্রস্ত ভেড়াদের রাখাল।
কুয়াশার ভেতর বাবার মুখটাও গোল মেঘের মিনার,
ট্রেনের ছায়া, গাছের ছায়া- মায়ের উড়াল-শাড়ির মতো।
কোথাও রুটির বাজনা হলে তূর্ণা নিশীথা করে
আমরা কত কসবার দিকে ছুটে গেছি!
আহা, মুখের কাছে বেতফলের ধারণা
তখনো জীবনানন্দ একাকি ঘুমায় বরিশালে!
আর পাখিপালক জুবায়ের, তুমি বলছো-
ট্রেন একটা উড়ন্ত ডাকঘর, যেখানে
শধু অপেরা-পাখিদের চিঠি বিনিময় হয়!
আমার চোখের ভেতর একটা কমলাপুর থাকে
যাকে মায়ের কবরে রেখে দিয়ে এসেছি-
১৯৯৯ সালে।

শীতজামালের ফল

শীতজামালের ফল, তুমি জাগো।
তোমার ভেতর খেলা করে লাল রেশমের বল
আমি দৌড়ে চলি, এদিক ওদিক উঁকি মারি
আমাকে সাজাও লোহার জ্যাকেট পরাও।
আলহামদুলিল্লাহ, মালিক
আমার শরীর খাড়া তোলোয়ার
যেদিকে তাকাই সেখানেই দেশ বানিয়ে বেড়াই।
আগুন নদীর ঘ্রাণ নিয়ে বাঁচি
আমার কলিজা লাল গোলাপের শান।
আলহামদুলিল্লাহ, মালিক
আমি চোখ দিয়ে অপলক দেখি
রূপের মহিমা দূর কারিশমা- বনলতা সেন।
পেরিয়ে এসেছি খোদাহীন সেনাদের দল
তাদের মরণ কামড়- শরীরে রক্ত অচল
যেন আমাজন অজগর খায় আমাকে উজার!
আমি পড়ি দ্রুত জীবিত আয়াত অবিচল
আমার ভেতর খালিদ-মহিমা জাগে পরিচয়।
শীতজামালের ফল, তুমি জাগো
তোমার ভেতর খেলা করে লাখো গোলাপের কল
আমি রূপ আর গন্ধ মাতাল, মজনু পাগল।

ভাষার বাগানে

ভাষার বাগানে মরে যাই
যেন গোপন শহীদ আমি যুদ্ধ সীমানায়।
কুটিল কার্তুজ জমে কবিতার কাঁটাতারে
ঘেরাও করেছে কুম্ভজল- কৃত্তিবাস।
দৌড়ে আসে আর্যরাজ, পাল, সেন সেনাবাজ
যেন আমি-জন্মঅন্ধ প্রসবিত হয়েছি গোয়ালে
চৈতন্য কুটিলে কাঁদে মানুষের জাতপাত।  
আমার নিখোঁজ পাখি খুঁজে ফেরে ডানার ম্যাজিক।
জান তড়পায়। যা পাই তা নাই, শব্দ লুপ্তকারাগার।
নিজেকে হারিয়ে মিথ্যা মায়ার উড়াল!
এসেছে কী দূত-খলিফা? লণ্ঠন কি জ্বলে সারারাত?
আমাকে কি দেবে পথ- অশ্বারোহী, কামিল সহিস?
জানি আলো-অন্ধকার, করাত কলের
বাজু নড়ে দিনরাত।
ভাষার সন্তান মরে গেছে- রক্ততাম্রলিপি,
নতুন অতিথি জাগে, গন্ধ-হিজাজের দান।
জ্বালিয়ে রেখেছি গুপ্ত পতাকাকামিন
যেন ফুল ফোটে পাথরের বুকে
মন সদা ফানা ফিল্লা, নাচে মধুর আয়াত।
সীমানা পেরিয়ে যাই নীল নদ কেটে
শুনেছি ফেরার ডাক কান পেতে হৃদয় গহীনে
দূরে পড়ে থাকে অভিশপ্ত ফেরাউন, রামেসাস!


প্রথম প্রকাশঃ বইমেলা ২০২৪
প্রকাশকঃ ঘাসফুল
প্রাপ্তিস্থানঃ ঘাসফুল ফেসবুক পেইজ
ফোনঃ ০১৭২৯- ৬৮ ০৯ ০৮,
০১৮৭৪- ২৩ ৮৩ ৫২
রকমারি ডট কম

Share URL copied

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট

Related Articles

‘কবির নামাজ’ থেকে কয়েকটি কবিতা

হাওয়া ও হাওয়া আরো ক্ষীপ্র গতির বাহন হও, তুমি বায়জিদ বোস্তামীর আলখেল্লার...

আমার তৃতীয় কবিতার বই ‘পলাশী ও পানিপথ (২০০৯)’

আমার তৃতীয় কবিতার বই ‘পলাশী ও পানিপথ (২০০৯)’ আমার তৃতীয় কবিতার বই...

সরলতা ও অন্যান্য কবিতা

আমার পঞ্চম কবিতার বই ‘শাদা সন্ত মেঘদল’ বার হইছিল বইমেলা ২০১১ সালে।...

ঘুম ভাঙ্গার পর

পিঞ্জর। এইসব পাখিবন্দী শিকল খুলে দিয়েছি। যে তা- সে তাই হোক। মনের...