Current date August 23, 2026
ভাষা, সংস্কৃতি, পরিচয় রাজনীতি

বাংলা সাহিত্য ও ঔপনিবেশিক আধুনিকতা: রুচি, ভাষা ও ক্ষমতার প্রশ্ন

URL copied
Share URL copied

বাংলা সাহিত্যের প্রচলিত ইতিহাস পড়লে মনে হইতে পারে , বাংলা সাহিত্য উনিশ শতকের কলকাতায় আইসা হঠাৎ আধুনিক হইছে। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ, ইংরেজি শিক্ষা, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ- এই ধারাটাই যেন বাংলা সাহিত্যের মূল ইতিহাস। এর আগের পুঁথি সাহিত্য, সুফি কাব্য, নবী-রাসুলের কাহিনি, আরবি-ফারসি প্রভাবিত বাংলা, আরাকান রাজসভার সাহিত্য আর পূর্ববাংলার মুসলিম কবিদের রচনা যেন মূলধারার বাইরের কোনো বিশেষ অধ্যায়। এই ইতিহাস অসম্পূর্ণ। কারণ মুসলিম কবি-সাহিত্যিকেরা বাংলা সাহিত্যের অতিথি ছিলেন না; তাঁরা বাংলা ভাষার অন্যতম নির্মাতা ছিলেন। শাহ মুহাম্মদ সগীরের ইউসুফ-জুলেখা, সৈয়দ সুলতানের নবীবংশ, দৌলত কাজীর সতীময়না ও লোরচন্দ্রানী, আলাওলের পদ্মাবতী, মুহাম্মদ খানের মক্তুল হোসেন এবং আবদুল হাকিমের কবিতা বাংলা ভাষারে প্রেম, আধ্যাত্মিকতা, নবুয়তি ইতিহাস, কারবালার ট্র্যাজেডি, ন্যায়, নৈতিকতা ও বৃহত্তর ইসলামি-পারসিক সাহিত্যজগতের সঙ্গে যুক্ত করছে।

কিন্তু ঔপনিবেশিক আধুনিকতা শুধু নতুন সাহিত্যিক রূপ আনে নাই; নতুন সাহিত্যিক শ্রেণিবিন্যাসও তৈরি করছে। উপন্যাস, প্রবন্ধ, সনেট, ব্যক্তিকেন্দ্রিক কবিতা ও ইউরোপীয় বাস্তববাদ “আধুনিক সাহিত্য” হইল। অন্যদিকে পুঁথি, কিসসা, জঙ্গনামা, মারসিয়া, হামদ-নাত ও সুফি আখ্যানরে “ধর্মীয়”, “গ্রামীণ”, “মুসলমানি” বা “নিম্নরুচির” সাহিত্য বলা হইল। এইখানেই ক্ষমতার প্রশ্ন আসে। কোন সাহিত্য “বাংলা সাহিত্য” আর কোনটা “মুসলমানি সাহিত্য”—এই নামকরণ নিরপেক্ষ ছিল না। বৈষ্ণব পদাবলী বাংলা সাহিত্য, কিন্তু নবীবংশ মুসলিম সাহিত্য; সংস্কৃতঘেঁষা ভাষা শুদ্ধ বাংলা, কিন্তু আরবি-ফারসি শব্দবহুল ভাষা মুসলমানি বাংলা—এই দ্বৈত মানদণ্ড মুসলমানের সাহিত্যিক নাগরিকত্ব সংকুচিত করছে।

পিয়েরে বুর্দিয়ুর ভাষায়, যেই শ্রেণির হাতে সাংস্কৃতিক পুঁজি থাকে, তাদের রুচিই পরে সার্বজনীন রুচি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ঔপনিবেশিক বাংলায় স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, ছাপাখানা, সাহিত্যসভা, পত্রিকা ও প্রকাশনার ক্ষমতা মূলত কলকাতার শিক্ষিত উচ্চবর্ণীয় ভদ্রলোক সমাজের হাতে আছিল। ফলে তাদের ভাষা, ইতিহাস, নন্দনতত্ত্ব ও সামাজিক অভিজ্ঞতাই “বাঙালির” সাধারণ অভিজ্ঞতা হিসাবে প্রতিষ্ঠা পায়। এই প্রান্তিকীকরণের প্রথম দায় ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র ও তার অসম শিক্ষাব্যবস্থার। ম্যাকলের ইংরেজি শিক্ষা এমন এক মধ্যবর্তী শ্রেণি তৈরি করছে, যারা ঔপনিবেশিক জ্ঞান ও স্থানীয় সমাজের মধ্যে সেতু হইবে। কিন্তু এই শিক্ষায় প্রবেশ সবার জন্য সমান ছিল না। কলকাতার উচ্চবর্ণীয় হিন্দু ভদ্রলোকেরা আগেই শিক্ষা, চাকরি, মুদ্রণ ও সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠানে ঢুকছেন; পূর্ববঙ্গের গ্রামনির্ভর মুসলিম জনগোষ্ঠী তুলনামূলকভাবে পিছনে থাকছে।

ফোর্ট উইলিয়াম কলেজকেন্দ্রিক গদ্য নির্মাণেও মুসলমান পণ্ডিত ও পুঁথি-ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব কম ছিল। উইলিয়াম কেরি, মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার, রামরাম বসু এবং পরে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মাধ্যমে যে সংস্কৃতঘেঁষা গদ্য প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা পাইল, তার ভিতরে পূর্ববঙ্গের মুসলিম সমাজের জীবিত শব্দভাণ্ডার পূর্ণ জায়গা পায় নাই। বিদ্যাসাগররে মুসলমানবিরোধী বলা ঠিক না; কিন্তু তাঁর ভাষার প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব “শুদ্ধ বাংলা”র এমন একটা মানদণ্ড তৈরি করছে, যেইখানে আরবি-ফারসি শব্দ ও মুসলিম সামাজিক অভিজ্ঞতা গৌণ হইছে।

কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্রের দায় সবচেয়ে প্রত্যক্ষ। বাংলা উপন্যাস ও গদ্যে তাঁর অবদান মৌলিক, কিন্তু তাঁর জাতীয়তাবাদী কল্পনায় বাঙালির ইতিহাস প্রায়ই হিন্দু অতীত, হিন্দু ধর্মীয় প্রতীক এবং মুসলিম শাসনের বিরোধিতার ভিতরে নির্মিত। আনন্দমঠ, রাজসিংহ, সীতারাম কিংবা বন্দে মাতরম্-এর কল্পনায় মাতৃভূমি হিন্দু দেবীমূর্তি; মুসলমান বহু ক্ষেত্রে জাতির সমান অংশীদার না হইয়া ঐতিহাসিক “অপর”। রাজনারায়ণ বসু, নবগোপাল মিত্র ও হিন্দু মেলাকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবীরাও হিন্দু-আর্য অতীতরে বাঙালি জাতিসত্তার প্রধান উৎস হিসাবে প্রতিষ্ঠা করছেন। তাঁদের উদ্দেশ্য ঔপনিবেশিক শাসনের সামনে আত্মমর্যাদা পুনর্গঠন হইলেও, যখন এই হিন্দু পুনর্জাগরণরে সমগ্র বাঙালির জাগরণ বলা হইল, তখন মুসলমানের ইতিহাস, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক স্মৃতি প্রান্তে সইরা গেল।

রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে বিচারটা আলাদা। তাঁরে বঙ্কিমের মতো মুসলমানবিরোধী বলা যাবে না। তিনি সাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদের সমালোচনা করছেন এবং মুসলিম লেখকদের সঙ্গেও সম্পর্ক রাখছেন। কিন্তু পরবর্তী রবীন্দ্রকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী তাঁরে প্রায় সমগ্র বাঙালি সংস্কৃতির একক মানদণ্ড বানাইছে। ফলে ইসলামি সাহিত্য, পুঁথি, মারসিয়া, হামদ-নাত, মুসলিম লোকঐতিহ্য এবং নজরুলের ইসলামি সৃষ্টির বড় অংশ দ্বিতীয় সারিতে গেছে। প্রমথ চৌধুরী সাধুভাষার কৃত্রিমতা ভাঙছেন, কিন্তু যে চলিত ভাষা মান্য হইল, সেইটাও মূলত পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষিত সমাজের ভাষা। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ও সুকুমার সেন মুসলিম ভাষা ও সাহিত্যরে নথিবদ্ধ করলেও “মুসলমানি বাংলা” বা আলাদা মুসলিম সাহিত্যধারার শ্রেণিবিন্যাস পুরাপুরি ভাঙতে পারেন নাই। ফলে মুসলমানের ভাষা বাংলা ভাষার স্বাভাবিক বহুত্ব না হইয়া বিশেষ সম্প্রদায়ের ভাষা হিসাবে থেকে গেল।

প্রান্তিকীকরণের সবচেয়ে শক্তিশালী কৌশল ছিল মুসলিম কবিদের সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া না; তাদের আলাদা খোপে রাখা। তাঁরা বাংলা সাহিত্যিক না, মুসলিম সাহিত্যিক; তাঁদের প্রেমকাহিনি মানবিক সাহিত্য না, ধর্মীয় কাহিনি; তাঁদের কারবালা ট্র্যাজেডি সার্বজনীন না, সাম্প্রদায়িক; তাঁদের ইসলামি দর্শন বৌদ্ধিকতা না, ওয়াজ। অথচ গ্রিক পুরাণ, বাইবেলীয় প্রতীক, মার্ক্সবাদ, ফ্রয়েড বা অস্তিত্ববাদ সহজেই “বিশ্বজনীন” ও “আধুনিক” হিসাবে গ্রহণযোগ্য হইছে।নজরুলের ক্ষেত্রেও এই নির্বাচিত গ্রহণ দেখা যায়। তাঁর বিদ্রোহ, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িকতার কথা বলা হয়; কিন্তু তাঁর হামদ-নাত, কুরআনিক প্রতীক, কারবালা-চেতনা, মুসলিম ইতিহাস ও উম্মাহবোধ অনেক সময় সাহিত্যিক আধুনিকতার আলোচনা থেইকা সরাইয়া ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়। যেন ইসলামি নজরুল আর আধুনিক নজরুল দুইজন আলাদা কবি।

তবে এই ইতিহাস শুধু বাদ দেওয়ার ইতিহাস না; উদ্ধারের ইতিহাসও। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ গ্রামে গ্রামে ঘুইরা মুসলিম কবিদের পুঁথি সংগ্রহ না করলে বাংলা সাহিত্যের বিশাল অংশ হারাইয়া যাইত। মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, মুহম্মদ এনামুল হক, আহমদ শরীফ, আনিসুজ্জামান, সৈয়দ আলী আহসান ও ওয়াকিল আহমদ মুসলিম সাহিত্যিক ঐতিহ্যরে নতুনভাবে সামনে আনছেন। দীনেশচন্দ্র সেনও পূর্ববঙ্গের লোকসাহিত্য ও মুসলিম কবিদের গুরুত্ব স্বীকার করার চেষ্টা করছেন; তাই তাঁরে প্রান্তিকীকরণের প্রধান দায়ী বলা ঠিক হবে না।

স্বাধীন বাংলাদেশেও সমস্যা পুরাপুরি শেষ হয় নাই। বিশ্ববিদ্যালয়, পাঠ্যপুস্তক, সাহিত্য পুরস্কার, পত্রিকা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এখনও অনেক ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক ও কলকাতাকেন্দ্রিক ক্যাননের উত্তরাধিকার বহন করে। ইসলামি চিন্তা থেইকা লেখা সাহিত্যরে “ধর্মীয়” বলা হয়, কিন্তু ইউরোপীয় দর্শন থেইকা লেখা সাহিত্যরে “বৌদ্ধিক” বলা হয়। এই দ্বৈত মানদণ্ড দেখায়, রাজনৈতিক উপনিবেশ শেষ হইলেও জ্ঞান ও রুচির উপনিবেশ এখনও শেষ হয় নাই। তাই বাংলা সাহিত্যরে উপনিবেশমুক্ত করার অর্থ বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগর বা জীবনানন্দরে বাদ দেওয়া না। আবার মুসলিম কবিদের শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বড় বানানোও না। এর অর্থ হইল- ক্যানন কীভাবে তৈরি হইছে, কার ভাষা মান্য হইছে, কার সাহিত্য পাদটীকায় গেছে, কার ইতিহাস সার্বজনীন আর কারটা সাম্প্রদায়িক বলা হইছে- এইসব প্রশ্ন নতুন কইরা তোলা।

মুসলিম কবি-সাহিত্যিকরা বাংলা সাহিত্যের প্রান্তে জন্ম নেন নাই। ঔপনিবেশিক শিক্ষা, কলকাতাকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান, ভদ্রলোক রুচি, হিন্দু জাতীয়তাবাদী কল্পনা, ভাষার মান্যকরণ এবং সাহিত্য-ইতিহাসের শ্রেণিবিন্যাস তাদের প্রান্তে স্থাপন করছে। এই ইতিহাসরে এক বাক্যে বলা যায়: বঙ্কিম মুসলমানরে সাহিত্যিক “অপর” হিসাবে শক্তিশালী করছে; ভাষাবিদেরা মুসলমানের ভাষারে আলাদা শ্রেণিতে রাখছে; সাহিত্য-ইতিহাসকারেরা মুসলিম কবিদের বিশেষ অধ্যায়ে বন্দী করছে; আর প্রতিষ্ঠানগুলা সেই বিভাজনরে পাঠ্যক্রম, পুরস্কার ও সাংস্কৃতিক রুচির মাধ্যমে স্থায়ী করছে।

বাংলা সাহিত্য শুধু কলকাতার আধুনিক ভদ্রলোকের সাহিত্য না। এইটা আরাকানের আলাওল, চট্টগ্রামের পুঁথি, সৈয়দ সুলতানের নবীবংশ, আবদুল হাকিমের ভাষাপ্রেম, পূর্ববঙ্গের কৃষক পাঠক, মুসলিম নারী লেখক এবং নজরুলের আজান ও বিদ্রোহেরও সাহিত্য। এই বহুস্বরিক ইতিহাস ফিরাইয়া না আনলে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস পূর্ণ হবে না।


রেফারেন্স:

আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, বাঙ্গালা প্রাচীন পুঁথির বিবরণ, মুহম্মদ এনামুল হক, মুসলিম বাংলা সাহিত্য, আহমদ শরীফ, বাঙালী ও বাঙলা সাহিত্য, আনিসুজ্জামান, মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য, দীনেশচন্দ্র সেন, বঙ্গভাষা ও সাহিত্য, সুকুমার সেন, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, Edward Said, Orientalism, Pierre Bourdieu, Distinction, Ngũgĩ wa Thiong’o, Decolonising the Mind, Richard M. Eaton, The Rise of Islam and the Bengal Frontier

Share URL copied

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট

Related Articles

রবীন্দ্রনাথঃ সাংস্কৃতিক পবিত্রতা ও বাঙালি মুসলমানের পরিচয়-সংকট

বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে বিতর্ক মূলত সাহিত্যিক বিতর্ক নয়, এটি ক্ষমতা, শ্রেণি, সংস্কৃতি...

বুদ্ধদেব বসুর নজরুল বিচারঃ একটা বিলম্বিত জবাব

আবু সায়ীদ আইয়ুব থেকে শুরু করে, হুমায়ুন কবীর, বুদ্ধদেব বসু, কাজী আবদুল...